জাল টাকার হোম ডেলিভারি

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

‘...আমার কাছে আসেন, জাল টাকা দেখে গুনে গুনে নিয়ে যাবেন’। এটি অনলাইনে প্রচারিত জাল নোট তৈরি কিংবা বিক্রির সঙ্গে জড়িত

2026-03-17T04:33:10+00:00
2026-03-17T04:33:10+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
জাল টাকার হোম ডেলিভারি
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬, ৪:৩৩ এএম 
সংগৃহীত ছবি
‘...আমার কাছে আসেন, জাল টাকা দেখে গুনে গুনে নিয়ে যাবেন’। এটি অনলাইনে প্রচারিত জাল নোট তৈরি কিংবা বিক্রির সঙ্গে জড়িত একটি পেজের বিজ্ঞাপন। পেজটির নাম ‘জাল টাকার ডিলার’। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদকে সামনে রেখে তৎপর হয়ে উঠেছে জাল নোটের কারবারিরা।

তবে অন্য সময়ের তুলনায় এবার জাল নোট বিক্রির ক্ষেত্রে একটি বড় পার্থক্য দেখা গেছে। অন্য সময় এক হাজার ও পাঁচশ টাকার নোট বেশি জাল করা হলেও এবার ১০/২০/৫০ টাকার নোটেরও নকল করা হচ্ছে।

জানা যায়, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ঈদুল ফিতর সামনে রেখে জাল টাকার কারবারিরা তৎপর হয়ে উঠেছে। 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে জাল নোট তৈরি চক্রের কিছু সদস্য ধরা পড়লেও অধিকাংশই থেকে যায় আড়ালে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে ফেসবুকে পেজ ও গ্রুপ খুলে জাল টাকা কেনাবেচার প্রচারণা চালাচ্ছে প্রকাশ্যে। দিচ্ছে হোম ডেলিভারি। নকল এ টাকা তৈরিতে ব্যবহার করা হয় টিস্যু পেপার, প্রিন্টার, ল্যাপটপ ও প্রিন্টারের কালি। পরে সফটওয়্যারের সাহায্যে মাউসে ক্লিক করলে মুহূর্তেই একের পর এক বেরিয়ে আসে ৫০০ কিংবা হাজার টাকার জাল নোট।

সূত্র জানায়, জাল টাকার চক্র বরাবরই ৫০০ কিংবা হাজার টাকার বড় নোট প্রিন্ট করে। কারণ এতে লাভ বেশি। কিন্তু এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে ১০ ও ২০ টাকার নোটও জাল করে বিক্রির বিজ্ঞাপন দিচ্ছে চক্রটি। বড় নোট সব ক্রেতা-বিক্রেতা দেখেশুনে যাচাই করে নেন। কিন্তু ১০, ২০, ৫০, ১০০ কিংবা ২০০ টাকার নোট বেশি একটা যাচাই না করেই লেনদেন করেন। এতে ছোট জাল নোট খুব সহজেই বাজারে ছড়াচ্ছে।

এই চক্রের সদস্যরা ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার সব বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি করছে জাল নোট। শুধু অর্ডার করলেই দেশের যেকোনো প্রান্তে হোম ডেলিভারির সুবিধাও রয়েছে। ২০, ৫০, ২০০, ৫০০ ও ১ হাজার টাকার নোট বেশি নকল বা জাল করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘জাল টাকার কারখানা’, ‘জাল টাকা বিক্রি করি’, ‘জাল টাকা বিক্রি করা হয়’, ‘জাল টাকার ডিলার’, ‘জাল টাকা বিক্রি বাংলাদেশ ডট কম’, ‘ডিলার জাল টাকার’ এমন নানা নামে পেজ রয়েছে ফেসবুকে। এ ছাড়া টেলিগ্রামে ‘জাল টাকা’, ‘জাল টাকার লেনদেন’ ও ‘জাল টাকা সেল গ্রুপ’ নামে বিভিন্ন গ্রুপের সন্ধান মিলেছে।

সূত্রটি আরও জানায়, ‘জাল টাকা বিক্রি করি’ নামে একটি ফেসবুক পেজে ১০ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার টাকার জাল নোট বিক্রির প্রচারণামূলক পোস্ট দেওয়া হয়। 

ওই পোস্টে লেখা হয়েছে, পবিত্র ঈদ সামনে রেখে নিখুঁত ও মসৃণ প্রিন্টসহ সম্পূর্ণ এ গ্রেডের প্রোডাক্ট (জাল নোট) পাওয়া যায়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কুরিয়ার ও হোম ডেলিভারির ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে গতকাল ওই পেজে গিয়ে দেখা যায় পেজটি লক করে রাখা হয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতি ১০০ পিস ১ হাজার টাকার নোট অর্থাৎ এক লাখ নকল টাকা তৈরিতে খরচ পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। সেই জাল টাকা চক্রগুলো পাইকারি ক্রেতার কাছে ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করছে। পরে পাইকারি ক্রেতা প্রথম খুচরা ক্রেতার কাছে তা বিক্রি করে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায়, এরপর প্রথম খুচরা ক্রেতা দ্বিতীয় খুচরা ক্রেতার কাছে আবার সেগুলো বিক্রি করে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় এবং সবশেষে দ্বিতীয় খুচরা ক্রেতা মাঠ পর্যায়ে দোকানে দোকানে গিয়ে বিভিন্ন নিত্যপণ্য কেনার মাধ্যমে সেসব জাল টাকা বাজারে ছড়িয়ে দিয়ে আসল এক লাখ টাকার সমপরিমাণ ভোগ করছে।

আর এক লাখ টাকার জাল নোট পেতে সব মিলিয়ে খরচ করছে মাত্র ১০ হাজার টাকা। তবে সেই ১০ হাজার টাকা একবারে দিতে হয় না। প্রথম ধাপে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম পাঠালেই দুদিনের মধ্যে কুরিয়ারের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয় লাখ টাকার জাল নোট। সেগুলো হাতে পাওয়ার পর বাকি টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। তবে বেশি পরিমাণে নোট অর্ডার করলে অগ্রিম টাকা কম দিলেও চলে। দুই লাখ টাকার জাল নোটের জন্য অগ্রিম পরিশোধ করতে হয় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা।

অপর সূত্র জানায়, জাল টাকা তৈরি থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত কয়েকটি ভাগে কাজ করে চক্রের সদস্যরা। প্রথমে অর্ডার অনুযায়ী জাল নোট তৈরি, দ্বিতীয় পর্যায়ে এ টাকাগুলো যে অর্ডার দেয় তার কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তৃতীয় পর্যায়ে জাল টাকা বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বছরজুড়ে মাদকের লেনদেন, চোরাই পণ্যের কারবার, স্বর্ণ কেনাবেচাসহ বিভিন্ন অবৈধ লেনদেনের সময় জাল নোট চালিয়ে দেয় চক্রের সদস্যরা। অন্য পেশায় থাকলেও বেশি লাভের আশায় অনেকে এ পেশায় জড়িয়ে পড়ছে।

র‌্যাব-২-এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শামসুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, এক শ্রেণির অসাধু চক্র আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন পদ্ধতিতে জাল টাকা তৈরি করে বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। জাল টাকা তৈরি থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে স্তরভিত্তিক লোক কাজ করে। দেশের সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়ীদের জাল টাকার মাধ্যমে প্রতারিত হওয়া থেকে রক্ষার জন্য জাল টাকা ও চক্রকে ধরার পাশাপাশি বাজার থেকে জাল নোট উদ্ধারের লক্ষ্যে র‌্যাব-২ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব-২-এর একটি আভিযানিক দল গত রোববার মোহাম্মদপুর থানাধীন তিন রাস্তা এলাকা থেকে জাল টাকা বিক্রির সময় অভিযান পরিচালনা করে মো. আরিফ হাওলাদারকে (২১) গ্রেফতার করে তার কাছ থেকে বাংলাদেশি ১ হাজার টাকার জাল নোট (যার পরিমাণ ৩ লাখ টাকা) উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সে জাল টাকা তৈরির সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। সে পরস্পর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে কম্পিউটার ফটোশপ সফটওয়্যার ও বিভিন্ন প্রকার সরঞ্জাম ব্যবহার করে বাংলাদেশি বিভিন্ন মূল্যমানের টাকার জাল নোট তৈরি করে তা ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ এবং বিক্রিসহ প্রতারণা করে আসছিল। প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান সময়ের আলোকে বলেন, জাল নোটের বিষয়ে সিআইডি নিয়মিত কাজ করছে। জাল নোট তৈরির সঙ্গে যুক্ত অনেক চক্র অনলাইনে জাল নোট বিক্রির প্রচারণা চালায় এটা সত্য, তবে এসব পেজের অনেকগুলোই ভুয়া। 

জনবলের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনবলের সীমাবদ্ধতার কারণে ঢালাও অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। তবে থানা-পুলিশ যদি সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সিআইডির কাছে ফরেনসিক সাপোর্ট চায় তা হলে সিআইডি সহায়তা দিয়ে থাকে। এ ছাড়া সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেও অনেক ক্ষেত্রে অভিযান চালানো হয়।



  বিষয়:   অনলাইন  জাল  নোট  ঈদ 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: