সংকট কাটেনি জ্বালানি তেলের

অলিউল ইসলাম

জাতীয়

রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল ও অকটেনের সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি। চাহিদামতো জ্বালানি না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যানবাহন চালকরা। শহরের

2026-03-17T04:50:58+00:00
2026-03-17T04:50:58+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
সংকট কাটেনি জ্বালানি তেলের
অলিউল ইসলাম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬, ৪:৫০ এএম 
সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল ও অকটেনের সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি। চাহিদামতো জ্বালানি না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যানবাহন চালকরা। শহরের অনেক পাম্পে ‘অকটেন ও পেট্রোল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে। আবার যেসব পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে সময় ও ভোগান্তি দুটোই বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত তেল সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। 

অন্যদিকে ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ার অভিযোগ করছেন পাম্প মালিকরা। সব মিলিয়ে জ্বালানি সংকটে ঢাকার সড়কে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে রেশনিং পদ্ধতি তুলে নেওয়া হলেও চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ সচল রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিন সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর আসাদগেটসংলগ্ন তালুকদার ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, পাম্পটি সম্পূর্ণ বন্ধ। ডিপোতে জটিলতার কারণে এখানে সাময়িকভাবে তেলের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে বলে একটি সাইনবোর্ড ঝুলানো আছে।

দুপুর আড়াইটার দিকে একজন চালক পাম্পের কর্মকর্তা বিমল চন্দ্র মৃধার কাছে অকটেন আছে কি না জানতে চান। জবাবে তিনি চালককে আরও দুই-তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলেন। তবে ওই সময়ের মধ্যে অকটেন আসার সম্ভাবনা থাকলেও ডিজেল আসতে রাত হতে পারে বলে তিনি জানান।

পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বিমল চন্দ্র মৃধা সময়ের আলোকে বলেন, গত রোববার রাত ১২টায় তেল আনতে গাড়ি পাঠানো হলেও সোমবার দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত সেটি ফেরেনি। তিনি বলেন, তেলের ডিপোতে (পদ্মা-মেঘনা) কিছু জটিলতা চলছে। দুপুর ১টা পর্যন্ত তেল সরবরাহ বন্ধ ছিল, এখন শুনছি তেল দিচ্ছে। ওই তেল লোড করবে। তারপর আসবে ইনশাআল্লাহ। এরপর আমরা বিক্রি শুরু করব।

পাম্প সূত্রে জানা যায়, স্বাভাবিক সময়ে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার লিটার তেল বিক্রি হয়। বর্তমানে পাম্পটির সঙ্গে ৪৪ জন স্টাফ যুক্ত আছেন। তেল না থাকায় তারা কার্যত কাজ ছাড়া বসে আছেন। বিমল চন্দ্র মৃধা বলেন, সরকারের লোকরাই বলছে, তারা নিজেরাও ঠিক জানে না কী হচ্ছে। সকালে এক কথা বলে, বিকালে আরেক কথা। সচিব একটু আগেও এসেছিলেন। আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কালকে বলল দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, আজকে আবার বলছে না। এতে কী বোঝা যায়? আবার বলছে আগের মতো যার যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই তেল দেবে। মানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ম বদলাচ্ছে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ডিপোতে আমার গাড়িটা রোববার রাত ১২টায় লাইনে দিয়েছি। একটা না, চারটা গাড়ি তখন থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। যদি একটা গাড়িতেও তেল দেওয়া যেত, তা হলে পাম্প চালু থাকত এবং মানুষের এত ভোগান্তি হতো না। আমার পাম্প যদি এক দিন বন্ধ থাকে, তা হলে এখানে ৪৪ জন স্টাফ বসে থাকে। সবাই এই পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। তারা বসে সময় কাটাচ্ছে, আর মালিকের মিটার তো ঠিকই ঘুরছে। 

স্টেশনের সামনে কথা হয় ডিপ্লোমা শেষ করা আদনানের সঙ্গে। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, অবস্থা খুব খারাপ। আমার মোটরসাইকেলে অর্ধেক তেল আছে। ঢাকায় থাকলে হয়তো এক সপ্তাহ চালাতে পারব। কিন্তু আমার বাড়ি গ্রামে। এই তেল নিয়ে আমি গ্রামে যেতে পারব, কিন্তু আবার ঢাকায় ফিরতে পারব না। এখন গ্রামে গিয়ে গাড়ি রেখে আবার ঢাকায় আসব?
গ্রামেও তেলের সংকট রয়েছে বলে জানান তিনি। 

আদনান বলেন, আমি পাম্পে খোঁজ নিয়েছি। তেল ঠিকমতো দেয় না। অনেক সময় খোলা বাজারে বিক্রি করে দেয়। গ্রামেও পাম্প দূরে দূরে। আমার বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার লাঙ্গলপাট এলাকায়। সেখানে একটি পাম্প আছে, কিন্তু সবসময় তেল পাওয়া যায় না। আরেকটি পাম্পে যেতে হলে শ্রীপুরে যেতে হয়, প্রায় ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে। আবার থানার দিকের পাম্পে গেলে ২০ কিলোমিটার পথ। এত দূরে গিয়ে তেল আনা খুবই কঠিন। 

তিনি আরও বলেন, আমাদের বাড়ির কাছেই ২ কিলোমিটার দূরে একটি পাম্প আছে। কিন্তু সেখানে তেল দেয় না। তারা যে তেল পায়, তা অনেক সময় খোলা বাজারে বিক্রি করে দেয়। পরে দোকানদাররা সেই তেল লিটারপ্রতি ৫, ১০ বা ২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করে।

আক্ষেপ করে আদনান বলেন, আমি কালকে গ্রামে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তেল পাইনি বলে যেতে পারিনি। আজ যদি তেল নিতে পারি, তা হলে আল্লাহ ভরসা সকালে রওনা দেব। এটাই এখন গরিব মানুষের অবস্থা। কখন পাম্পে তেল আছে আর কখন নেই, কিছুই বোঝা যায় না বলেও এ সময় উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে কিছু পাম্পে সরবরাহ থাকলেও সেখানে মোটরসাইকেল ও গাড়ির সারি ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। অনেক জায়গায় যানবাহনের প্রবেশ ঠেকাতে পাম্পের মুখে বাঁশ বেঁধে রাখা হয়েছে। তালুকদার ফিলিং স্টেশনের উল্টোদিকে অবস্থিত সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশনের সামনে দেখা যায়, সেখানে তেল দেওয়া হচ্ছে। তবে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ লাইন মোহাম্মদপুর টাউন হল পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে।

পাম্পের সামনে তেল নিতে লাইনে দাঁড়ানো গণমাধ্যমকর্মী আরেফিন বলেন, পৌনে ২টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছি। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে ধীরে ধীরে এগোচ্ছি। সামনে এখনও অনেক পথ। শেষ পর্যন্ত তেল পাব কি না সেটাও নিশ্চিত না। এর আগে অনেকবার এমন হয়েছে যে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাইনি। তবে সরকারি নির্ধারিত দামেই তেল বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশনের ম্যানেজার শঙ্কর বলেন, সারা দিনই ভিড় লেগে আছে। ক্রেতা অনেক বেশি। আমাদের তেল দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরাও আবার নতুন তেলের অপেক্ষায় আছি। তেল পেলেই আবার বিক্রি শুরু করব। এটি সরবরাহ সমস্যার কারণে হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের এখানে আপাতত তেল নেই। তবে সাপ্লাই আছে। মূল সমস্যা হলো ক্রেতা বেশি। যার ৫ লিটার দরকার, সেও অনেক সময় ২০ থেকে ২৫ লিটার করে নিচ্ছে।

তেজগাঁওয়ের বেশ কয়েকটি পাম্প ঘুরে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা যায়, সেখানে তেল দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঠিক সামনে অবস্থিত এই পাম্পটির সামনে সকাল থেকেই দীর্ঘ সারি দেখা যায়। তেল নিতে এসে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা জিল্লুর রহমান বলেন, সকাল থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। অফিসে যাওয়ার আগে তেল নেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু লাইনের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে অনেক সময় লাগবে। নিয়মিত কাজে যাতায়াত করা মানুষদের জন্য এটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের এক প্রতিনিধি বলেন, সকাল থেকেই চাপ বেশি। মানুষ একসঙ্গে তেল নিতে আসছে। আমরা যতক্ষণ তেল থাকে ততক্ষণ দিচ্ছি। তবে সরবরাহ নিয়মিত না থাকলে চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গত শুক্র ও শনিবার বন্ধের দিনেও তেলের ডিপো খোলা রাখা হয়েছে। এর আগে শনিবার দেশে জ্বালানি তেল কেনার সীমা রোববার থেকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

ফিলিং স্টেশনগুলোতে সাধারণত পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রি হয়। এর মধ্যে পেট্রোল শতভাগ দেশে উৎপাদিত হয়। অকটেনের প্রায় ৫০ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয় এবং বাকি অংশ আমদানি করতে হয়। তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ডিজেল সরবরাহ নিয়ে। বিপিসির মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৬৫ শতাংশই ডিজেল।

বিপিসি সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে প্রায় ২ লাখ টন ডিজেল মজুদ রয়েছে। এর বাইরে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারযোগ্য আরও প্রায় ৬০ হাজার টন ডিজেল রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন জাহাজের মাধ্যমে নিয়মিত জ্বালানি যুক্ত হচ্ছে। অকটেন ও পেট্রোলের মজুদ রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার টন করে। দেশীয় উৎস থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ টন পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন হচ্ছে। দিনে এসব জ্বালানির চাহিদা প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ বাড়ানো হলেও মার্চ মাসে বড় ধরনের সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে কেউ যদি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুদ করতে শুরু করে, তা হলে বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, আগামী জুন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি বিশেষ করে ডিজেল ও অকটেন কেনার চুক্তি রয়েছে। তবে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হলে সরবরাহকারীরা তেল পরিশোধনে সমস্যায় পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী মে মাসে তারা চুক্তি অনুযায়ী তেল সরবরাহে ব্যর্থ হতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জি-টু-জি চুক্তি, উন্মুক্ত দরপত্র বা সরাসরি প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত তেল কেনার পরিকল্পনা করছে। চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত সরবরাহ চেয়ে ইতিমধ্যে ভারতকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশেও পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ মার্চ থেকে জ্বালানি তেল বিক্রিতে সীমা বেঁধে দেয় সরকার।


  বিষয়:   অকটেন  পেট্রোল  জ্বালানি  তেল 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: