ঈদের আগে বেতন-বোনাসকে ঘিরে বড় কোনো অস্থিরতা দেখা দেয়নি পোশাক শিল্পে। কারণ অধিকাংশ শিল্প-কারখানাতেই বেতন-বোনাস প্রদান করা হয়েছে। তবে ছোট ও মাঝারি আকারে অনেক গার্মেন্টস কারখানায় এখনও বেতন-বোনাস বকেয়া রয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
তাদের মতে যেসব কারখানায় সাব-কন্ট্রাকটিংয়ের কাজ করা হয় এমন দেড়শ থেকে দুইশ কারখানায় বেতন-বোনাস দেওয়া হয়নি এখনও। এসব কারখানায় শ্রমিক সংখ্যা ২০০ থেকে ৫০০ জনের মধ্যে। তবে ঈদের আগে আজ বৃহস্পতিবার এসব কারখানার অনেকে বেতন-বোনাস দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে শ্রমিক নেতা তৌহিদুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমার জানা মতে বড় বড় শিল্প-কারখানায় বেতন-বোনাস ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়ে গেছে। এমনকি অধিকাংশ কারখানাতেই ছুটিও হয়ে গেছে। সমস্যা রয়েছে ছোট-মাঝারি কিছু শিল্প কারখানায়। আর কিছু বড় কারখানায় সমস্যা রয়েছে, যেসব কারখানার মালিকদের কেউ পলাতক, আবার কেউ জেলে। ছোট-মাঝারি শিল্প কারখানাগুলোতে মূলত সাব-কন্ট্রাকটিংয়ের কাজ করা হয়। এসব কারখানার মালিকরাই ঈদের আগে বেতন-বোনাস দিতে ঝামেলা করেন বেশি। আমরা চেষ্টা করছি, যাতে একজন শ্রমিককেও ঈদের বেতন-বোনাস ছাড়া ঘরে না যেতে হয়।’
৯৯ শতাংশ পোশাক কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে : অন্যদিকে আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন প্রায় শতভাগ কারখানায় পরিশোধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ৯৯.৯১ শতাংশ কারখানায় পরিশোধ হয়েছে। বাকি দুটি কারখানায় বেতন পরিশোধ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পাশাপাশি ৯৯.৮১ শতাংশ কারখানায় ঈদ বোনাস দেওয়া হয়েছে এবং অবশিষ্ট চারটি কারখানায় বোনাস পরিশোধের কাজ চলছে। রাজধানীর বিজিএমইএ ভবনে বুধবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য জানান।
লিখিত বক্তব্যে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে তৈরি পোশাক শিল্প রফতানি আয়ের সিংহভাগ জোগান দিচ্ছে এবং লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পোশাক খাতের রফতানি আয় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে কাঁচামাল আমদানির জন্য ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার হার ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং পোশাকের গড় ইউনিটের মূল্য ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি- এই তিনটি বড় চাপ শিল্পটিকে প্রভাবিত করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা বিশ্ববাণিজ্যে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
দেশীয় চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরে গ্যাসের দাম ২৮৬ শতাংশ এবং বিদ্যুতের দাম ৩৩ শতাংশ বেড়েছে, তবে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এখনও নিশ্চিত হয়নি। এর সঙ্গে উচ্চ সুদহার, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট ও চলতি মূলধনের ঘাটতি যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে।
শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঋণের চাপ থাকা সত্ত্বেও অনেক উদ্যোক্তা ব্যক্তিগতভাবে তহবিল সংগ্রহ করে শ্রমিকদের বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ করেছেন। কিছু কারখানায় আর্থিক সংকট থাকলেও মালিক, ব্যাংক ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে সেসব কারখানায় বেতন-ভাতা পরিশোধ নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও ৬৪ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ কারখানা মার্চ মাসের আংশিক বেতন অগ্রিম দিয়েছে। মহাসড়কে চাপ কমাতে ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়া হচ্ছে। ১৭ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৫০ শতাংশ কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে এবং বাকি কারখানাগুলো দুয়েক দিনের মধ্যে ছুটি ঘোষণা করবে।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার নগদ সহায়তা উদ্যোক্তাদের তারল্য সংকট কাটাতে সহায়ক হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, তাদের সহযোগিতায় শিল্পাঞ্চলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
ঈদযাত্রায় সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবহন চালকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে মহাসড়কে নজরদারি জোরদারের জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান।
সময়ের আলো/আআ