আট দিনে সড়কে ২০৪ প্রাণহানি

নিজস্ব প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধি

জাতীয়

ঈদ মানেই আনন্দ, প্রিয়জনের কাছে ফেরার উচ্ছ্বাস, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রাই এবার পরিণত হয়েছে শোকের মিছিলে। সড়ক, নৌ

2026-03-25T00:29:44+00:00
2026-03-25T00:29:44+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
আট দিনে সড়কে ২০৪ প্রাণহানি
নিজস্ব প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ১২:২৯ এএম 
প্রতীকী ছবি
ঈদ মানেই আনন্দ, প্রিয়জনের কাছে ফেরার উচ্ছ্বাস, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রাই এবার পরিণত হয়েছে শোকের মিছিলে। সড়ক, নৌ ও রেলপথে ঘরমুখো মানুষের ঢলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্ঘটনা একটি নয়, দুটি নয়, দেশজুড়ে প্রতিদিনই ঘটেছে একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনা। 

কোথাও বাস-ট্রেনের সংঘর্ষে একসঙ্গে ঝরে গেছে একাধিক প্রাণ, কোথাও বিয়ের আগের দিন নিভে গেছে জীবনের আলো, আবার কোথাও নানার বাড়ি যাওয়ার পথে নিভে গেছে শিশুর জীবনপ্রদীপ। ঈদের আনন্দ যেন মুহূর্তেই রূপ নিয়েছে অসংখ্য পরিবারের জন্য আজীবনের শোকে।

ঈদুল ফিতরের ছুটি কেন্দ্র করে সারা দেশে সড়ক, নৌ ও রেলপথে ব্যাপক দুর্ঘটনায় অন্তত ২০৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ছয় শতাধিক মানুষ। গত ১৭ মার্চ থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৮ দিনে এসব দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। 

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে মোট ২৬৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে ঈদযাত্রা এখনও চলমান থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ফিরতি যাত্রায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেশি এমন সতর্কবার্তাও দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঈদের পরদিনই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ওই এক দিনেই নিহত হন ২৮ জন। ঈদের দিন প্রাণ হারান অন্তত ১০ জন। 

নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষ রয়েছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার উদ্বেগজনক। নিহতদের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণ। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে মোটরসাইকেলের ব্যবহার কিছুটা কম থাকায় দুর্ঘটনার সংখ্যা আরও বাড়তে পারত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এবারের ঈদযাত্রার সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে কুমিল্লায়। ঈদের দিন গভীর রাতে নগরীর পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস ট্রেনের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে। 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসটি রেলক্রসিং অতিক্রম করার সময় ট্রেনের ধাক্কায় ছিটকে পড়ে এবং ট্রেনটি সেটিকে প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। পরে কচুয়া চৌমুহনী এলাকায় গিয়ে ট্রেনটি থামে, তখনও বাসটি ট্রেনের সঙ্গে আটকে ছিল।

নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের তিনজন এক নারী ও তার দুই শিশু সন্তান ছিল। এই দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানিই ঘটায়নি, মুহূর্তেই একাধিক পরিবারকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। 

কক্সবাজারের টেকনাফে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আনিস নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। এক মাস পর তার বিয়ের দিন নির্ধারিত ছিল। ঈদ উপলক্ষে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে বের হয়ে ফেরার পথে পিচ্ছিল সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আরেকটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। 

পরিবারের সদস্যরা জানান, সম্প্রতি তার বাগদান সম্পন্ন হয়েছিল, বিয়ের প্রস্তুতিও চলছিল পুরোদমে।

একইভাবে নাটোরে গায়ে হলুদের দিন সড়ক দুর্ঘটনায় জুলফিকার আলি জিল্লু নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়। বিয়ের আনন্দঘন পরিবেশ মুহূর্তেই শোকে পরিণত হয়। স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে সাউদা খাতুন নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ঈদের পরদিন বাবা-মায়ের সঙ্গে নানার বাড়ি যাওয়ার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ দুর্ঘটনায় তার বাবা-মাও গুরুতর আহত হয়েছেন। একটি উৎসবমুখর যাত্রা কীভাবে মুহূর্তেই শোকযাত্রায় পরিণত হয়, তার নির্মম উদাহরণ হয়ে থাকল এ দুর্ঘটনা।

ঈদ কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছোট-বড় অসংখ্য দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। 

হবিগঞ্জের মাধবপুরে পিকআপ ভ্যান দুর্ঘটনায় নারীসহ ৪ জন নিহত হন। ফেনীতে বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে ৩ জন নিহত এবং ১১ জন আহত হন। কুষ্টিয়ায় মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা লেগে এক স্কুলছাত্র নিহত হয়েছে। সুনামগঞ্জে গাছের সঙ্গে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় এক তরুণ প্রাণ হারান। 

দিনাজপুর, নওগাঁ, কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় পৃথক দুর্ঘটনায় আরও বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
ঈদের দিনই আট জেলায় অন্তত ১০ জন নিহত হন। ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, ঝিনাইদহ, নড়াইল, চুয়াডাঙ্গা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। 

ময়মনসিংহে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে শিশুসহ দুজন নিহত হন। 

চট্টগ্রামের পটিয়ায় বাস উল্টে একজন নিহত ও অন্তত ২৫ জন আহত হন। 

মাদারীপুরে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় এক স্কুলছাত্র নিহত হয়, ফরিদপুর ও চুয়াডাঙ্গায় ঘুরতে বের হয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় দুই কিশোর। শুধু সড়ক নয়, নৌ ও রেলপথেও ঘটেছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। রাজধানীর সদরঘাটে দুটি লঞ্চের ধাক্কায় পিষ্ট হয়ে বাবা-ছেলের মৃত্যু হয়। তারা ঈদে বাড়ি ফিরছিলেন। এ ঘটনায় এক অন্তঃসত্ত্বা নারী গুরুতর আহত হন।

অন্যদিকে রাজবাড়ীর কালুখালীতে ট্রেনের ছাদে বসে থাকা এক তরুণ ব্রিজের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে নিহত হন, যা ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার ভয়াবহ দিকটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ঈদের পরদিনই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ওইদিন কুমিল্লায় ১২ জন, ফেনীতে ৩ জন, হবিগঞ্জে ৪ জনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ২৮ জন নিহত হন। 

এটি প্রমাণ করে, ঈদের পরদিনও যাত্রা ঝুঁকিমুক্ত নয় বরং অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বাড়ে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, ঈদযাত্রা এখনও চলমান থাকায় এই পরিসংখ্যান চূড়ান্ত নয়। আগামী ২৮ মার্চ পর্যন্ত হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

তার মতে, এবারের ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার প্রবণতা গতবারের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে ট্রেন দুর্ঘটনা বেড়েছে। 

তিনি বলেন, সড়কে কার্যকর নজরদারির অভাব, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং পরিবহন খাতে শৃঙ্খলার ঘাটতি দুর্ঘটনা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনারও ঘাটতি ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছুটা সক্রিয় থাকলেও তা যথেষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

তার মতে, কঠোর নজরদারি ও কার্যকর আইন প্রয়োগ ছাড়া এই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।

ঈদের ছুটি শেষে মানুষ যখন আবার কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করবে, তখন সড়ক, নৌ ও রেলপথে আবারও বাড়বে চাপ। এই সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর নজরদারি এবং সচেতনতা বৃদ্ধি। 

ঈদ আনন্দের উৎসব হলেও এবারের চিত্র যেন এক ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলছে যেখানে আনন্দযাত্রা বারবার রূপ নিচ্ছে মৃত্যুমিছিলে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি ভবিষ্যৎ। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন শুধু পরিসংখ্যান নয়, কার্যকর উদ্যোগ। না হলে প্রতি ঈদেই একই শোকগাথা নতুন করে লিখতে হবে যেখানে আনন্দের চেয়ে শোকই হয়ে উঠবে বড় খবর।

সময়ের আলো/আরবিএন 



  বিষয়:   ঈদ  আনন্দ  দুর্ঘটনা 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: