রাজধানীর আসাদ গেট থেকে শ্যামলী রিং রোড এলাকার প্রতিটি ক্লিনিক আগামী সাত দিনের মধ্যে পরিদর্শন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে এই কার্যক্রম চলমান থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো অনিয়মের সঙ্গে আপস করা হবে না।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) সকালে সচিবালয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।
এদিকে মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্তৃক পরিচালিত বেসরকারি হাসপাতাল/ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ব্লাড ব্যাংকগুলো পরিদর্শনকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও অসংগতির জন্য ২টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ, ২টি আংশিক বন্ধ এবং বাকি ৩টি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাজধানীর আসাদ গেট থেকে শ্যামলী রিং রোড এলাকার ২টি টিম আলাদাভাবে মোট ৭টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। এ সময় বিভিন্ন অনিয়ম ও অসংগতির জন্য ২টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২টি আংশিক বন্ধ এবং বাকি ৩টি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় একাধিক হাসপাতালের আইসিইউ ও এনআইসিইউ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠান দুটি হলো ঢাকার মোহাম্মদপুরের কলেজ গেটে অবস্থিত প্রাইম অর্থোপেডিক ও জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং প্রাইম ব্লাড ব্যাংক।
পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, মঙ্গলবার মোহাম্মদপুরের মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারে বেসরকারি হাসপাতালে অভিযান চালায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি দল। এর মধ্যে প্রাইম হাসপাতালেও মিলেছে চরম অনিয়ম। সেখানে কোনো বৈধ ল্যাব না থাকলেও রোগীদের ভুয়া প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছিল। এ ছাড়া স্পর্শকাতর ও আইনি জটিলতা সম্পন্ন (গুলিবিদ্ধ বা সংঘর্ষে আহত) রোগীদের গোপনে চিকিৎসা দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটি।
অভিযানে টিজি হাসপাতাল বন্ধসহ একাধিক হাসপাতালের আইসিইউ ও এনআইসিইউ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
সকালে টিজি হাসপাতালে অভিযানে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে এনআইসিইউতে ৪টি শিশু ভর্তি থাকলেও কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি প্রেসক্রিপশনেও ছিল না চিকিৎসকের স্বাক্ষর।
জানা যায়, অ্যাম্বুলেন্স চালক ও দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীদের ভুল বুঝিয়ে এসব হাসপাতালে আনা হয়।
এক রোগীর স্বজন জানান, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক না থাকার সুযোগ নিয়ে দালালরা তাদের প্রলোভন দেখিয়ে এখানে নিয়ে আসে।
অভিযান শেষে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক আবু হোসেন মঈনুল আহসান বলেন, ‘আমরা একাধিক ক্লিনিক ও আইসিইউ বন্ধ করার মতো পরিস্থিতি পেয়েছি। একটি ব্লাড ব্যাংকও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। মহাপরিচালকের নির্দেশক্রমে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিন সকালে সচিবালয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমাদের এই কার্যক্রম চলবে। কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। আমরা এখন ধরেছি আসাদ গেট থেকে শ্যামলী রিং রোড পর্যন্ত। এই এলাকায় যতগুলো ক্লিনিক আছে, আগামী সাত দিনের মধ্যে সবগুলো আমরা পরিদর্শন করব। যেখানে যে অনিয়ম আছে, আমরা অ্যাকশনে যাব। আমাদের উদ্দেশ্য কিন্তু বন্ধ করে দেওয়া না বা কাউকে সাজা দেওয়া না উন্নত সেবাটা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া। জনগণ যাতে ভালো স্বাস্থ্যসেবা পায়, এটা নিশ্চিত করাই আমাদের পরিদর্শনের লক্ষ্য।
ব্যবস্থার ধরন স্পষ্ট করে মন্ত্রী বলেন, যেখানে সেবার মান উন্নত করার সুযোগ আছে, সেখানে তা করা হবে। তবে গভীর অবহেলা দেখা গেলে অফিসিয়ালি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘পরিদর্শন শুরু হলে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো সাবধানতা অবলম্বন করবে। সিভিল সার্জন ও স্থানীয় ইউএইচএফপিওদের (উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা) মাধ্যমে দেশব্যাপী আমরা পরিদর্শন করব। শুধু ঢাকায় করলে হবে না; দেশের মানুষ তো বেশিরভাগ গ্রামে থাকে, তাদের জন্যও করতে হবে। এটা সাময়িক কোনো উদ্যোগ নয়, আমরা এই কার্যক্রম চালিয়ে যাব।’
কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ত্রুটি সংশোধনের জন্য প্রথমে নোটিস দেওয়া হবে। যন্ত্রপাতির অভাব থাকলে সেগুলো সংগ্রহের জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন (লাইসেন্স) পেতে ও নবায়ন করতে যেসব শর্ত পূরণ করা আবশ্যক, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেগুলো হালনাগাদ করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়া হবে।
অনিয়ম করে কেউ রক্ষা পাবে না জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের স্বাস্থ্যসেবাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে কারও ব্যক্তিগত সুবিধার কারণে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে আমরা ক্লিনিক খোলা রাখব, এটা অসম্ভব। যেটা বলেছি, এটাই হবে। আমাদের কেউ কিনতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী এসব ব্যাপারে আমাদের একেবারে শূন্য সহিষ্ণু হতে বলেছেন এবং আমরা তা-ই করব।
এদিকে মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে ঢাকায় সচিবালয় থেকে সরাসরি ভিডিও কলের মাধ্যমে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের খোঁজখবর নেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
সশরীরে উপস্থিত না হয়েও ভিডিও কলের শুরুতেই প্রতিমন্ত্রী আউটডোরে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ ছাড়া ভিডিও কলের মাধ্যমে হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে চিকিৎসকদের হাজিরা খাতা সবই ছিল তার নিবিড় নজরদারিতে।
ভিডিও কলের শুরুতেই স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী আউটডোরে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি সেবার মান, সরকারি ওষুধ ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে কি না এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত সার্বিক বিষয়ে রোগীদের অভিজ্ঞতা জানতে চান। এরপর তিনি দায়িত্বরত চিকিৎসকদের উপস্থিতি যাচাই করতে সরাসরি হাজিরা খাতা দেখতে চান এবং কারা কর্মস্থলে আছেন তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
দক্ষিণ সুরমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও রোগীদের সন্তুষ্টি দেখে প্রতিমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেন।
এ সময় তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রশংসা করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশের প্রতিটি নাগরিকের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
সময়ের আলো/আরবিএন