দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী, সার্চ কমিটি ছাড়াই নতুন কমিশনার নিয়োগের বিশেষ সুযোগ রয়েছে। এতে করে অষ্টমবারের মতো সার্চ কমিটি ছাড়াই সংস্থাটিতে নতুন কমিশন গঠন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন, কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ পদত্যাগ করেন। এরপর থেকেই দুদকের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে।
সংগত কারণেই নতুন কমিশন গঠনে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ফলে দুদকের নতুন দুদক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী, সার্চ কমিটির পরিবর্তে বাছাই ও পর্যবেক্ষক কমিটির মাধ্যমে নতুন কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এরই ভিত্তিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ শিগগিরই ৫ সদস্যের বাছাই বা পর্যবেক্ষক কমিটি গঠনের পথ খুঁজছে। অবশ্য দুদক আইন ও বিধিতে কমিশনের অবর্তমানে কার্যক্রম পরিচালনার কোনো ধরনের আইনি সুযোগও রাখা হয়নি। তবে অভিযোগ গ্রহণ, যাচাই-বাছাই, অনুসন্ধান-তদন্ত কার্যক্রম, আদালতের বিচারিক কার্যক্রম চলমান থাকবে।
অন্যদিকে দুদকের নতুন দুদক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী, সার্চ কমিটির পরিবর্তে বাছাই ও পর্যবেক্ষক কমিটির মাধ্যমে নতুন কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। নতুন কাঠামোতে ৫ সদস্যের এই কমিটি কমিশন বাছাই করে দেবে। এ ছাড়া সার্চ কমিটি ছাড়াই নতুন কমিশনার নিয়োগের বিশেষ সুযোগ রয়েছে।
নতুন কাঠামোয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ৫ সদস্যের কমিশনে রূপান্তরিত হচ্ছে। এখানে ১ জন নারী এবং ১ জন আইসিটি বিশেষজ্ঞ থাকা বাধ্যতামূলক। বাছাই ও পর্যবেক্ষক কমিটির প্রধান হবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন সিনিয়র বিচারক। এ ছাড়া হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সদ্য বিদায়ি সচিব ও সরকারি কর্ম-কমিশনের চেয়ারম্যান। এই ৫ সদস্যের কমিটি আলোচনা করে শীর্ষ তিনটি পদের জন্য ছয় জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেবে। রাষ্ট্রপতি ওই তালিকা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কমিশনার হিসেবে তিনজনকে নির্বাচিত করবেন। তাদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেবেন।
এ ছাড়া নতুন অধ্যাদেশে অনুসন্ধান ছাড়াই সরাসরি মামলা (এফআইআর) দায়ের করার ক্ষমতা পেয়েছে দুদক। একই সঙ্গে নতুন কমিশনে কাজ করার সময় কমিয়ে ৪ বছর করা হয়েছে এবং দুদকের কার্যক্রম প্রতি ৬ মাস পরপর ওয়েবসাইটে প্রকাশের বিধান রাখা হয়েছে। নতুন এই কাঠামোতেই দ্রুততম সময়ে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে কার্যক্রম চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে।
দুদক সূত্র জানায়, গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন, কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ পদত্যাগ করেন। তাদের পদত্যাগ করার প্রায় ১ মাস হতে চললেও এখন পর্যন্ত কমিশন গঠনে কোনো বাছাই কমিটি (সার্চ কমিটি) কমিটি গঠন করা হয়নি। ফলে দুদকে অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
এতে অভিযোগ অনুসন্ধানের অনুমোদন, নতুন মামলা করা, চার্জশিট অনুমোদন, সম্পত্তি ক্রোক এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া থেমে গেছে। ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগ করায় রাষ্ট্রের দুর্নীতিবিরোধী এই প্রতিষ্ঠানটি এখন নেতৃত্বশূন্য। দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধসংক্রান্ত সব ধরনের কার্যক্রম চালু রাখতে দ্রুততম সময়ে কমিশন গঠন এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। নেতৃত্বশূন্যতায় দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের গতি কমে গেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিগত কমিশনের বিদায়ের ফলে দুদকে যে শূন্যতা ও স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে অবিলম্বে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নতুন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারকে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই উদ্যোগ নিতে হবে। সার্চ কমিটি বা পর্যবেক্ষক কমিটি গঠন করে রাষ্ট্রপতির নির্দেশক্রমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে অভিযুক্তরা সুযোগ পেয়ে যাবেন। একই সঙ্গে হঠাৎ করে কাজের চাপ বেড়ে যাবে, যা সামাল দেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুদক পরিচালিত হয় ‘ওয়ান ম্যান শো’-এ। অর্থাৎ পুরো কমিশন অনুমোদন না দিলে অনুসন্ধান, মামলা অনুমোদন করা সম্ভব হয় না। কমিশন না থাকায় আদালতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার মতো পদক্ষেপও নেওয়া যাচ্ছে না। এতে অভিযুক্তদের আত্মগোপন বা দেশত্যাগের ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। পুরো কমিশন নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষায় রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিশন নিয়োগ না দিলে দুদকের অচলাবস্থা কাটবে না।
দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন বলেন, কমিশন ছাড়া দুদক আইনে নির্ধারিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে কার্যক্রমে এক ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কমিশন থাকার সময় যেসব অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুমোদিত হয়েছিল, সেগুলো সীমিত পরিসরে চলমান রয়েছে। তাই শিগগিরিই দুদকের কমিশন গঠন করা অত্যাবশ্যক।
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক বিবৃতিতে বলছে, দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে দুর্নীতিবিরোধী সোচ্চার, আপসহীন ব্যক্তিত্ব প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিবেচনায় চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে কাউকে কোনোভাবে যাতে নিয়োগ দেওয়া না হয়। বিগত দিনে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ায় কমিশন দল-মত নির্বিশেষে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারেনি। মুখ দেখে, পরিচয় দেখে কাজ করা হয়েছে। এই কারণে দুদক বরাবরই জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি। দলটি সরকার গঠনের দুই সপ্তাহ পরই পদত্যাগ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ দেওয়া ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ড. মোমেনকে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়।
একই সময়ে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সাবেক জেলা জজ মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদকে। পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া এই কমিশন নিজেদের মেয়াদের মাত্র এক বছর দুই মাস দায়িত্ব পালন শেষে গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করেন।
অন্যদিকে দুদকে নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার হিসেবে কারা আসছেন তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ঢাকা মহানগর আদালতের সাবেক সিনিয়র স্পেশাল জজ মোতাহার হোসেনের নাম শোনা যাচ্ছে। বিদেশে অর্থ পাচারসংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন বিচারক মোতাহার হোসেন। সে সময় তিনি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যান।
এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাত হোসেন ভূঁইয়া, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইয়া, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, পুলিশের সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর আপন ভাই প্রশাসন ক্যাডারের ৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়কার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব এ এইচ এম নুরুল ইসলামের নাম শোনা যাচ্ছে।
অন্যদিকে ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাতটি কমিশন দুদকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে চারটি কমিশনকেই চার বছরের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বিদায় নিতে হয়েছে। সাবেক বিচারপতি প্রয়াত সুলতান হোসেন খানের নেতৃত্বে কমিশন দায়িত্ব পালন করেছেন ২ বছর তিন মাস। লে. জে. (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিশন দুই বছর দায়িত্বে ছিলেন। সরকারের সাবেক সচিব গোলাম রহমান, সরকারের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মো. বদিউজ্জামান ও সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন যথারীতি তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ করেছেন। সরকারের সাবেক সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ তিন বছর ছয় মাস ও ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন এক বছর এক মাস দায়িত্ব পালন করেছে।
এফআর