জ্বালানি তেলের চাপে নাজুক হচ্ছে অর্থনীতি

এসএম আলমগীর

অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের বাজার টালমাটাল অবস্থা। ইতিমধ্যেই প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে। এর প্রভাব বেশ

2026-03-28T00:58:52+00:00
2026-03-28T00:58:52+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
অর্থনীতি
জ্বালানি তেলের চাপে নাজুক হচ্ছে অর্থনীতি
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬, ১২:৫৮ এএম 
প্রতীকী ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের বাজার টালমাটাল অবস্থা। ইতিমধ্যেই প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে। এর প্রভাব বেশ প্রকট আকারে পড়েছে দেশেও। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের চাপ ক্রমশই বাড়ছে অর্থনীতিতে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে যেমন জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে, মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। এ কারণে পণ্যমূল্যও বেড়ে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এভাবে যদি আরও কিছু দিন চলতে থাকে তা হলে মূল্যস্ফীতির চাপ প্রকট হবে, সাধারণ মানুষের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়বে।

দেশের অর্থনীতি এমনিতেই গভীর সংকটে। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে। উচ্চ পণ্যমূল্য দেশের সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়াচ্ছে। বিগত কয়েক বছর ধরেই দেশে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও একরকম স্থবিরতা চলে আসছে। রফতানি আয় কমছে। অর্থের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ব্যাংক ব্যবস্থা এখনও নড়বড়ে অবস্থায় আছে। 

অপরদিকে রাজস্ব সংগ্রহ কম হওয়ায় সরকারের আয়েও চলছে টানাপড়েন। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও মাত্র ৮ শতাংশের মতো। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। বর্তমানে অর্থনীতিতে এ রকম আরও কিছু ক্ষত রয়েছে, যা নতুন সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এই অবস্থার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অর্থনীতির এসব ক্ষত আরও গভীর করে তুলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই যুদ্ধের ধাক্কা বেশ ভালো মতোই লাগতে শুরু করেছে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে। সবার আগে প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের বাজারে। গত কয়েক দিন ধরে সারা দেশেই জ্বালানি তেল নিয়ে একরকম তুলকালাম চলছে। দেশে এখনও পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল থাকার পরও কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করে জনভোগান্তি শুরু হয়েছে। ইরানের হামলার কারণে কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করায় এর প্রভাবও দৃশ্যমান হচ্ছে ক্রমেই। 

ইরান হুরমুজ প্রণালি বন্ধ করায় জ্বালানি পরিবহন যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি বাংলাদেশের রফতানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সবচেয়ে আতঙ্কে আছে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি। তারা যেমন জীবনের ঝুঁকিতে আছেন, তেমনি বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের অন্যতম প্রধান খাত রেমিট্যান্স আহরণও ঝুঁকিতে পড়ছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময় কঠিন সময়, সেটি আমাদের স্বীকার করতে হবে। অর্থনৈতিক ভঙ্গুর অবস্থায় আমরা দায়িত্ব নিয়েছি, এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ শুরু হলো। এতে অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং এই যুদ্ধ যদি চলতে থাকে চাপটা আরও বাড়তে থাকবে।’
আরও পড়ুন

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে খুবই সজাগ এবং জ্বালানি কেনা অব্যাহত আছে। জ্বালানির অভাবে যাতে মিল-কারখানা, বিদ্যুৎ খাত বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য ভালো ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এখনও মোটামুটি স্থিতিশীল আছে। এই ধারা অব্যাহত রাখার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে যুদ্ধ যদি বেশি দিন অব্যাহত থাকে, তা হলে চাপ বাড়তে থাকবে।

এই চাপ বাড়তে থাকলে তা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর আসবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘যেভাবে বিশ্বব্যাপী আসছে, সেটা বাংলাদেশেও আসবে। আমরা এখনও যেমন তেলের মূল্যবৃদ্ধি করিনি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করিনি, বাস ভাড়া বৃদ্ধি করিনি। মোটামুটি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধরে রাখার জন্য চেষ্টা করছি। এখন জনগণের সহযোগিতা ও সমর্থন লাগবে। সংযমের মাধ্যমেই মোকাবিলা করতে হবে।’

অপরদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন দিনদুয়েক আগে বাংলাদেশ সফরে এসে বলেছেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি অর্থনীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে, বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক চাপের বাইরে নয়। 

তিনি বলেন, যেকোনো অর্থায়ন সংক্রান্ত আলোচনা সবসময়ই নীতিগত আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সব দেশই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষত যুদ্ধ পরিস্থিতি অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তার এ সাবধান বাণীও ভাবাচ্ছে বাংলাদেশকে। 

বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি বড় উদ্বেগের : বিশ্লেষকদের মতে, যদি হুরমুজ প্রণালি মার্চের শেষ পর্যন্ত বন্ধ থাকে, তা হলে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১৫০ ডলারেরও বেশি উঠতে পারে, যা রেকর্ড স্তরের কাছাকাছি। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে সত্তর দশকের মতো জ্বালানি শকের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং উৎপাদন হ্রাস ঘটাবে। বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশে বছরে ছয় থেকে সাত মিলিয়ন টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার বাড়লে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। আর তা যদি ১৫০ ডলারে উঠে যায়, তা হলে আমদানি ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে। 

অতীতে তেলের দামের ধাক্কা বাংলাদেশ কয়েকবার অনুভব করেছে। ২০০৮ সালে বিশ্ববাজারে দাম ১৪৭ ডলারে পৌঁছে, তখন বিপিসিকে বড় ভর্তুকি নিয়ে জ্বালানি বিক্রি করতে হয়। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকায় সরকার কয়েক দফা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর দাম বেড়ে গেলে জ্বালানির মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। এই অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কা এলে দেশের জ্বালানি মূল্য দীর্ঘকাল স্থির রাখা সম্ভব হয় না। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির অনিশ্চয়তায় অতিরিক্ত চাহিদার কারণে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা বিবেচনায় সরকার তেল ব্যবহারে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। যদি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ে কিন্তু দেশে বাড়ানো না হয়, তা হলে বিপিসিকে লোকসানে জ্বালানি বিক্রি করতে হবে। এর ফলে ঘাটতি দ্রুত বাড়বে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে বড় ঋণ নিতে হবে এবং সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপিসি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তারা সংকটে পড়লে সরকার সহায়তা দেবে। কিন্তু দীর্ঘকাল লোকসানে পড়ে গেলে ঋণের বোঝা বাড়বে, যা আর্থিক খাতে চাপ তৈরি করবে।

পণ্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তা বেশি : জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সবার আগে প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষে জীবনে। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পণ্যমূল্য বেড়ে যায়। আবার কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও অনেক বেড়ে যাবে। গত রোজার মাস এবং ঈদের কারণে এমনিতেই ভোগ্যপণ্যের বাজারে বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এক মাসের ব্যবধানে সব ধরনের মুরগির দাম কেজিতে ১০০ টাকারও বেশি বেড়েছে। গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা ছাড়িয়েছে। ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোরও পাঁয়তারা করছেন ব্যবসায়ীরা। ঈদের আগে যে পেঁয়াজের কেজি ছিল ৩০ টাকা, এখন সেটি বেড়ে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা হয়ে গেছে। এভাবে আরও অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে ইতিমধ্যেই। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় ইতিমধ্যেই বেড়ে গেছে। কারওয়ান বাজারের সবজি ব্যবসায়ী কবীর হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, এক ট্রাক পণ্য আনতে যেখানে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা লাগত, এখন সেটি ২৫ হাজার টাকারও বেশি লাগছে। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাবে পণ্যমূল্য বেড়ে যাচ্ছে। যদি এভাবে চলতেই থাকে, তা হলে সামনে পরিবহন ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি পণ্যমূল্যও আরও বেড়ে যাবে। এটা নিয়ে আমরা ব্যবসায়ীরাই দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি।

এএডি/


  বিষয়:   জ্বালানি তেল 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: