দেশের ব্যাংক খাতের জন্য খেলাপি ঋণ এখন স্থায়ী ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডজনখানেক প্রজ্ঞাপন, নতুন নীতিমালা প্রণয়ন, নীতিছাড় এবং রোডম্যাপ ঘোষণা করলেও বাস্তবে খেলাপি ঋণের লাগাম টানা সম্ভব হয়নি। একের পর এক সংস্কার নীতি নেওয়া সত্ত্বেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমছে না, বরং কাগজে-কলমে আড়াল করে রাখা ঋণের প্রকৃত চিত্র উন্মোচিত হতে শুরু করায় এই অঙ্ক লাফিয়ে লাফিয়ে আশঙ্কাজনক গতিতে বাড়ছে। অর্থনীতিবিদ ও খাত-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক খাতের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া কেবল প্রজ্ঞাপন জারি করে এই গভীর ক্ষত নিরাময় অসম্ভব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। পরের তিন মাসেই তা ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় উঠেছিল।
খেলাপি রোধে যত উদ্যোগ ও আইনি কাঠামো : ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকার বিভিন্ন সময়ে বহুবিধ আইনি ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমানো ও ঝুঁকিমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ১৮ মাসের একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বাস্তবায়ন শুরু করে। এর আওতায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ে অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর) এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করা হয়। এ ছাড়া তারল্য সংকট ও উচ্চ খেলাপি ঋণে জর্জরিত দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকসহ কয়েকটি সংকটাপন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি পর্যবেক্ষণে এনে পুনর্গঠনের চেষ্টা চলে।
এর বাইরে ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসায়ী সংকট কাটাতে বিশেষ নীতিসহায়তা চালু করা হয়। এই সহায়তার আওতায় ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কম ডাউন পেমেন্টে সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি অনাদায়ী ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ‘এক্সিট পলিসি’ ও ঋণ অবলোপন (রাইট-অফ) নীতিমালা শিথিল করা হয়।
নীতিগত সংস্কারের পাশাপাশি খেলাপি রোধে আইনগত কাঠামো সংস্কারের পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। দুর্বল প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, আমানতকারীদের সুরক্ষা প্রদান এবং ঋণখেলাপির সংস্কৃতি দূর করতে ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ব্যাংক রেজুলেশন আইন এবং ডিপোজিট প্রটেকশন আইন জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ শ্রেণিকরণের সময়সীমা আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। যেখানে কোনো ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তা খেলাপি হিসেবে গণ্য করার বিধান কার্যকর করা শুরু হয়েছে।
খেলাপি রোধে গৃহীত পদক্ষেপের ব্যর্থতার কারণ : এতসব আইন, নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে খেলাপি ঋণ কমছে না। বরং প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পেয়ে এটি ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই উদ্যোগগুলো কার্যকর না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু মৌলিক ও কাঠামোগত কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বাংলাদেশে খেলাপিদের বড় একটি অংশ ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং ব্যাংক পরিচালকদের যোগসাজশে সৃষ্ট এই গোষ্ঠী আইনের ফাঁক গলে বারবার পার পেয়ে যায়। ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) বিধিনিষেধ বা আইনি পদক্ষেপ প্রায়শই উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ বা রাজনৈতিক প্রভাবে ভেস্তে যায়।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বারবার ডাউন পেমেন্টে ছাড় এবং পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়ার ফলে ভালো ঋণগ্রহীতাদের মধ্যেও ঋণ পরিশোধ না করার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। একজন নিয়মিত ঋণগ্রহীতা দেখছেন যে, ঋণ পরিশোধ না করে খেলাপি হলে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আরও বেশি সুবিধা ও ছাড় পাওয়া যায়। এর ফলে নিয়মিত আদায়ের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
আবার আইনগতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ামক সংস্থা হলেও বাস্তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব প্রবল। প্রভাবশালী কোনো গোষ্ঠীর ঋণের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গেলে বা দেউলিয়া ব্যাংক বন্ধ করতে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায়ই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বেনামি ঋণ ও জামানতের কৃত্রিম মূল্য। তারা বলেন, অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়া অনেক ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহকের দেওয়া জামানতের মূল্য ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় কাগজে-কলমে অনেক বেশি দেখানো হয়। ঋণখেলাপি হওয়ার পর ব্যাংক যখন সেই জামানত বাজেয়াপ্ত বা নিলামে তুলতে যায়, তখন দেখা যায় মূল্যের অমিল। ফলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও বকেয়া অর্থ উদ্ধার সম্ভব হয় না। এ ছাড়া আইনি প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও অর্থঋণ আদালতের সীমাবদ্ধতাও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের চলতি বছরের সবশেষ মে মাসের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশের ৬৮টি অর্থঋণ আদালতে খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত ৭৪ হাজার ৬৭৯টি মামলা চলমান আছে। এসব মামলায় আটকে থাকা খেলাপি ঋণের অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা। বিচারক স্বল্পতা, আইনি জটিলতা এবং বারবার স্থগিতাদেশ পাওয়ার সুবিধার কারণে খেলাপিরা বছরের পর বছর ব্যাংকের টাকা আটকে রাখতে সক্ষম হন।
খেলাপি ঋণের এই চড়া মাশুল দিতে হচ্ছে পুরো দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ জনগণকে। ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ প্রভিশন রাখতে বাধ্য হওয়ায় তাদের পরিচালন খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। প্রভিশন ঘাটতি মেটাতে এবং ক্ষতি সামাল দিতে গিয়ে অনেক ব্যাংক মূলধন সংকটে পড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ আমানতকারী ও নতুন উদ্যোক্তাদের ওপর। ব্যাংকিং খাত তাদের এই লোকসান পুষিয়ে নিতে ভালো ও সৎ উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে বাজারে ঋণ গ্রহণের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন মূলধনি বিনিয়োগ থমকে যাচ্ছে, কর্মসংস্থান তৈরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশে বেসরকারি খাতের স্বাভাবিক বিকাশ স্থবির হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট নিছক কোনো কারিগরি বা নীতিগত সমস্যা নয়; এটি মূলত সুশাসনের সংকট। কেবল প্রজ্ঞাপন জারি করে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
তারা বলেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের চিহ্নিত করে তাদের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা, দেশে-বিদেশে থাকা সম্পদ ক্রোক করা এবং সরকারি সুবিধা প্রাপ্তিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে। একই সঙ্গে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অর্থঋণ আদালতের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে নির্দিষ্ট সময়সীমার (যেমন সর্বোচ্চ ছয় মাস) মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনা না করে নিয়মভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। পুনঃতফসিল বা অবলোপনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ ঢেকে রাখার সংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ করে ব্যালেন্স শিটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমি একমত যে রাজনৈতিক প্রভাব, আইনি সুরক্ষা, বারবার নীতিছাড় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সীমিত স্বায়ত্তশাসন ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি বেনামি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ প্রদান, জামানতের অতিমূল্যায়ন, দুর্বল ঋণ যাচাই, ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসনের ঘাটতি এবং অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা সমস্যাটিকে গভীর করেছে।’
তিনি বলেন, ‘এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ইচ্ছাকৃত ও প্রকৃত ব্যবসায়িক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কার্যকর স্বাধীনতা দিতে হবে, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিল বন্ধ করতে হবে এবং ব্যাংকের পরিচালক ও ব্যবস্থাপকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থঋণ আদালতের সক্ষমতা বাড়িয়ে দ্রুত ঋণ আদায় এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরানোর উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা