আমেরিকার জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট গত ২৩ মার্চ হিউস্টনে একটি অনুষ্ঠানে তেল ব্যবসায়ীদের সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, বাজার তার আপন গতিতেই চলে।
‘সেরাউইক এনার্জি কনফারেন্স’ অনুষ্ঠানে শিল্পখাতের এক বিশাল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তা হিসেবে আমেরিকার জ্বালানিমন্ত্রী আশাবাদী সুর তোলেন। ইরান যুদ্ধে তেলের বাজার অস্থিতিশীল থাকলেও, আমেরিকার তেলের বাজারে এখন সুসময় বিরাজ করছে বলে জানান তিনি।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, আমেরিকার তেলের রাজধানীখ্যাত টেক্সাসে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছুঁলেই যেন উৎসব শুরু হয়।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘রাইস্ট্যাড’-এর হিসাব অনুযায়ী, যদি সারা বছর এই দাম বজায় থাকে, তবে আমেরিকার তেল কোম্পানিগুলো ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করবে।
এক্ষেত্রে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বিক্রেতারাও লাভবান হচ্ছেন। কাতারের জাতীয় জ্বালানি কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কমে গেছে, যা কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে। এর ফলে আমেরিকার এলএনজি প্রতিষ্ঠান ‘ভেঞ্চার গ্লোবাল’-এর শেয়ারের দাম গত এক মাসে দ্বিগুণ হয়েছে।
সেরাউইক সম্মেলনে তাদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। আমেরিকার একটি তেল কোম্পানির সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা ক্রিস রাইট মনে করছেন, চলমান যুদ্ধের প্রভাব মূলত ইতিবাচক। তার ভাষায়, দাম এখনও এতোটা বাড়েনি যা তেলের চাহিদা ধ্বংস করবে, তবে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট। তবে এই আশাবাদের মাঝেও তিনটি বড় উদ্বেগ রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন, কিন্তু যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে, বিশেষ করে যদি ইরান হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে রাখে।
এসময় সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল জিম ম্যাটিস ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
তার কথায়, ভালো কোনো বিকল্প খুব একটা নেই। অন্যদিকে, শেভরন-এর প্রধান মাইক ওয়ার্থ সতর্ক করে বলেছেন, বাজার বর্তমানে খুব সীমিত তথ্যের ওপর নির্ভর করছে। অনিশ্চয়তা আমেরিকার তেলের উৎপাদন বাড়াতে নিরুৎসাহিত করছে।
সেরাউইক-এ কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, তারা ‘ক্যাপিটাল ডিসিপ্লিন’ বজায় রাখতে চান। অতীতে তেলের বাজার ধসের সময় বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছিলেন, যা এখনো তাদের মনে রয়েছে।
মার্কিন ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি ও আর্থিক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল-এর রাউল লেব্ল্যাঙ্কের মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে অন্তত ছয় মাস ধরে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকতে হবে এবং ভবিষ্যৎ বাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা থাকতে হবে। যা বর্তমানে অনুপস্থিত।
শক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, রাসায়নিক, ধাতু এবং খনির খাতের তথ্য, বিশ্লেষণ এবং পরামর্শ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জি-র ফ্রেজার ম্যাককে বলেন, এখন বিনিয়োগ শুরু করলেও বাজারে নতুন তেল আসতে তিন থেকে নয় মাস সময় লাগবে।
নরওয়েভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় স্বাধীন জ্বালানি গবেষণা ও বিজনেস ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি রাইস্ট্যাড-এর ম্যাথিউ বার্নস্টাইন জানান, কম বিনিয়োগের কারণে দ্রুত উৎপাদনে আনা যায় এমন কূপের সংখ্যা কমে গেছে।
বিশ্বে অস্থিরতা হলেও আমেরিকার প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে তেমন প্রভাব পড়ে না। তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গ এনইএফ-এর এনরিক গঞ্জালেজের মতে, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে ইরান সংঘাতের ফলে আমেরিকার গ্যাস উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা কম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ সংকট দাম ও মুনাফা বাড়াবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি চাহিদা হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে এশিয়ায়, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেশি, এরইমধ্যে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
এর আগেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন যে, জলবায়ু আইন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের বৃদ্ধির কারণে তেলের চাহিদা শিগগিরই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে কমতে শুরু করতে পারে। তবে বর্তমানে আমেরিকার তেল ব্যবসায়ীরা উচ্চ দামে মুনাফা উপভোগ করলেও এই উচ্ছ্বআস কতদিন টিকবে এটাই মূলত প্রশ্ন থেকে যায়।
/ইউএমএইচ