জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধানসম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা নিয়ে আলোচনার জন্য জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার আনা মুলতবি প্রস্তাবের ওপর মঙ্গলবার দুই ঘণ্টার আলোচনার সময় নির্ধারণ করেছেন ডেপুটি স্পিকার। তবে এ সময় নোটিস সংশোধনের ইস্যুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ডেপুটি স্পিকারের সামান্য বিতর্কের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে রুলিং দিয়ে পরবর্তী কার্যক্রমে চলে যান স্পিকার।
রোববার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ নিয়ে আলোচনার প্রস্তাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। স্পিকারের অনুপস্থিতিতে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান আগে সংসদ মুলতবি করে তাদের প্রস্তাবিত বিষয়ে আলোচনায় যাওয়ার জন্য আহ্বান জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য শোনেন ডেপুটি স্পিকার। পরে তিনি রুলিং দিয়ে বলেন, সবার বক্তব্য শ্রবণ করে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি ৬৫-এর ২ অনুযায়ী আমাদের তিন দিনের মধ্যে এই বিষয়টাকে নিষ্পত্তি করতে হবে। সেই হিসাবে ৩১ মার্চ দিনের সর্বশেষ বিষয় হিসাবে দুই ঘণ্টাকাল বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য সময় নির্ধারণ করছি।
তবে স্পিকারের এই রুলিংয়ের পর ফ্লোর নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি মঙ্গলবারের আলোচনার সঙ্গে সম্মতি প্রকাশ করছি। তারা হয়তো মনে করছেন আমি বিরোধিতা করব। তবে আলোচনা যদি নির্ধারণ করতে চান, তা হলে আপনাকে নোটিসটা একটু সংশোধন করে নিতে হবে। এটাই আমার বক্তব্য।
এ সময় ডেপুটি স্পিকার তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, যদি সম্মতিই প্রকাশ করেন, তা হলে তো আর নতুন করে কথা বলার দরকার নেই। আমার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে (মাই ডিসিশন অলরেডি হ্যাজ বিন প্রোনাউন্সড)। আপনারা দয়া করে নিজ নিজ আসনে বসুন।
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথা বলার চেষ্টা করলে স্পিকার তাকে আবারও থামিয়ে দিয়ে বলেন, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মাই ডিসিশন অলরেডি হ্যাজ বিন প্রোনাউন্সড। ৩১ মার্চ নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ আলোচনার জন্য দুই ঘণ্টা সময় থাকবে। আমরা পরবর্তী কার্যসূচিতে যাচ্ছি।
এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আপনি রুলিং দেওয়ার পরে এ বিষয়ের ওপরে আর কোনো কথা চলে না। পরে ডেপুটি স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতাসহ সবাইকে শান্ত হওয়ার ও আসনে বসার আহ্বান জানান। এরপর রুলিং পাস হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি সংসদে আসা দ্বিতীয় মুলতবি প্রস্তাবের নোটিস নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রমে এগিয়ে যান।
তবে এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন, বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাব আনা সঠিক হয়নি। জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর পর্বে এই নোটিস উত্থাপন সঠিক হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এর আগে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধানসম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা নিয়ে আলোচনার জন্য সংসদে নোটিস দেন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। এই নোটিসের ওপর কখন আলোচনা হবে, তা নিয়ে রোববার সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে অনির্ধারিত বিতর্ক হয়। বিকালে সংসদের বৈঠকে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হওয়ার পরপরই পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নোটিসটি সংসদে উত্থাপন করেন এবং এটি নিয়ে আলোচনা করার দাবি জানান।
কিন্তু সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী আগে প্রশ্নোত্তর ও জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিসের ওপর আলোচনা শেষ করতে হবে। এরপর অন্য কোনো নোটিস নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
পরে সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল জানান, দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিসের ওপর আলোচনা শেষে বিরোধী দলের আনা নোটিসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, এই পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার শেষ দিন ছিল গত ১৫ মার্চ। সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিরোধী দলকে বিধি অনুযায়ী নোটিস দেওয়ার পরামর্শ দেন।
ঈদের ছুটির পর রোববার সংসদের অধিবেশন আবার শুরু হয়। সংবিধান সংস্কার পরিষদের গঠন নিয়ে আলোচনার জন্য নোটিস দেয় বিরোধী দল। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নোটিসটি সংসদে উত্থাপন করে বলেন, ১৫ মার্চ তিনি পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে একটি অতি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেছিলেন। স্পিকার পরামর্শ দিয়েছিলেন নোটিস আনার জন্য। তারা সেটা করেছেন। তিনি এই নোটিস সংসদে উত্থাপন করলেন। তিনি নোটিসটি গ্রহণ করে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের বিষয়ে আলোচনার দাবি জানান।
এর পরপরই ফ্লোর নিয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর ও বিধি-৭১-এর নোটিসের আলোচনা শেষে অন্য বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। জবাবে বিরোধদলীয় নেতা বলেন, প্রশ্নোত্তরের পরেই এ আলোচনা হবে। তিনি সে মোতাবেকই দাঁড়িয়েছেন।
এরপর ফ্লোর নিয়ে কথা বলতে চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তখন বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানান। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কথা বলার সুযোগ দেন স্পিকার। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। সরকারি দল বিধিমোতাবেক আলোচনার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে। রীতি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধির পর মুলতবি প্রস্তাব আলোচনা হতে পারে। তখন সরকারি দলও পয়েন্ট অব অর্ডারে কিছু কথা বলবে। তিনি স্পিকারকে বিধিমোতাবেক এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে কীভাবে এই সংসদ গঠিত হয়েছে, তা সবাই ভুলে যাচ্ছে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও হয়েছিল। কিন্তু এখন কার্যক্রম দেখলে মনে হয় এ ধরনের কিছুই হয়নি। এটি সবচেয়ে বেশি জনগুরুত্বপূর্ণ, এ সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত, এর সুরাহা হওয়া উচিত। তারপর নিয়মিত সব কার্যক্রম হওয়া উচিত। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা বিধিমোতাবেকই নোটিস দিয়েছেন। সেটা নিয়ে আগে আলোচনা করার অনুরোধ করেন তিনি।
তবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, স্পিকার চাইলে অনুমতি দিতে পারেন। কিন্তু প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এগুলো সংসদ সদস্যদের অধিকার। এ দুটি কার্যসূচির জন্য ২ ঘণ্টা বরাদ্দ। এরপর অন্য সব বিষয়ে আলোচনা আসতে পারে। তাদের দিক থেকে অসুবিধা নেই।
পরে সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, তিনি বিরোধী দলের নোটিসটি পেয়েছেন। তিনি এটা অ্যাড্রেস করবেন। সংসদের রীতি মেনে বিধি-৭১-এর নোটিসগুলো নিয়ে আলোচনা শেষে তিনি বিরোধী দলের আনা নোটিসটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
এফআর