দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে ঋণনির্ভর উন্নয়ন কৌশল অনুসরণ করে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দেশের সরকারি ঋণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এর প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে নেওয়া বিপুল ঋণের চাপ ক্রমেই বেড়ে গিয়ে বর্তমান সময়ে এসে তা অর্থনীতির জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব, ফলে নতুন সরকারের সামনে শুরুতেই তৈরি হয়েছে এক কঠিন বাস্তবতা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ঋণের ভার সামাল দেওয়া, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সবকিছু মিলিয়ে এখন প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ও সতর্ক নীতি-পদক্ষেপ।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ কোটি টাকার মতো। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের সময় আওয়ামী লীগ দেশের মোট ঋণ রেখে গিয়েছিল ১৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকায়। এর পর বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকার মোট ঋণকে নিয়ে গেছে আরও উচ্চতায়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বিদায়ের সময় দেশের মোট ঋণ রেখে যায় প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের ঘাড়ে এখন পড়েছে ওই পাহাড়সম ঋণের বোঝা। বিগত ওই দুই সরকারের ঋণের বোঝা টানতে এখন গলদঘর্ম হতে হচ্ছে নতুন সরকারকে।
এদিকে এ বিশাল অঙ্কের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই নতুন সরকারকে আরেক মহাসংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাব। একদিকে বিশাল ঋণের দায় মেটানোর চাপ, অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটে অর্থনীতিতে সৃষ্টি হওয়া নতুন চাপ সামলাতে হচ্ছে বর্তমান সরকারকে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দায়িত্ব নিয়েই বিএনপির নতুন সরকারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে। সরকারের পথচলাটা মসৃণ হলো না। সংকটের এ সময় অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসহ দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হলে নতুন সরকারকে সাবধানে ও ভেবেচিন্তে পা ফেলতে হবে এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এমন মন্তব্য করে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘বিএনপি সরকার একটা নড়বড়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার একের পর এক মেগা প্রকল্প নিয়ে দেদার ঋণের বোঝা বাড়িয়েছে। আবার ওই ঋণের টাকা পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে। এরপর চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারও ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে গেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার ভঙ্গুর অর্থনীতিকে কিছুটা সচল করতে পারলেও রাজস্ব আয় বাড়াতে না পারা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় সংকট কাটানো যায়নি। তাই নড়বড়ে অর্থনীতি নিয়ে পথচলা শুরু করতে হয়েছে বিএনপি সরকারকে। নতুন সরকারের পথচলাটা আরও কঠিন করে তুলেছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যকে গতিশীল রাখতে জ্বালানি তেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম যেভাবে লাফিয়ে বাড়ছে তার প্রভাব ইতিমধ্যেই বেশ প্রকটভাবে পড়েছে দেশেও। দেশের অর্থনীতির সামনে এখন মহাবিপদ সংকেত। এই বিপদের সময় নতুন সরকারকে অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় সে দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এরপর রফতানি বাণিজ্য যেকোনো মূল্যে সচল রাখতে হবে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
সরকারের ঘাড়ে এখন ঋণের বোঝা কত
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সরকার ব্যাংকিং উৎস থেকে ৬১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা নিয়েছে। পাশাপাশি এ সময়ে এসেছে ১০৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারের নিট বৈদেশিক ঋণ। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ১০৩ কোটি টাকায়। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে সরকার দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে ৭৪ হাজার ২৫১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ২৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা।
এ অবস্থার মধ্যেই বাংলাদেশের পুঞ্জীভূত বিদেশি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সরকারি ও বেসরকারি খাতে নেওয়া মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ১১২ বিলিয়ন দশমিক ২২ ডলার। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে বিদেশি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন বা ১৩০ কোটি ডলার।
বিদেশি ঋণের হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
গত বছরের জুনের তুলনায় সেপ্টেম্বরে পুঞ্জীভূত বিদেশি ঋণের পরিমাণ কমেছিল। গত জুন পর্যন্ত বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিদেশি ঋণের পরিমাণ কমে যাওয়ার পর ডিসেম্বরে এসে তা ফের বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণই বেশি বেড়েছে। বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ২ শতাংশের বেশি। আর সরকারি খাতে বেড়েছে ১ শতাংশের কিছু কম।
ডিসেম্বর শেষে সরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। আর বেসরকারি খাতে ২০ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশি উৎসের মোট ঋণের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৮৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। বাকি ১২ দশমিক ৩৮ শতাংশ স্বল্পমেয়াদি ঋণ। দীর্ঘমেয়াদি ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে এসেছে। এ ধরনের ঋণ ৪১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
দ্বিপক্ষীয় বিদেশি ঋণ ২৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট আছে শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ আছে ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বাণিজ্যিক ঋণ আছে মোট ঋণের ৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য ঋণ ২ দশমিক ১৩ শতাংশ।
ব্যাংক ঋণও বেশি নিচ্ছে সরকার
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকায়। আগের বছরের ডিসেম্বর শেষে এর পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৫১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। এ ঋণের ৫৭ শতাংশ বা ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকাই নিয়েছে সরকার।
ব্যাংকিং উৎস থেকে গত বছর শেষে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা, আগের বছরে যা ছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমে ৪৭ হাজার ৬১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
মুদ্রানীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকার তার চেয়েও বেশি নিয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে ব্যাংক খাতের সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল সাড়ে ২০ শতাংশ, যদিও তা ২৮ দশমিক ৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সরকারের ঋণ চাহিদা বেশি থাকায় চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়িয়ে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
অপরদিকে দেশের বেসরকারি খাতে কয়েক বছর ধরেই বিনিয়োগ স্থবিরতা চলছে। তবে চলতি অর্থবছরে এসে তা আরও তীব্র হয়। গত বছরের জুলাইয়ে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ দশমিক ১ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ২৪ কোটি টাকা। এক বছর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। ফলে বছরের ব্যবধানে বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা।