কাঠফাটা রোদে ঝলসে ওঠা দুপুর, পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘশ্বাসে ভরা লাইন যেখানে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে শুধু এক ফোঁটা জ্বালানির অপেক্ষায়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে হাজার মাইল দূরের এই ভূখণ্ডেও; তারই প্রতিফলন যেন দেখা যাচ্ছে দেশের প্রতিটি সড়কে, প্রতিটি পাম্পে, প্রতিটি অপেক্ষমাণ মানুষের চোখে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও যখন তেলের দেখা মেলে না, তখন নিয়মের পথ ছেড়ে অনেকে খুঁজে নিচ্ছেন অন্য এক ‘সুবিধার’ রাস্তা পরিচয়ের জোর, ক্ষমতার ছায়া, কিংবা সেই চিরচেনা ‘মামু-খালু’র ফোনকল।
একসময় যে তদবির ছিল চাকরি বা সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার হাতিয়ার, আজ তা নেমে এসেছে জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর স্তরে। জ্বালানি তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় একটি পণ্য পেতে এখন দরকার হয়ে পড়ছে প্রভাবশালীদের সুপারিশ, ফোনকল আর অদৃশ্য ‘সিস্টেম’। এই বাস্তবতা শুধু সংকটের চিত্রই তুলে ধরে না, বরং সমাজের ভেতরে গেঁথে থাকা বৈষম্য ও প্রভাবের অদৃশ্য জালের কথাও স্পষ্ট করে দেয় যেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ আর ফোনের ওপারে থাকা ‘বিশেষ’ মানুষের মধ্যে ব্যবধানটা ক্রমেই আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক নেতা, সরকারি বড় কোনো আমলা, পুলিশ প্রশাসনের বড় কোনো কর্তাব্যক্তি বা এলাকার কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দিয়ে ফোন করানো হচ্ছে তেল পাম্পের মালিক বা পাম্পের ম্যানেজারের কাছে। প্রভাবশালীদের দিয়ে ফোন করানো হচ্ছে যাতে দীর্ঘ লাইন ছাড়াই ‘সিস্টেম’ করে বিকল্প পন্থায় তেল নেওয়া যায়। হ্যাঁ-জ্বালানি তেল নিতে এখন এভাবে ‘মামু-খালু’ দিয়ে তদবির করানো হচ্ছে।
প্রভাবশালী ‘মামু-খালু’রাও ফোন দিয়ে বলে দিচ্ছেন ‘আমি একজনকে পাঠাচ্ছি, তেল যেন দেওয়া হয়।’
ঠিক এমনই ‘মামু-খালুর’ ফোন করার তথ্য মেলে সময়ের আলোর কাছে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা একটি গণপরিবহনে করে সপরিবারে ঢাকায় ফিরছিলেন এক ব্যক্তি। গাড়িটি কুষ্টিয়া থেকে রাজবাড়ীতে আসার পর তার ফোনে একটি কল আসে। ফোন কল আসবে, ফোনে কথা বলবে এটাই তো স্বাভাবিক। এটা আবার এমন কী ঘটনা। কিন্তু ওই ব্যক্তি যখন ফোনের অপর পাশে থাকা ব্যক্তিকে বলছেন ‘পাম্প মালিককে আমি এখনই ফোন করে বলে দিচ্ছি, তুমি গিয়ে আমার পরিচয় দিয়ে ২ হাজার টাকার তেল নিয়ে এসো।’ বোঝা গেল ফোনের ওই পারের ব্যক্তি জ্বালানি তেল নিতে তার কাছে তদবির করছেন। এক সিট পরেই বসা ছিলেন এই প্রতিবেদক। গাড়ির ওই যাত্রীর কথপোকথনের শব্দগুলো কানে আসামাত্রই প্রতিবেদক তার পরবর্তী কথা-বার্তা আরও মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করেন।
যে ব্যক্তিকে তিনি তেল নিতে যাওয়ার নির্দেশ দেন তার সঙ্গে কথা বলা শেষ করেই তিনি ফোন দেন আরেকজনকে। অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে এবার তিনি বলেন, ‘ভাই আমি আরিফ মাহমুদ বলছি, আপনার পাম্পে আমার পরিচয়ে কালাম নামের একজন যাবে তাকে ২ হাজার টাকার তেল দিয়েন।’ পরে আরও কিছু কথা-বার্তা বলেন তার সঙ্গে, এরপর কলটি কেটে দিয়ে ওই প্রথম ব্যক্তির নম্বরে আবারও কল দেন তিনি।
এবার তিনি ফোনে বলেন, ‘কালাম আমি পাম্প মালিককে বলে দিয়েছি, তুমি দ্রুত গিয়ে আমার পরিচয় দিও। আমি বলেছি তোমাকে যেন ২ হাজার টাকার তেল দেয় এবং তোমাকে কোনো লাইনে দাঁড়াতে হবে না। সেখানে গেলেই তারা সিস্টেম করে তোমাকে তেল দিয়ে দেবে। তারপরও কোনো সমস্যা হলে তুমি আমাকে ফোন দিও।’ এ কথা বলেই তিনি ফোনটি রেখে দেন।
মিনিট দশেক পর আরিফ মাহমুদ নামের ওই যাত্রী আবারও ফোনে আরেকজনকে বলেন, ‘আমি একটু আগেই তো একজনকে পাম্পে পাঠালাম তেল নেওয়ার জন্য, আবার তুমিও বলছ। আচ্ছা ঠিক আছে, দেখি কী করা যায়।’ এ কথা বলেই তিনি আবারও ওই পেট্রোল পাম্পের মালিককে ফোন দিয়ে বলেন, ‘ভাই আপনাকে একটু বেশিই জ্বালানো হচ্ছে, আমার আরেক ছোটভাইকে পাঠাচ্ছি আপনার পাম্পে তারও কয়েক লিটার তেল লাগবে ব্যবস্থা করবেন আশা করি। বোঝেনই তো দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক কষ্টের, ছোট ভাই-ব্রাদার আবদার করছে না করতে পারছি না।’
আগের মতোই পেট্রোল পাম্পের মালিকের সঙ্গে কথা শেষ করেই আবারও ফোন দিয়ে বলেন, ‘শফিক, আমি বলে দিয়েছি পাম্প মালিককে তুমি যাও, গিয়ে আমার কথা বলো, তেল দিয়ে দেবে। তবে আর অনুরোধ করো না। আমি বারবার বলতে পারব না আমারও তো প্রেসটিজ আছে।’
এই প্রতিবেদক পরে আরিফ মাহমুদ নামের ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানতে চান ‘ভাই আপনি কী করেন, তেলের জন্য তো বেশ তদবির করছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি কুষ্টিয়া শহরে। রাজনীতি করি এবং আমার নিজের ব্যবসাও আছে। কুষ্টিয়ার বেশ কয়েকটি পেট্রোল পাম্পের মালিকের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেওয়ার পর থেকেই আমাকে প্রতিদিনই এভাবে তেলের জন্য তদবির করতে হয়। আমার ফোন পেয়েই পাম্প মালিক বিকল্প পন্থায় আমার পাঠানো লোকদের তেল দিয়ে দেন।’
বিকল্প পন্থাটা কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা তারাই সিস্টেম করে রেখেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তেলের জন্য শুধু আমি তদবির করছি বিষয়টি এমন না। আমার জানামতে, সরকারি বড় কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসনের লোকজন এবং রাজনৈতিক দলের নেতারাও ফোন দিয়ে তদবির করছেন এভাবে বিকল্প পন্থায় জ্বালানি তেল দেওয়ার জন্য। এভাবে তদবির করে অনেকেই এখন তেল নিচ্ছেন। কারণ তেলের যে সংকট দেখা দিয়েছে পাম্পগুলোতে তাতে রাত থেকে দিন অবধি পাম্পে বসে থাকতে হচ্ছে। এই বিড়ম্বনা এড়াতেই যাদের ওপর লেবেলে পরিচয় আছে তারা তদবির করে জ্বালানি তেল নিচ্ছেন।’
পাবনায় তেল না পেয়ে কৃষিমন্ত্রীকে ফোন :
এদিকে তেল সংকটের কারণে পাবনায় চাষাবাদে ব্যাপক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আর সেই সংকট নিরসনের লক্ষ্যে কৃষিমন্ত্রীকে তেলের জন্য মুঠোফোনে সরাসরি ফোন দেন পাবনা ঈশ্বরদী উপজেলার জাতীয় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত কৃষক নেতা কুল ময়েজ।
প্রায় ৪০ জন কৃষক এক হয়ে রোববার বিকালে তেল সমস্যা সমাধানের জন্য গিয়েছিলেন ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ে। সেখান থেকে কোনো সমাধান না পেয়ে ওই কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকেই কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদকে ফোন দেন। এ সময় ফোনে কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তাকে কথা বলিয়ে দেন তিনি। এ সময় তাৎক্ষণাৎ মন্ত্রী সমস্যা সমাধানের জন্য ওই কৃষি কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।
কৃষক মো. ময়েজ উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি ফসল আবাদেই আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করা হয়। সেচসহ মারাই, হারভেস্টার, জমি চাষে পাওয়ার ট্রিলার এমনকি কীটনাশক ছিটাতেও যন্ত্রচালিত স্প্রে ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি যন্ত্র চালাতেই দরকার তেলের। কিন্তু যন্ত্রগুলো বহন করে তেল পাম্পে নিয়ে যাওয়া তো সম্ভব নয়। ফলে তারা দীর্ঘদিন ধরে ক্যানে তেল নিয়ে আসতেন সবাই। বর্তমানে ক্যানে তেল দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা জারির কারণে পাম্প কর্তৃপক্ষ তাদের তেল দিচ্ছে না। এতে উপজেলার শত শত কৃষক বিপাকে পড়েছেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মমিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, তিনি (ময়েজ উদ্দিন) কৃষিমন্ত্রীর কথা বলে ফোন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ফোনের ওপার থেকে সমস্যা সমাধান করতে বলেছেন। আমরা সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছি। তেলের জন্য পাম্পগুলোতে নতুন করে প্যাড ছাপতে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তেল পাম্পগুলোর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অনেক কৃষকই আজ (মঙ্গলবার) তেল পেয়েছেন। আশা করছি, আগামীকাল থেকে সবাই তেল পাবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, মূলত ঢোপে তেল নিতে গেলে মোটরসাইকেল চালকরা বাধা দেন। এতে ভুল বোঝাবুঝি ও বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। তবে সমস্যা সমাধানে আমরা ইতিমধ্যেই বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। কৃষি বিভাগকে বিষয়টি তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাম্প মালিকদের সঙ্গেও কয়েক দফা বৈঠক করা হয়েছে। আশা করছি, আর সমস্যা থাকবে না।
মো. ময়েজ উদ্দিনের দাবি, তেল সমস্যা সমাধানে কয়েক দিন হলো উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষকদের চিরকুট দিচ্ছিলেন। কিন্তু তাতেও পাম্প কর্তৃপক্ষ তেল দিচ্ছে না। ফলে রোববার বিকালে তারা ৪০ জন কৃষক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মমিনের কার্যালয়ে যান। সেখানে সমস্যার সমাধান না পেয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদকে ফোন দেন। মন্ত্রীর সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তাকে কথা বলিয়েছেন। মন্ত্রী তৎক্ষণাৎ সমস্যা সমাধানে কৃষি কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু দুই দিন পর মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত তাদের অনেকেই পাম্পে গিয়ে তেল না পেয়ে ফিরে এসেছেন।
তিনি বলেন, জীবনেও কোনো মন্ত্রী আমাদের সঙ্গে এতক্ষণ ধরে এত সুন্দর করে কথা বলেননি। কিন্তু আমাদের সঙ্গে তিনি অনেকক্ষণ ধরে কথা বলেছেন। অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। আবার তাৎক্ষণিক বিষয়টির ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।