৭২-এর সংবিধান ও জেনজি

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

জাতীয়

সংবিধান হলো একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পবিত্র প্রতীক, যা দেশের প্রতিটি মানুষের ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার বাতিঘর

2026-04-01T05:47:23+00:00
2026-04-01T05:47:23+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
৭২-এর সংবিধান ও জেনজি
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:৪৭ এএম 
সংগৃহীত ছবি
সংবিধান হলো একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পবিত্র প্রতীক, যা দেশের প্রতিটি মানুষের ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার বাতিঘর হিসেবে গণ্য। এটি কেবল আইন নয়, বরং একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা, একতা এবং আত্মমর্যাদার জীবন্ত দলিল, যা রাষ্ট্রীয় পরিচয়েরও ভিত্তি।

ওই রূপ বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধান কেবল একটি আইনি দলিল নয়, এটি ৩০ লাখ শহিদের রক্তে ভেজা বাংলার মাটির এক অবিনাশী মহাকাব্য। এটি আমাদের অস্তিত্বের দর্পণ, যেখানে প্রতিফলিত হয়েছে একটি জাতির সহস্রাব্দের স্বপ্ন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল নেতৃত্ব যাকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘জনগণের ইচ্ছার মূর্ত প্রতীক’ হিসেবে। একটি দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর প্রাপ্ত এই সংবিধান আমাদের জাতীয় সত্তার রক্ষাকবচ।

এই কারণে আজকের ‘জেনজি’ বা নতুন প্রজন্মের কাছে এই সংবিধানের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এটিই তাদের পরিচয় দেয় যে তারা কোনো উপজাতীয় বা গোষ্ঠীগত পরিচয় নয়, বরং একটি স্বাধীন-সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গর্বিত নাগরিক। কবিগুরুর ভাষায় যেমন বলা যায়, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’-এর সংবিধান বাঙালির সেই শির উঁচু করে দাঁড়ানোর হিমালয়প্রতিম ভিত্তি।

বাংলাদেশের মূল সংবিধানের কয়েকটি দিক এখানে সংক্ষিপ্ত রূপে তুলে ধরা হলো : সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। এটি কেবল শব্দ নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চাবিকাঠি। নাগরিকের ইচ্ছাই যে রাষ্ট্রের শেষ কথা, এই ঘোষণা স্বৈরতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করে।

অনুচ্ছেদ ১১ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, প্রশাসনে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হবে গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য। এটি একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রথম ধাপ, যেখানে ব্যালটের মাধ্যমে মানুষের মতের প্রতিফলন ঘটে।
১২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, বরং ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার রোধ এবং সকল ধর্মের মানুষের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা। এটি বাঙালির হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আইনি রূপ।

১০ অনুচ্ছেদে মানুষের ওপর মানুষের শোষণ থেকে মুক্তি দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও সুষম বণ্টনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সাম্য আনাই ছিল এই দর্শনের লক্ষ্য।

৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত ঐক্যে যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম করেছে, সেই একতাই হবে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। এটি আমাদের জাতিগত স্বকীয়তার মূল ভিত্তি।

সংবিধানের তৃতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ২৬-৪৭) মানুষের চলাফেরা, বাকস্বাধীনতা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো আইন যদি মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।

৭২-এর সংবিধান একটি শক্তিশালী সংসদীয় ব্যবস্থার কথা বলে, যেখানে সরকার সরাসরি জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। এটি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায়।

২২ অনুচ্ছেদে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। বিচার বিভাগ স্বাধীন না হলে নাগরিকের অধিকার যে কেবল কাগজে-কলমেই থেকে যায়, তা ৭২-এর সংবিধান অনুধাবন করেছিল। ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনের চোখে সবাই সমান। রাজা কিংবা প্রজা আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এই সাম্যই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড।

১৩ অনুচ্ছেদে উৎপাদনের উপকরণের ওপর জনগণের মালিকানার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে রাষ্ট্র কোনো পুঁজিপতির নয়, বরং সাধারণ মেহনতি মানুষের।

১২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রাপ্তবয়স্ক সব নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নাগরিকের সরাসরি অংশীদারত্ব নিশ্চিত করে। ১১৮ অনুচ্ছেদে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের কথা বলা হয়েছে, যা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে। 

১৫ অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা মেটানোকে রাষ্ট্রের প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

৭৭ অনুচ্ছেদে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে, যা সুশাসন ও স্বচ্ছতার প্রতীক। ১৪২ অনুচ্ছেদে সংবিধান পরিবর্তনের পদ্ধতি রাখা হয়েছে, যাতে যুগের প্রয়োজনে জনস্বার্থে সংবিধানকে আরও সমৃদ্ধ করা যায়। এটি সংবিধানকে একটি ‘জীবন্ত দলিল’ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

৩ অনুচ্ছেদে ‘বাংলা’কে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মহান বিজয়কে এটি সাংবিধানিক মর্যাদাদান করেছে। ২৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। জেনজি নারীদের জন্য এটি এক বিশাল রক্ষাকবচ। ১৮(ক) অনুচ্ছেদে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে, যা আজকের বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত আধুনিক চিন্তা। 

২৫ অনুচ্ছেদে সাম্রাজ্যবাদ ও বর্ণবাদের বিরোধিতা করে সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং বিশ্বশান্তি স্থাপনের নীতি গৃহীত হয়েছে।

৪ ও ৫ অনুচ্ছেদে ‘আমার সোনার বাংলা’ এবং লাল-সবুজের পতাকাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের আবেগ ও অনুপ্রেরণার উৎস।

নিবন্ধের এ পর্যায়ে জেনজিদের বিভ্রান্তি এড়াতে কয়েকটি পরামর্শ প্রদান করা হলো : সোশ্যাল মিডিয়ার চটকদার তথ্যে বিভ্রান্ত না হয়ে সংবিধান নিয়ে দেশপ্রেমিক গবেষক ও আইনবিদদের মতামত বিচার করতে হবে। সঠিক দিকনির্দেশনা ছাড়া গভীর দর্শন বোঝা কঠিন। কোনো তৃতীয় পক্ষের ব্যাখ্যা শোনার আগে সরাসরি সংবিধানের ‘মূলপাঠ’ পড়া জরুরি। এতে মূল বার্তার অপব্যাখ্যা রোধ করা সম্ভব হয়।

সংবিধান কেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছে, তা বুঝতে ৫২ থেকে ৭১-এর ইতিহাস জানা প্রয়োজন। ইতিহাসের জ্ঞানই সংবিধানে বর্ণিত প্রতিটি শব্দের গুরুত্ব অনুধাবন করাবে। একজন নাগরিক হিসেবে নিজের অধিকার কী কী, তা সংবিধানেই লেখা আছে। অধিকার জানলে কেউ আপনাকে বিভ্রান্ত করতে বা আপনার ওপর শোষণ চালাতে পারবে না। আবেগ বা গুজবের বশবর্তী না হয়ে প্রতিটি বিষয় যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। যুক্তি দিয়ে দেখলে বোঝা যাবে ৭২-এর সংবিধান কতটা আধুনিক ছিল।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রচুর ভুল তথ্য ছড়ায়। সংবিধান বিষয়ক যেকোনো তথ্যের জন্য সরকারি গেজেট বা নির্ভরযোগ্য লাইব্রেরির ওপর নির্ভর করা শ্রেয়। রাজনৈতিক চশমা সরিয়ে রেখে একজন নিরপেক্ষ নাগরিক হিসেবে সংবিধানকে পাঠ করতে হবে। তবেই এর সুমহান মানবিক দিকগুলো ফুটে উঠবে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সংবিধান নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। কোনো স্পর্শকাতর বিষয়ে শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা জেনজিদের অন্যতম নাগরিক দায়িত্ব। দেশের সর্বোচ্চ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা নাগরিকত্বের প্রধান শর্ত। সংবিধানের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের চুক্তি সম্পন্ন হয়, তাই এর অবমাননা রাষ্ট্রেরই অবমাননা। 

জেনজিদের উচিত ক্লাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বা অনলাইনে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা নিয়ে গঠনমূলক বিতর্কে অংশ নেওয়া। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে।

পরিশেষে, ৭২-এর সংবিধান আমাদের উত্তরাধিকার, আমাদের অহংকার। জেনজি প্রজন্ম যদি এই সংবিধানকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারে, তবে বাংলাদেশ কখনোই পথ হারাবে না। এটি কেবল আইন নয়, এটি আমাদের স্বাধীনতার রক্তঝরা ফসলের মানচিত্র। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় বলতে গেলে, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর সংবিধানের মাঝেও আমরা যেন সেই চিরকালীন মানবিক বাংলার রূপ খুঁজে পাই। আসুন, এই পবিত্র দলিলের আদর্শকে বুকে ধারণ করে আমরা এক সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলি।


  বিষয়:   সংবিধান  রাষ্ট্র  অস্তিত্ব 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: