ভূমধ্যসাগরে আবারও বাংলাদেশি অভিবাসীদের করুণ মৃত্যু আমাদের জাতীয় বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের এক চলমান সংকটের নির্মম ও ভয়াবহ প্রতিফলন। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে উত্তাল সমুদ্রে অনাহার, পানিশূন্যতা এবং চরম ক্লান্তিতে অন্তত ২০ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর সত্যিই হৃদয়বিদারক। এই ট্র্যাজেডিগুলো আমাদের সামনে এক রূঢ় ও কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে।
উন্নত জীবনের আশায় এবং পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে হাজারো মানুষ প্রতি বছর অবৈধপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের দেশের অনেক তরুণ মনে করেন যে, যেকোনো উপায়ে ইউরোপে পৌঁছাতে পারলেই তাদের সব দুঃখ ঘুচে যাবে। এই অন্ধ বিশ্বাসের সুযোগ নেয় সংঘবদ্ধ দালাল চক্র। তারা দুর্গম মরুভূমি আর বিপজ্জনক সমুদ্রপথকে সহজপথ হিসেবে বর্ণনা করে সহজ-সরল মানুষকে প্রলুব্ধ করে। অথচ সেই পথের প্রতিটি বাঁকে যে ওত পেতে আছে নিশ্চিত মৃত্যু, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না।
আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী বা দালাল চক্র এই অসহায় মানুষদের সামনে মিথ্যা স্বপ্নের এক মায়াজাল বুনে দেয়। তাদের কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই; তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো অর্থ উপার্জন। লাভের জন্য তারা নির্দ্বিধায় শত শত মানুষকে জরাজীর্ণ নৌকায় গাদাগাদি করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। লিবিয়ার বন্দিশালায় নিয়ে গিয়ে অনেক সময় মুক্তিপণ আদায়ের জন্য তাদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। দালালদের এই নিষ্ঠুরতা আধুনিক যুগের দাসপ্রথার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, যা মানবতাকে লজ্জিত করে।
মানবজীবন কোনোভাবেই এত সস্তা হতে পারে না। একটি দেশ যখন উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন কেন আমাদের মেধাবী তরুণরা এভাবে অকাতরে প্রাণ হারাবে? প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে আছে একটি পরিবারের কান্না এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া হাজারো স্বপ্ন। জীবন বাজি রেখে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে, আমাদের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় এখনও কোথাও গভীর ক্ষত রয়ে গেছে। কেবল ভাগ্যোন্নয়নের নেশায় নিজেকে যমদূতের হাতে তুলে দেওয়া কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের কাজ হতে পারে না।
লিবিয়া বর্তমানে মানব পাচারের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। এখান থেকেই ছোট ও অনিরাপদ রাবার বোট বা কাঠের নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সাগরের মাঝপথে নৌকার ইঞ্জিন বিকল হওয়া বা অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে ডুবে যাওয়া একটি নিয়মিত ঘটনা। লিবিয়ার উপকূল থেকে ইতালির ল্যাম্পেডুসা বা গ্রিসের দ্বীপে পৌঁছানোর এই পথটি বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিবাসন পথ হিসেবে স্বীকৃত।
অনেক সময় পরিবারের অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং সামাজিক মর্যাদার লড়াই একজন তরুণকে অবৈধপথে ঠেলে দেয়। আত্মীয় বা প্রতিবেশী কেউ বিদেশ গিয়ে বড় দালান তুলেছেন এমন দৃশ্য দেখে অন্য পরিবারগুলোও তাদের সন্তানদের বিদেশে পাঠানোর জন্য চাপ দেয়। জমি বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে দালালের হাতে টাকা তুলে দেওয়া হয়। যখন এই বিনিয়োগ ব্যর্থ হয় এবং সন্তান ফিরে আসে না, তখন সেই পরিবারের ওপর নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। এই অসুস্থ সামাজিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করা জরুরি।
দেশীয় শ্রমবাজারে মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাব অনেককে দেশান্তরী হতে বাধ্য করছে। তবে অধিকাংশ অভিবাসীই অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যদি এই তরুণদের দেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বৈধপথে পাঠানো যেত, তবে তারা সম্মানজনক কাজ পেতেন। অদক্ষতার কারণেই তারা অবৈধপথ বেছে নেন এবং বিদেশের মাটিতেও শোষণের শিকার হন। জনশক্তি রফতানি খাতে স্বচ্ছতা আনা এবং দালালের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরকারি তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন।
ইউরোপের দেশগুলোর কঠোর অভিবাসন নীতি অনেক সময় মানুষকে অনিরাপদ রুট বেছে নিতে বাধ্য করে। সীমান্ত প্রাচীর তোলা বা পুশব্যাক করার মাধ্যমে অভিবাসন ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না, বরং এতে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত অভিবাসনের মূল কারণগুলো নিয়ে কাজ করা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানো। লিবিয়ার অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিও মানব পাচারকারীদের জন্য স্বর্গরাজ্য তৈরি করেছে। বৈশ্বিক এই সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আরও জোরালো ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
দালালরা এখন সোশ্যাল মিডিয়া বা ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে চটকদার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। ‘গেম’ বা ‘ডুব দেওয়া’র মতো সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করে তারা তরুণদের মগজ ধোলাই করছে। অথচ এই প্রচারের বিপরীতে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম অনেক কম। গ্রামেগঞ্জে মাইকিং, নাটক বা শর্ট ফিল্মের মাধ্যমে অবৈধপথের ভয়াবহতা তুলে ধরতে হবে। যখন একজন মানুষ জানবেন যে এই পথে ফিরে আসার গ্যারান্টি নেই, তখন তিনি দালালের কথায় পা দেওয়ার আগে অন্তত দুবার ভাববেন।
ভূমধ্যসাগরে বেসরকারি উদ্ধারকারী জাহাজগুলোর কার্যক্রম অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। ইউরোপীয় দেশগুলো অনেক সময় উদ্ধারকৃত অভিবাসীদের আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে। এর ফলে সাগরের মাঝেই অনেক দিন মানবেতর জীবন কাটাতে হয় অভিবাসীদের। খাবার ও পানির অভাবে তারা ধুঁকতে থাকেন। মানবিকতার খাতিরে এই উদ্ধার কার্যক্রম সচল রাখা জরুরি। মনে রাখতে হবে, তারা অপরাধী নয়, বরং পরিস্থিতির শিকার। প্রতিটি জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা।
পাচারকারী চক্রের হোতারা প্রায়শই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। যারা সরাসরি মানুষের মৃত্যু ঘটাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল মাঠ পর্যায়ের ছোট দালাল ধরলে হবে না, পর্দার আড়ালে থাকা গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাচারকারীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধান কার্যকর করা প্রয়োজন। আইনের কঠোর প্রয়োগের বার্তা যদি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, তবে দালালদের সাহস এবং দাপট অনেকটাই কমে আসবে।
সরকারের উচিত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে বৈধভাবে কর্মী পাঠানোর বাজার সম্প্রসারণ করা। জি-টু-জি (এ২এ) পদ্ধতিতে কম খরচে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ থাকলে কেউ জীবন বাজি রেখে অবৈধপথ বেছে নেবে না। বর্তমান সময়ে বিশ্বের অনেক দেশে দক্ষ শ্রমিকের সংকট রয়েছে। নার্সিং, আইটি এবং টেকনিক্যাল সেক্টরে আমাদের তরুণদের প্রশিক্ষিত করে পাঠাতে পারলে রেমিট্যান্স যেমন বাড়বে, তেমনি অকাল মৃত্যুও কমবে। বৈধপথই হোক নিরাপদ জীবনের একমাত্র নিশ্চয়তা।
বিদেশে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক সময় দালালের চড়া সুদ মেটাতে গিয়ে অভিবাসীরা চরম অস্থিরতায় ভোগেন। অভিবাসী কল্যাণ ব্যাংককে তৃণমূল পর্যায়ে আরও সক্রিয় হতে হবে। দালালের ওপর নির্ভরতা কমাতে ব্যাংকগুলোকে সরাসরি ওরিয়েন্টেশন এবং আর্থিক সহায়তার কাজ করতে হবে। যখন একজন শ্রমিক জানবেন যে রাষ্ট্র তার পাশে আছে, তখন তিনি আর অন্ধকারপথে পা বাড়াবেন না। ঋণের স্বচ্ছ বিতরণ এবং পরামর্শ সেবা অভিবাসীদের সুরক্ষাকবচ হতে পারে।
বিদেশের মাটিতে যাদের মৃত্যু হয়, তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পরিচয় শনাক্ত করতে অনেক সময় ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের প্রয়োজন হয়। সরকারি খরচে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের সন্ধানে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস বা আইওএমের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে। প্রতিটি পরিবার যেন তাদের প্রিয়জনের শেষ বিদায়টুকু সম্মানের সঙ্গে দিতে পারে, সেই ন্যূনতম সুযোগটুকু নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
উপগ্রহ চিত্র এবং আধুনিক ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করে সমুদ্রে অভিবাসীবাহী নৌকার অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব। পাচারকারী চক্র কোন রুট ব্যবহার করছে, তা গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। স্মার্ট বর্ডার ম্যানেজমেন্ট কেবল দেশের নিরাপত্তা নয়, বরং নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে।
সংবাদমাধ্যমগুলোকে কেবল মৃত্যুর খবর প্রচার করলেই হবে না, বরং অবৈধ অভিবাসনের দীর্ঘমেয়াদি কুফল নিয়ে নিয়মিত ফিচার ও সম্পাদকীয় প্রকাশ করতে হবে। যেসব তরুণ অবৈধপথে গিয়ে সফল হতে পারেননি বা নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের সাক্ষাৎকার প্রচার করলে অন্যরা সতর্ক হবে। নাগরিক সমাজ ও জনপ্রতিনিধিদের উচিত নিজ নিজ এলাকায় সচেতনতা সভা করা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও অভিবাসন বিষয়ক সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ ছাড়া এই মরণনেশা থামানো সম্ভব নয়।
দেশের মাটিতেও যে অনেক কিছু করা সম্ভব, সেই আত্মবিশ্বাস তরুণদের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে হবে। কৃষি উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সিং বা ছোট ছোট স্টার্টআপের মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার গল্পগুলো বড় করে প্রচার করতে হবে। ‘বিদেশে গেলেই মুক্তি’ এই সেকেলে ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মেধাবী তরুণরা যদি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ পায়, তবে তারা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে ভাসবে না। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সহজ শর্তে মূলধন এবং মেন্টরশিপের ব্যবস্থা করা হলে অভিবাসনের চাপ অনেকটাই হ্রাস পাবে।
ষ শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ