কৃষিতে বিকল্প জ্বালানি সৌরশক্তি

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি বাজারের অস্বাভাবিক ওঠানামার প্রভাব যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে বাংলাদেশের কৃষি খাতে।

2026-04-02T04:06:07+00:00
2026-04-02T04:06:07+00:00
 
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
কৃষিতে বিকল্প জ্বালানি সৌরশক্তি
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:০৬ এএম 
সংগৃহীত ছবি
আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি বাজারের অস্বাভাবিক ওঠানামার প্রভাব যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে বাংলাদেশের কৃষি খাতে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধার মতো কৃষিনির্ভর জেলাগুলোতে সেচনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় জ্বালানি সংকট এখন এক বড় উদ্বেগের নাম।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি সংগ্রহে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক দৃশ্য। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ডিজেলনির্ভর কৃষিতে। গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলায় কৃষকদের অভিযোগ- সময়মতো ডিজেল না পাওয়ায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, ফলে বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

Advertisement
বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় এখনও সেচের বড় অংশ নির্ভর করে ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৬ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্প ব্যবহৃত হয়, যার বাজারমূল্য এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। শুধু ধান আবাদেই বছরে প্রায় ১০ লাখ টন ডিজেলের প্রয়োজন হয়।

অন্যদিকে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প পরিচালনায় প্রয়োজন হয় ২ হাজার থেকে ২২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। মোট প্রায় ৫৫ লাখ হেক্টর জমিতে এই সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে জ্বালানি বা বিদ্যুৎ সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে সেচ খরচ বিঘাপ্রতি ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানান স্থানীয় কৃষকরা। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো তেল না পাওয়ায় জমিতে সেচ দিতে বিলম্ব হয়, ফলে উৎপাদনেও প্রভাব পড়ে। 

গাইবান্ধা সদর উপজেলার কৃষক রিয়াজউদ্দিন বলেন, ‘মাঝেমধ্যে পাম্প চালানোর জন্য তেল পাওয়া যায় না। আবার দাম বেশি থাকলে সেচ কম দিতে হয়, এতে ফলন কমে যায়।’

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মোকাবিলায় সৌরশক্তিনির্ভর সেচ প্রযুক্তি হতে পারে কার্যকর ও টেকসই সমাধান। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সৌরচালিত সেচ পাম্প ব্যবহারের মাধ্যমে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। সৌরচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতি বছর ১৭ হাজার টনের বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে প্রায় ১ দশমিক ৮৮ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত।

এই প্রেক্ষাপটে সৌরচালিত সেচব্যবস্থা বা সোলার ইরিগেশন একটি সম্ভাবনাময় সমাধান হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ২ হাজারের বেশি সৌরচালিত সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যার একটি অংশ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়। গাইবান্ধায় সীমিত পরিসরে কিছু সৌরচালিত পাম্প চালু হয়েছে, যা কৃষকদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

সৌরচালিত সেচব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি একবার স্থাপন করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় বিনা খরচে পানি উত্তোলন করা যায়। সূর্যের আলো থাকলেই পাম্প চালানো সম্ভব, ফলে ডিজেল বা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমে যায়। 
পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি কার্বন নিঃসরণও কমায়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে গাইবান্ধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এবং অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেড (আইডকোল) যৌথভাবে দেশে সৌর সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আইডকোলের তথ্য অনুযায়ী, একটি সৌরচালিত পাম্প বছরে গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার লিটার ডিজেল সাশ্রয় করতে পারে। এতে একদিকে কৃষকের খরচ কমে, অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি আমদানির চাপও কমে।

তবে গাইবান্ধার প্রেক্ষাপটে এই প্রযুক্তির বিস্তারে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। একটি সৌরচালিত সেচ পাম্প স্থাপনে প্রাথমিকভাবে ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে, যা এককভাবে কৃষকের পক্ষে বহন করা কঠিন। ফলে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা বা সরকারি ভর্তুকি ছাড়া এই প্রযুক্তির বিস্তার ধীরগতির। এ ছাড়া জমির মালিকানা, সেচের সময়সূচি নির্ধারণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ- এসব বিষয়েও সমন্বয় প্রয়োজন হয়।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম মনে করেন, গাইবান্ধার চরাঞ্চলগুলো সৌর সেচের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। কারণ সেখানে বিদ্যুতের লাইন পৌঁছানো কঠিন এবং ডিজেল সরবরাহও অনিশ্চিত। চর এলাকায় যদি ক্লাস্টারভিত্তিক সৌর সেচ প্রকল্প গড়ে তোলা যায়, তা হলে কৃষিতে একটা টেকসই পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জিইউকের প্রধান নির্বাহী ও চর গবেষক এম আবদুস সালাম মনে করেন, সৌরশক্তিনির্ভর সেচ ব্যবস্থা কৃষকদের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম। এ খাতে যদি সরকারি সহায়তা ও বিনিয়োগ আরও জোরদার করা যায়, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এই সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
গাইবান্ধার মতো সম্ভাবনাময় জেলায় সৌরশক্তির ব্যবহার কেবল সেচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়; বরং

ধান শুকানো, শস্য সংরক্ষণ এবং ক্ষুদ্র কৃষিযন্ত্র পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর বিস্তৃতি ঘটানো যেতে পারে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতিশীলতা সৃষ্টি হবে এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জ্বালানি সংকট যখন কৃষির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন গাইবান্ধায় সৌরশক্তি হতে পারে এক বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত বিনিয়োগ, নীতিগত সহায়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি। তা হলে উত্তরবঙ্গের এই জেলাই হতে পারে দেশের কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সফল এক মডেল।

সময়ের আলো/আআ
  বিষয়:   কৃষি  বিকল্প  জ্বালানি  সৌরশক্তি 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: