গাজীপুরের শ্রীপুরে সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে বর্জ্য শোধনাগার (ওয়েস্ট প্লান্ট) নির্মাণকে কেন্দ্র করে ফের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বর্জ্য প্লান্টে যাতায়াতের জন্য বন বিভাগের জমির ওপর প্রথমে ইটের সলিং রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ ওঠে। বন বিভাগের বাধা ও পরবর্তী সময়ে উচ্ছেদ অভিযানের পরও একই পথ ব্যবহার অব্যাহত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সর্বশেষ সেখানে ইটের সলিংয়ের পরিবর্তে আরসিসি ঢালাই দিয়ে পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে বলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বন বিভাগ বলছে, সংশ্লিষ্ট জমিটি সংরক্ষিত বনের অংশ। বর্জ্য প্লান্টে ময়লা পরিবহনের জন্য ওই রাস্তা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলেও সেখানে নতুন করে ইট বা কংক্রিটের রাস্তা নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। বরং বিদ্যমান কাঁচা রাস্তা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
সরেজমিন দেখা যায়, গাজীপুরের ভাওয়াল গড়ের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় গাজীপুর সিটির ময়লার ভাগাড় নির্মাণের পর এবার শ্রীপুর পৌরসভার পাঁচলটিয়া মৌজায় একটি সমন্বিত কঠিন ও মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের জন্য ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর পাঁচলটিয়া মৌজায় ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রায় ১ একর ১০ শতাংশ জমি কেনে শ্রীপুর পৌরসভা।
এ প্রসঙ্গে শ্রীপুর পৌরসভার সার্ভেয়ার মো. মোস্তফা কামাল জানান, প্রকল্পের জন্য জমি কেনার সময় সেখানে পৌরসভার নিজস্ব কোনো রাস্তা ছিল না এবং যাতায়াতের জন্য রাস্তার জমিও কেনা হয়নি। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প এলাকায় যাতায়াতের জন্য বন বিভাগের জমির ওপর দিয়ে বিদ্যমান রাস্তা ব্যবহারের সাময়িক অনুমতি নেওয়া হয়।
শ্রীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোকলেছুর রহমান বলেন, ২০২৩ সালে তৎকালীন পৌর মেয়র মো. আনিসুর রহমান জীবিত থাকাকালে প্রকল্প এলাকার আশপাশের বনভূমির সীমানা নির্ধারণ (ডিমারকেশন) করা হয়। ওই সময় বন বিভাগের জমি ব্যবহার না করার বিষয়ে ট্রেজারি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই শর্ত ভঙ্গ করে বন বিভাগের জমির ওপর ইটের সলিং রাস্তা নির্মাণ করা হয়। ২০২৩ সালে প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণের সময় বনভূমির ওপর ইটের রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা করা হলে বন বিভাগ বাধা দেয়।
পরে বনভূমির সীমানা চিহ্নিত করে পিলার স্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে রাতের আঁধারে সেসব সীমানা পিলার সরিয়ে ফেলে রাস্তার ওপর ইট বসিয়ে চলাচল শুরু করা হয়। এ ঘটনায় ২০২৪ সালে অভিযান চালিয়ে রাস্তার ইটের সলিং অপসারণ করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি। তার অভিযোগ, রাস্তা ব্যবহার করে প্রকল্পের নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী রোমানা আলী টুসি এবং তার ভাই তৎকালীন শ্রীপুর উপজেলা চেয়ারম্যান জামিল হাসান দুর্জয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বন বিভাগের পক্ষ থেকে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দফতর ও মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে পৌরসভা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরকে বনভূমির রাস্তা ব্যবহার বন্ধ করে বিকল্প পথের ব্যবস্থা করার জন্য একাধিকবার নোটিস দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শ্রীপুর পৌরসভার প্রশাসক ব্যারিস্টার সজীব আহমেদ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর একটি আবেদন করেন। আবেদনে বর্জ্য পরিবহনের জন্য বন বিভাগের প্রায় ৯৯০ ফুট দীর্ঘ ও ১০ ফুট প্রশস্ত কাঁচা রাস্তার ওপর সাময়িকভাবে ৯০ দিনের জন্য ইটের সলিং নির্মাণের অনুমতি চাওয়া হয়।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রায় ৪২ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শ্রীপুর পৌরসভায় আড়াই লাখের বেশি মানুষের বসবাস। প্রতিদিন এখানে প্রায় ৪০ টন বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ বর্জ্য যথাযথভাবে ডাম্পিং স্টেশনে সরিয়ে নিতে না পারায় পৌর এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। প্রকল্পের পাশে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি কেনার জন্য যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু জমি কেনার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে পৌর এলাকার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কঠিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য প্রকল্প এলাকায় নেওয়ার জন্য বন বিভাগের বিদ্যমান কাঁচা রাস্তা সাময়িকভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ১২ মে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, শ্রীপুর ওয়েস্ট প্লান্টে বর্জ্য পরিবহনের জন্য সংরক্ষিত বনের ওই অংশে নতুন করে ইটের রাস্তা নির্মাণ না করে বিদ্যমান কাঁচা রাস্তা ২০২৬ সালের ১১ আগস্ট পর্যন্ত ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। চিঠির অনুলিপি প্রধান বন সংরক্ষক, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০২৬ সালের ১ জুন ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বশিরুল আল-মামুন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে শ্রীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তাকে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট রাস্তার জমি সংরক্ষিত বনের অংশ। তাই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সেখানে নতুন করে ইটের রাস্তা নির্মাণ না করে বিদ্যমান রাস্তা নির্দিষ্ট কিছু শর্তে ১১ আগস্ট পর্যন্ত ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নতুন করে ইটের রাস্তা নির্মাণের অনুমতি না থাকলেও পরবর্তীতে সেখানে ইটের সলিংয়ের পাশাপাশি কংক্রিটের আরসিসি ঢালাই রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে।
শ্রীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোকলেছুর রহমান বলেন, চলতি বছরের ৩০ জুন তেলিহাটি এলাকায় বনভূমি দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে দখলদারদের হামলায় তিনি আহত হন। এতে তার ডান পায়ের হাড় ভেঙে যায়। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সুযোগে বন বিভাগের জমির ওপর চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বর্জ্য প্লান্টে যাতায়াতের জন্য আরসিসি পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। রাস্তা নির্মাণ বন্ধে নোটিস দেওয়া ও বাধা দিতে গেলে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্নভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
বনভূমির রাস্তা ব্যবহারের অনুমতির মেয়াদ গত ১১ আগস্ট শেষ হয়েছে। এরপর ওই জমিতে নির্মিত আরসিসি রাস্তা অপসারণের জন্য গত ২০ আগস্ট শ্রীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে উচ্ছেদ নথি সৃজন করে অভিযান পরিচালনার আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান রেঞ্জ কর্মকর্তা।
তবে এখনও পর্যন্ত ওই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়নি। রেঞ্জ কর্মকর্তা মোকলেছুর রহমানের অভিযোগ, বনভূমিতে রাস্তা নির্মাণ বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে উল্টো তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে তিনি ও বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাপের মুখে রয়েছেন।
এ বিষয়ে শ্রীপুর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বাদল বলেন, সাবেক মেয়র আনিসুর রহমানের সময়ে ওই স্থানে জমি কিনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে সেখানে যাতায়াতের জন্য পৌরসভার নিজস্ব কোনো রাস্তা না থাকায় জায়গাটি নির্বাচন করা কতটা যুক্তিসংগত ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শ্রীপুরে এ ধরনের প্রকল্প নির্মাণের জন্য রাস্তা সংবলিত আরও অনেক জায়গা ছিল। কেন ওই জায়গাটি বেছে নেওয়া হয়েছিল তা বোধগম্য নয়। তিনি আরও বলেন, বনভূমির রাস্তা বাদ দিয়ে বিকল্প রাস্তা নির্মাণ করতে হলে পাশের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ ছাড়া বিকল্প রাস্তা নির্মাণ করা কঠিন।
স্থানীয়দের মতে, পৌর এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৪০ টন পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদিত হওয়ায় এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জরুরি। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো পরিবেশবান্ধব একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যদি সংরক্ষিত বনভূমির ক্ষতি হয়, তা হলে সেটি নতুন পরিবেশগত সংকট তৈরি করতে পারে।
একদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দ্রুত প্লান্ট চালু করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্যদিকে সংরক্ষিত বনভূমি ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বনভূমি ব্যবহার না করে স্থায়ী বিকল্প সড়ক নির্মাণের ব্যবস্থা করাই এখন সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বন বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, যেখানে বর্জ্য পরিবহনের জন্য বিদ্যমান কাঁচা রাস্তা সাময়িকভাবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, সেখানে নতুন করে পাকা রাস্তা নির্মাণের অনুমতি ছিল না। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও বন আইন অনুযায়ী নির্মিত পাকা রাস্তার বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা