আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ‘অস্বাভাবিক মূল্যে’ বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয়েছিল তুলে ধরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, চুক্তিটি সংশোধন কিংবা আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার বিষয়টি এখন সরকারের ‘সক্রিয়’ বিবেচনায় আছে।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ তথ্য জানান।
স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, চুক্তিটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত একটি জাতীয় কমিটির মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
ওই কমিটিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, আইন বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এবং চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট ছিলেন। তারা চুক্তি পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার চুক্তিটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিক মূল্যে স্বাক্ষর করেছে। এখন সরকার চুক্তি সংশোধনের জন্য দুটি বিকল্প বিবেচনা করছে।
বিকল্প দুটি হলো- আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান অথবা আদানি পাওয়ারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি সংশোধন।
সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই। তবে গ্রীষ্মকালে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি ও সঞ্চালন সীমাবদ্ধতায় মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। ফলে ওই সময়ে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। গ্রাহকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে ও লোডশেডিং বন্ধে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
বিদ্যুতের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় লোডশেডিং বন্ধে বিদ্যুৎ বিভাগের গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম ও পরিকল্পনার কথা সংসদে তুলে ধরেন মন্ত্রী।
তিনি জানান, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর সঙ্গে সমন্বয় রেখে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হচ্ছে। এছাড়া প্রাথমিক জ্বালানির চাহিদা মোকাবিলায় জ্বালানি বহুমুখীকরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রথম ধাপে ময়মনসিংহ, ঘোড়াশাল এবং নারায়ণগঞ্জের ৭৪টি মনোনীত ভোক্তার স্থাপনায় জ্বালানি নিরীক্ষা কার্যক্রম চলছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় এ কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে ৪২ জন সনদপ্রাপ্ত জ্বালানি নিরীক্ষক এবং ১৭৮ জন সনদপ্রাপ্ত জ্বালানি ব্যবস্থাপক তৈরি করেছে।
কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ এর প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলেন, আমরা প্রতিটি পাম্পে যে পরিমাণ তেল প্রতিদিন দেওয়ার কথা সেই পরিমাণ তেল আমাদের পাম্পগুলোতে সাপ্লাই করা হচ্ছে। কিন্তু ইরানের ঘটনার পর থেকে হঠাৎ করে বিক্রি বেড়ে গেছে। বিক্রি বেড়ে যাওয়ার ফলে যে পেট্রোল পাম্পে যে পরিমাণ তেল দিতাম, একদিন দেড় দিন লাগত বিক্রি হতে, এখন দুই ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায়। সেইজন্য আপনার মানুষের যে প্যানিক বায়িংটা শুরু হয়েছে লাইন দেখা যায়— কিন্তু পেট্রোল সাপ্লাই হয় না এটা ঠিক না, পেট্রোল প্রতিদিন সাপ্লাই করা হয়।
ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী জানান, বর্তমানে সারাদেশে এক হাজার ৮৩৪টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র সচল রয়েছে। সরকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়নে আরও উপকেন্দ্র নির্মাণ ও উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
সংসদে উপস্থাপিত মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ও কোম্পানির অধীনে এক হাজার ৮৩৪টি উপকেন্দ্রে রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বাপবিবো) এক হাজার ৩০৬টি, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো) ১৮৭টি, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) ৯৯টি, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) ৯৭টি, ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (ডেসকো) ৬০টি ও নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো) ৮৫টি উপকেন্দ্র পরিচালনা করছে।
চলমান ও ভবিষ্যৎ প্রকল্পের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার ক্ষমতা বাড়াতে আরও নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণ ও আপগ্রেডেশনের মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে ছয় হাজার ২৫৫ এমভিএ (মেগা-ভোল্ট অ্যাম্পিয়ার) অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিতরণের সক্ষমতা তৈরি হবে। সরকারের এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশে বিদ্যুৎ বিভ্রাট অনেকাংশে কমে আসবে এবং শিল্প-কারখানাসহ আবাসিক খাতে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এফআর