রাজধানীতে অবৈধভাবে দখলকৃত ফুটপাথ ও রাস্তা দখলমুক্ত করতে পাঁচ দিনের বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ডিএমপির স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যজিস্ট্রেট ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছে।
১ এপ্রিল শুরু হওয়া এ অভিযান ৫ এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালিত হবে। অভিযানে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি আর্থিক জরিমানা এবং সতর্ক করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও থেমে নেই অবৈধ দখল বাণিজ্য। কিছু স্থানে উচ্ছেদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবারও দখল হয়ে যাচ্ছে রাস্তা ও ফুটপাথ।
উচ্ছেদ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাতারাতি এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব না। এ জন্য নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে।
ট্রাফিকের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুনরায় দখলকারীদের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।
বৃহস্পতিবার সড়ক, ফুটপাথ ও মার্কেটের অবৈধ দোকানপাটের বর্ধিতাংশ উচ্ছেদে দ্বিতীয় দিনের অভিযান চালায় ডিএমপি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ফুলবাড়িয়া, মিরপুরসহ ৭টি স্থানে এই অভিযান চলে।
অন্যদিকে ডিএমপির মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ কর্তৃক রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বৃহস্পতিবার সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে দুই লাখ ৬১ হাজার টাকা জরিমানা ও ৫১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
উচ্ছেদ অভিযানে অংশগ্রহণকারী ডিএমপির (ট্রাফিক) উত্তরা জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) বলেন, গতকাল আর্টিসান গ্যাপ থেকে বাংলাদেশ মেডিকেল পর্যন্ত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। তবে এখানে কাউকে আর্থিক জরিমানা করা হয়নি। শুক্রবারের মধ্যে অবৈধ দখল ছেড়ে দিতে মৌখিকভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ট্রাফিক গুলশান জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার গুলশান ১ থেকে ডিএনসিসি মার্কেট-সংলগ্ন ফুটপাথে অভিযান চালানো হয়। এ সময় ১০টি মামলা হয় এবং জরিমানা আদায় করা হয় ৫৫ হাজার টাকা।
ট্রাফিক রমনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শাহবাগ জোনে ঢাকা মেডিকেল, নিমতলী ও বঙ্গবাজার হয়ে গোলাপশাহ মাজার ক্রসিং এলাকা পর্যন্ত ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে অবৈধভাবে পার্কিং করা বাইকের বিরুদ্ধে ৫৬টি ভিডিও মামলা ও ১২টি তাৎক্ষণিক মামলা দেওয়া হয়। পাশাপাশি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ২২ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা এবং প্রায় চার পিকআপ সমপরিমাণ মালামাল জব্দ করা হয়।
ট্রাফিক লালবাগ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ফুলবাড়িয়া ট্রাফিক জোনের ফুলবাড়িয়া এলাকায় পরিচালিত অভিযানে আইন অমান্য করায় ১৩ ব্যবসায়ীকে মোট ৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। গ্রেফতার ব্যক্তিদের আদালতে প্রেরণের প্রক্রিয়া চলমান।
অভিযানের প্রথম দিনে গত বুধবার বেশিরভাগ জায়গায় সতর্ক করলেও বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনে কঠোর অবস্থানে যান ভ্রাম্যমাণ আদালত। মাইকিংয়ের পাশাপাশি সড়ক ও ফুটপাথের অস্থায়ী দোকান এবং হোটেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্ধিতাংশ উচ্ছেদ করা হয়। অস্থায়ী দোকান জব্দ করে পিকআপে করে সরিয়ে ফেলা হয়।
রমনা ট্রাফিক বিভাগ ঢাকা মেডিকেল কলেজের বহির্বিভাগের সামনে থেকে শুরু করে অভিযান শেষ করে গোলাপশাহ মাজার পর্যন্ত। এ সময় ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে অভিযানের নামে বাড়াবাড়ির অভিযোগ করেছেন কয়েকজন দোকানি।
তারা বলেন, বর্ধিতাংশ দোকানের অংশ নয়, এটি কাস্টমারদের জন্য করা। কাস্টমাররা যাতে বৃষ্টিতে না ভিজে সে কারণে এই শেড দেওয়া হয়েছে। আমরা দোকানের বাইরে কিছু রাখিনি। এই শেডের জন্য জরিমানা করা হয়েছে।
পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট জানায়, কোনো অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। যাদের বিরুদ্ধে রাস্তা ফুটপাথ দখলের প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উচ্ছেদের পর আবারও কেউ যাতে দোকানপাট বসাতে না পারে সে জন্য একই জায়গায় একাধিকবার অভিযান চলবে।
ডিএমপির স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হাসান বলেন, দোকানের চুলা বাইরে রাখা হয়েছে। থালা-বাসন রাস্তায় ধোয়া হচ্ছে। রাস্তার পিচ উঠে যাচ্ছে। বর্ধিতাংশের কথা দোকানিরাও স্বীকার করে নিয়েছে। তাদের কাউকে জরিমানা ছাড়া কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়নি। দোকানের ভেতরে থেকে ব্যবসা করতে হবে। দোকানের বাইরে কোনো টেবিল, চুলা রেখে কেউ ব্যবসা করতে পারবে না। ডিএমপি এ ব্যাপারে গণ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।
এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির ট্রাফিক রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার কাজী রোমানা নাসরিন।
তিনি বলেন, ঢাকা শহরে যে কেউ এসে রুটি-কলার দোকান, ফ্লেক্সিলোডের দোকান দিয়ে বসবে- এটা কোনো কথা না। ঢাকা শহরের এক্সিট-এন্ট্রি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। কারণ এটি ওভার বার্ডেন সিটি হয়ে গেছে অলরেডি।
অভিযানে ঢাকা মেডিকেল এলাকায় ছয় প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ডিএমপির ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় একজনকে আটক করা হয়।
ডিএমপির আরেকটি টিম অভিযান পরিচালনা করে চানখাঁরপুল থেকে বকশিবাজার পর্যন্ত। চানখাঁরপুলের সড়কটি অবৈধ দোকানে ঠাসা। পাশের এই মার্কেটটির দোকানদাররাও ফুটপাথ দখল করে ব্যবসা করে। অভিযানের কথা শুনে সবাই সটকে পড়ে। দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে অবৈধভাবে সড়ক ও ফুটপাথ দখল হয়।
এরপরও কিছু দোকান খোলা পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিকভাবে জব্দ করা হয় এসব দোকানের মালামাল। অনেকে আবার দোকান খোলা রেখেই পালিয়ে যায়। ফুটপাথ দখল করা অ্যাম্বুলেন্সের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানান ম্যাজিস্ট্রেট।
অন্যদিকে সরেজমিন দেখা যায়, উচ্ছেদ অভিযান শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন ফুটপাথ ও রাস্তায় পুনরায় পসরা সাজিয়ে বসেছেন অস্থায়ী দোকানদাররা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এটা এখানকার নিয়মিত ঘটনা। অতীতেও এখানে অনেকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছিল। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবারও দখল হয়ে যায় ফুটপাথ ও রাস্তা।
একই অবস্থা দেখা যায় মিরপুর ১০ নম্বরেও। সড়ক ও ফুটপাথ মুক্ত করতে মিরপুর ১০ থেকে ১২ পর্যন্ত সড়কেও গতকাল অভিযান চলে। এ সময় বেশ কিছু দোকানের মালামাল জব্দ করে গাড়িতে তোলে আভিযানিক দল। এ সময় পুনর্বাসনের দাবি করেন দোকানিরা। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও বাকিদের সড়ক থেকে মালামাল সরাতে আজ শুক্রবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন ম্যাজিস্ট্রেট।
ডিএমপির (ট্রাফিক) মিরপুর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) তানিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার মিরপুর ১০ থেকে ১২ পর্যন্ত এবং কালশী এলাকায় ফুটপাথ ও রাস্তায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয়। মৌখিতভাবে সতর্কতার পাশাপাশি এ সময় ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
উচ্ছেদ অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পরই আবারও ফুটপাথ-রাস্তা দখল হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এক দিনেই পরিবর্তন আসবে না। নিয়মিত অভিযানে অবস্থার পরিবর্তন আসবে।
গতকাল ডিএমপির (ট্রাফিক) ওয়ারী জোনে হানিফ ফ্লাইওভারে যাত্রাবাড়ী হয়ে কাজলা পর্যন্ত উচ্ছেদ অভিযান চলে। জরিমানা আদায় করা হয় সাড়ে ২২ হাজার টাকা। মিরপুর ও ঢাকা মেডিকেলের মতো জায়গায় অভিযানের পর যাত্রাবাড়ীতেও পুনরায় দখল হওয়ার সংবাদ জানা যায়।
এ প্রসঙ্গে ডিএমপির (ট্রাফিক) যাত্রাবাড়ী জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহীল বাকী বলেন, রাতারাতি এই অবস্থার পরিবর্তন হবে না। হকাররা একদিক দখলমুক্ত করলে অন্যদিকে বসে পড়ে। এক গ্রুপকে সরালে আরেক গ্রুপ বসে পড়ে। একেবারে এই অবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব না। তবে আশার কথা হচ্ছে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। ভালো ফলের জন্য নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
ট্রাফিক পুলিশ প্রধান, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের পরও যদি কেউ পুনরায় দখল করেন তা হলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে ট্রাফিক বিভাগ। এ জন্য সিআর মামলাসহ অন্য কী প্রক্রিয়া অবলম্বন করা যায় তা নিয়ে সক্রিয়ভাবে আলোচনা চলছে। কোনভাবেই জনসাধারণের জন্য নির্ধারিত ফুটপাথ ও রাস্তা অবৈধভাবে দখলে রাখতে দেওয়া হবে না। উচ্ছেদের পরও যারা আবারও পুনরায় একই ধরনের অপরাধ করবে তা হলে দখলকৃত স্থানসহ তাদের ভিডিও ধারণ করা হবে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/কেএইচও