ইতালির টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে বইছে সমালোচনার ঝড়। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের এমন পতনকে ‘আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি’ হিসেবে বর্ণনা করছে বিশ্ব গণমাধ্যম। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপ জেতার পর গত ২০ বছরে বিশ্বমঞ্চে ইতালির জয় মাত্র একটি, যা একটি ফুটবল পরাশক্তির জন্য চরম লজ্জাজনক। অন্য একটি স্টোরিতে তারা উল্লেখ করেছে কীভাবে ‘আজ্জুরি’রা বাছাইপর্বের গেরোয় আটকে পড়ে নিজেদের সোনালি অতীতকে ফিকে করে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর সুর আরও বেশি ধারালো ও সমালোচনামূলক। ইতালির শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া দৈনিক গাজেত্তা দেলো স্পোর্ত তাদের প্রধান শিরোনামে লেখে ‘সবাই বাড়ি চলো’, যা মূলত দেশটির ফুটবল কাঠামোর চরম ব্যর্থতাকেই ইঙ্গিত করে। অন্যদিকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান তাদের বিশ্লেষণে বলেছে, এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং ইতালীয় ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি অবক্ষয়ের ফল। তাদের মতে, ইতালির ক্লাব ফুটবলে বিদেশি খেলোয়াড়দের আধিক্য এবং স্থানীয় একাডেমিগুলো থেকে বিশ্বমানের স্ট্রাইকার উঠে না আসাই আজ দলটিকে এই খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে।
সমালোচনার বড় একটা অংশজুড়ে আছে ইতালির বর্তমান কোচিং দর্শন এবং খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তার অভাব। ফক্স স্পোর্টস তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, র্যাঙ্কিংয়ে অনেক পিছিয়ে থাকা দলগুলোর বিপক্ষেও ইতালি এখন আর আধিপত্য বিস্তার করে খেলতে পারে না। এমনকি আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী কোচ লিওনেল স্কালোনিও ইতালির এই বিদায়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ইতালি ছাড়া বিশ্বকাপ ভাবা কঠিন। ১৬ বছর ধরে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ইতালির অনুপস্থিতি (২০১০ ও ২০১৪-তে গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় এবং পরবর্তী তিনটি আসরে কোয়ালিফাই করতে না পারা) প্রমাণ করে যে, কেবল ইতিহাস আর ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে আধুনিক ফুটবলে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
সামগ্রিকভাবে ইতালির এই বিদায় কেবল একটি দলের পরাজয় নয়, বরং এটি ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম এক স্তম্ভের ধসে পড়ার গল্প। সমালোচকরা মনে করছেন, সিরি’আ লিগের জৌলুস ফিরলেও জাতীয় দলের জন্য সঠিক পরিকল্পনা না নিলে ২০৩০ বিশ্বকাপেও ইতালির ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। একটি প্রজন্ম বড় হয়ে যাচ্ছে যারা ইতালিকে বিশ্বকাপে লড়তে দেখেনি, যা দেশটিতে ফুটবলের জনপ্রিয়তা ও নতুন প্রজন্মের ফুটবলার তৈরির ক্ষেত্রে এক বিশাল অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। শেষ পর্যন্ত এই বিদায় ইতালিয়ান ফুটবলের জন্য একটি জাতীয় শোকের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে টানা তৃতীয়বারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হওয়ার পর তীব্র সমালোচনায় পড়ে পদত্যাগ করেছেন ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের (এফআইজিসি) প্রেসিডেন্ট গাব্রিয়েল গ্রাভিনা। উত্তর আমেরিকা ও মেক্সিকো বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব থেকে ছিটকে যাওয়ার দুদিনের মাথায় গতকাল তিনি এই ঘোষণা দেন। শুরুতে পদত্যাগের চাপের মুখে অনড় থাকলেও ফুটবল সংশ্লিষ্টদের তোপের মুখে শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
২০১৮ সালে ইতালির ফুটবল বিপর্যয়ের পর দায়িত্ব নিয়েছিলেন গ্রাভিনা। কিন্তু তার মেয়াদেও ২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। মঙ্গলবার রাতে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে টাইব্রেকারে হার যেন ইতালিয়ান ফুটবলে ঝড় তৈরি করে। এর আগে ২০১৮ আসরে উঠতে না পারার দায়ে তৎকালীন সভাপতিকেও পদ ছাড়তে হয়েছিল।
মাঠের ব্যর্থতার পাশাপাশি অবকাঠামোগত সংকটেও পড়েছে ইতালি। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থার (উয়েফা) সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন গতকাল ইতালিকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দেশটির স্টেডিয়ামগুলোর বেহাল দশা দ্রুত সংস্কার না করলে ২০৩২ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের সুযোগ হারাতে পারে ইতালি।
বর্তমান স্টেডিয়ামগুলোকে ‘ইউরোপের অন্যতম বাজে’ বলে অভিহিত করেছেন উয়েফা প্রধান, যা ইতালির ফুটবল ঐতিহ্যের জন্য এক বিশাল বড় ধাক্কা।
এদিকে ইতালির বিশ্বকাপে না খেলার এই চরম ব্যর্থতার দায়ে দেশটির ক্রীড়ামন্ত্রী আন্দ্রেয়া আবোদি সরাসরি ফুটবল ফেডারেশনের (এফআইজিসি) প্রধান গাব্রিয়েল গ্রাভিনার পদত্যাগ দাবি করেছেন। মন্ত্রীর মতে, ফুটবলের আমূল সংস্কারের জন্য পরিবর্তনটা শীর্ষ পর্যায় থেকেই শুরু হওয়া দরকার।
তবে পদত্যাগের চাপ নাকচ করে দিয়েছেন গ্রাভিনা। তিনি জানিয়েছেন, এখনই সরছেন না, বরং আগামী সপ্তাহের বোর্ড সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনি লিগ কর্তৃপক্ষ ও খেলোয়াড় অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। এদিকে সাধারণ সমর্থকদের ক্ষোভ গিয়ে পড়েছে ফেডারেশন ভবনের ওপর, সেখানে বিক্ষুব্ধ জনতা ডিম ছুড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
অন্যদিকে গ্রাভিনা নিজের দায় এড়াতে রাষ্ট্র ও অন্য খেলার অ্যাথলেটদের আক্রমণ করে বসেছেন। টেনিস বা অলিম্পিক তারকাদের সরকারি সুযোগ-সুবিধাকে ‘অপেশাদার’ বলে খোঁচা দেওয়ায় বিতর্ক আরও বেড়েছে। ক্রীড়ামন্ত্রী ও অলিম্পিকজয়ী অ্যাথলেটরা গ্রাভিনার এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন, যা ইতালির ক্রীড়াঙ্গনে সংঘাত আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।