দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট যেন অচলাবস্থার এক দীর্ঘ সুড়ঙ্গে আটকে গেছে। মাঠে খেলা নেই, কিন্তু মাঠের বাইরের টানাপড়েন দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। দেশের ক্রিকেটারদের রুটি-রুজির সবচেয়ে বড় আসর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল) স্থগিত থাকায় অনিশ্চয়তা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে কয়েকশ ক্রিকেটারের দুশ্চিন্তা। এই সংকটময় সময়ে সামনে এসেছে ক্রিকেটারদের সংগঠন ‘কোয়াব’, যারা একদিকে লিগ চালুর দাবি তুলছে, অন্যদিকে তৃণমূল পর্যায়ের খেলোয়াড়দের কণ্ঠ তুলে ধরার উদ্যোগ নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন নতুন এক উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছেন।
প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ থেকে ক্রিকেটারদের প্রতিনিধি যুক্ত করতে চায় সংগঠনটি। তবে এটি কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া নয়, বরং খেলোয়াড়দের নিজেদের ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ রাখা হচ্ছে। প্রথম বিভাগ থেকে দুই জন এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ থেকে একজন করে প্রতিনিধি আসবেন- এমনটাই জানিয়েছেন মিঠুন।
বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় মিঠুন বলেন, ‘ঢাকা লিগ আমাদের খেলোয়াড়দের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমাদের মূল উপার্জনের একটা জায়গা। এখানে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক খেলোয়াড় আর্থিকভাবে উপকৃত হয়। এই লিগ বন্ধ হওয়াতে প্রতিটি খেলোয়াড় অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছে। বিষয়টি আমাদের নজরে আছে।’
মার্চ-এপ্রিলের এই ব্যস্ত মৌসুমে লিগ বন্ধ থাকাকে ‘আদর্শ সময়’ হিসেবে দেখছেন না তিনি। বরং দ্রুত সমাধানের ওপরই জোর দিচ্ছেন। ক্লাবগুলোর বিসিবি বয়কটের কারণে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে কোয়াব সক্রিয় বলেও জানান তিনি।
মিঠুনের ভাষায়, ‘খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে আমরা বিসিবি এবং সিসিডিএমের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাচ্ছি। লিগটাকে দ্রুত মাঠে গড়ানোর বিষয়ে আমাদের চেষ্টার কমতি নেই। আমরা অতি দ্রুত সমাধান আনার চেষ্টা করছি।’
এদিকে মাঠের বাইরের এই অস্থিরতা নিয়ে সরব হয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার ইমরুল কায়েসও। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রিকেট প্রশাসনের ওপর। তিনি লিখেছেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেটের পরিস্থিতি দেখে আর চুপ থাকা সম্ভব হলো না। যা হচ্ছে, তা প্রতিটি ক্রিকেটপ্রেমীর জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। আমাদের ক্রিকেটের অভিভাবকরা কি পদ আর ক্ষমতার লড়াইয়ে এতটাই অন্ধ হয়ে গেছেন?’
ঘরোয়া ক্রিকেটারদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে ইমরুল আরও বলেন, ‘আপনাদের জেদ আর রেষারেষির কারণে দিনের পর দিন লিগ বন্ধ হয়ে আছে। একবারও কি ভেবে দেখেছেন সেই সব ঘরোয়া ক্রিকেটারদের কথা, যারা শুধুই এই লিগগুলোর ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। অনেকের সংসার আজ চলা দায় হয়ে পড়েছে, অথচ কারও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।’
জাতীয় দলকে ঘিরে অতিরিক্ত মনোযোগের সমালোচনা করে তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘সবাই সবসময় শুধু জাতীয় দল নিয়ে চিন্তিত থাকেন, কিন্তু ক্রিকেট মানেই কেবল জাতীয় দল নয়! জাতীয় দলের পাশাপাশি আমাদের সামগ্রিক ক্রিকেট কাঠামো নিয়ে ভাবা এখন সময়ের দাবি।’
সবশেষে ক্রিকেটকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়ে ক্রীড়া মন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। তার ভাষ্যে, ‘আপনারা যদি নিজেদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে ক্রিকেটটাই বন্ধ করে দেন, তবে মুখে ‘ক্রিকেটের উন্নয়নের জন্য কাজ করছি’ বলাটা কি হাস্যকর নয়? ক্রিকেট কোনো ব্যক্তির নয়, ক্রিকেট এই দেশের কোটি মানুষের আবেগ। দয়া করে এই খেলাটাকে ধ্বংস করবেন না। ক্রিকেটারদের রুটি-রুজির পথ বন্ধ করবেন না।’
সব মিলিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটের এই অচলাবস্থা এখন শুধু একটি লিগের সংকট নয়, এটি হয়ে উঠেছে পুরো ক্রিকেট কাঠামোর জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। দ্রুত সমাধান না এলে এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যতের ওপরও।
সমেয়র আলো/কেএইচও