যুক্তরাষ্ট্র
ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে। অনেকেই এখন
চিন্তা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কি আরও বড় আকার ধারণ করে বিশ্বযুদ্ধে
পরিণত হতে পারে? এই যুদ্ধ শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নেই, এতে অন্তত আরও বহু
দেশ প্রভাবিত হয়েছে, যেমন- সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি
আরব, ওমান, আজারবাইজান, অধিকৃত পশ্চিম তীর, সাইপ্রাস, সিরিয়া, কাতার এবং
লেবানন। অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন, এই আঞ্চলিক সংঘাত কি পুরোদমে
বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে? একটি যুদ্ধ কখন বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়?
অক্সফোর্ড
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ইতিহাসের এমেরিটাস অধ্যাপক মার্গারেট
ম্যাকমিলান, বিবিসির ‘গ্লোবাল স্টোরি’ পডকাস্টে বলেছেন, মানুষ সাধারণত মনে
করে যুদ্ধ খুব পরিকল্পনা করে শুরু করা হয়, আর যারা যুদ্ধে যায় তারা জানে
তারা কী করতে যাচ্ছে।
কিন্তু তিনি ব্যাখ্যা করেন, আসলে অতীতের
যুদ্ধগুলো দেখলে বোঝা যায়- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ
শুরু হওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে অনেকটাই ছিল দুর্ঘটনা আর প্রতিপক্ষের সঙ্গে
ভুল বোঝাবুঝি। একে অনেকটা স্কুলের মাঠের ঝগড়ার মতো ভাবা যেতে পারে। অর্থাৎ
যেখানে ছোট ছোট ভুল বোঝাবুঝি বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ম্যাকমিলান বলেন,
১৯১৪ সালে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সম্রাট ফ্রানৎস যোসেফের ভাতিজা আর্চডিউক
ফ্রানৎস ফার্দিনান্দকে হত্যার ঘটনাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করে।
আরও পড়ুন
এরপর
খুব দ্রুত জোটবদ্ধ দেশগুলো একে অন্যের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, অস্ট্রিয়া ও
হাঙ্গেরি একসঙ্গে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, জার্মানি অস্ট্রিয়াকে
সমর্থন দেয় আর রাশিয়া সার্বিয়ার পক্ষে সেনা মোতায়েন করে, ফ্রান্স রাশিয়াকে
সমর্থন করে আর ব্রিটেন সম্মান ও কৌশলগত কারণে যুদ্ধে যোগ দেয়। এরপর যা ঘটে,
তা এক ভয়াবহ বৈশ্বিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
লন্ডনের কিংস কলেজের
আন্তর্জাতিক ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক জো মাইওলো বিশ্বযুদ্ধকে ব্যাখ্যা করতে
গিয়ে বলেন, বিশ্বযুদ্ধ হলো এমন একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ, যেখানে সব বড়
শক্তিগুলো জড়িয়ে পড়ে।
তিনি বিবিসিকে বলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়
মূলত ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো জড়িত ছিল। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এর
সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং চীন। অনেকেই মনে করেন,
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা মূলত আঞ্চলিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ। কিন্তু
প্রশ্ন হলো, এই সংঘাত কি আরও বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি
হয়েছে? ফেব্রুয়ারিতে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট
ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, তার মতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন
ইতিমধ্যেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন। আর একে থামানোর উপায় হলো
রাশিয়ার ওপর কঠোর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা।
তিনি বলেন,
আমার বিশ্বাস, পুতিন ইতিমধ্যেই এটি শুরু করেছেন। প্রশ্ন হলো, তিনি কতটা
এলাকা দখল করতে পারবেন এবং তাকে কীভাবে থামানো যাবে- রাশিয়া বিশ্বে একটি
ভিন্ন জীবনধারা চাপিয়ে দিতে চায় এবং মানুষ যে জীবন বেছে নিয়েছে তা পরিবর্তন
করতে চায়।
তা হলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি এখন কতটা? মার্গারেট
ম্যাকমিলান বলেন, আমার মনে হয়, যে দেশটি এই সংঘাতকে আরও বড় করে তুলতে পারে,
সেটি সম্ভবত ইরান, অথবা ইরানের মিত্ররা যেমন ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী। তিনি
ব্যাখ্যা করেন, ইরান যদি জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ রুটে হামলা চালায় বা
হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রাখে, তা হলে বৈশ্বিকভাবে এর প্রভাব পড়বে। এতে
জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে এবং বড় শক্তিগুলো এতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরও
জটিল করে তুলেছে। অনেক দেশ সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও তারা অর্থনৈতিক ও
কৌশলগতভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
আরেকটি ঝুঁকির কথাও তিনি বলেন, এক
অঞ্চলের সংঘাত অন্য জায়গায় নতুন করে সংঘাতের সুযোগ তৈরি করে দেয়। উদাহরণ
হিসেবে, চীন ভাবতে পারে যে পশ্চিমা দেশগুলো যেহেতু অন্যদিকে ব্যস্ত, তাই
এটা তাদের জন্য তাইওয়ান নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ। আবার বিশ্বের মনোযোগ
অন্যদিকে থাকলে রাশিয়াও ইউক্রেনে তাদের তৎপরতা বাড়াতে পারে। ম্যাকমিলান
বলেন, সংঘাত একটি অঞ্চল ছাড়িয়ে আরেকটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সবসময়ই
থাকে। কারণ এতে এমন দেশগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যারা তাদের বাধা দিতে পারত। এ
জন্য বাইরের দেশগুলো এর সুযোগ খুঁজে নিতে পারে।
তবে অধ্যাপক মাইওলো
মনে করেন, এই সংঘাত আঞ্চলিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে। এতে সৌদি আরবসহ গালফ
কো-অপারেশন কাউন্সিলের দেশগুলো জড়াতে পারে কিন্তু তার মনে হয় না যে চীন বা
রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে নামবে। তিনি বলেন, বিশ্বের কোথাও কিছু হলেই চীন
তাইওয়ানে হামলা করবে, এ ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি আরও বলেন, যদি আমরা
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলি, তা হলে আমার মনে হয় না চীন বা রাশিয়া সরাসরি
এতে জড়াতে চাইবে, আর ইউরোপের এতে জড়ানোর সম্ভাবনা আরো কম।
চীনের
কৌশল নিয়ে তিনি বলেন, আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী যদি বড় কোনো কৌশলগত ভুল করে, তা
হলে তাকে সেটি চালিয়ে যেতে দিন। তেলের দাম ওঠানামা হলেও, চীনের কি
কূটনৈতিকভাবে না জড়ানোই বেশি লাভজনক হবে?
মাইওলো মনে করেন, চীনের
জন্য এটা বড় কোনো সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত থাকে,
সেটা চীনের জন্য তেলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে দেবে।
নেতাদের
ভূমিকা নিয়ে মার্গারেট ম্যাকমিলান বলেন, ইতিহাসে দেখা যায়, যুদ্ধ অনেক সময়
অহংকার, সম্মানের অনুভূতি থেকে বা প্রতিপক্ষকে ভয় পাওয়ার কারণে শুরু
হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইতিহাস আমাদের এটাও দেখিয়েছে যে একজন নেতা কখনো কখনো
পুরো ঘটনাপ্রবাহকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জর্জ ক্লেমঁসো বলেছিলেন, যুদ্ধ করার চেয়ে শান্তি
স্থাপন করা আরও কঠিন।
ম্যাকমিলান বলেন, যখন যুদ্ধে অনেক মানুষ মারা
যায় বা বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তখন নেতারা ভাবেন, এত কিছু হারানোর
পর এখন যুদ্ধে জিততেই হবে, তাই তারা যুদ্ধ চালিয়ে যান।
তিনি বলেন,
অহংকারও বড় ভূমিকা রাখে। এ ক্ষেত্রে তিনি ভøাদিমির পুতিনের উদাহরণ টেনে
বলেন, ইউক্রেনে আক্রমণ করে তিনি স্পষ্টতই বড় ভুল করেছেন। চার বছর আগে
পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর পুতিন বলেছিলেন তার লক্ষ্য ইউক্রেনকে ‘সামরিক
শক্তিহীন’ এবং ‘নাৎসিমুক্ত’ করা। কিন্তু রাশিয়া এখনও বলছে তাদের সামরিক
লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব
অনুযায়ী, রাশিয়ার মোট হতাহতের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১২ লাখ, ধারণা করা হয়
প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা এর চেয়েও বেশি। এই সংখ্যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে
যুক্তরাষ্ট্রের মোট হতাহতের সংখ্যার চেয়েও বেশি বলে যুক্তরাজ্যের এক
মন্ত্রী জানিয়েছেন। ম্যাকমিলান বলেন, যেসব নেতা নিজেদের ভুল স্বীকার করতে
চান না বা পিছিয়ে আসতে চান না, তারা যুদ্ধকে দীর্ঘ ও আরও ভয়াবহ করে তুলতে
পারেন। তিনি অতীতের উদাহরণ হিসেবে এডল্ফ হিটলারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, যিনি
পরাজয় নিশ্চিত জেনেও যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলেন, আদর্শ, অহংকার বা ভুল
বিশ্বাসের কারণে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত ছোট সংঘাতকেও বড় ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে
রূপ দিতে পারে।
সংঘাত কমানোর পথ : ম্যাকমিলান বলেন, উত্তেজনা কমাতে
কূটনীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আপনার প্রতিপক্ষকে বুঝতে হবে যে তারা কী চায়
এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে, কথা বলতে হবে।
তিনি বলেন,
স্নায়ুযুদ্ধের শেষ দিকে এবং নেটোয় যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব পক্ষের মধ্যে
যোগাযোগ বেড়ে যায়। অনেক উদাহরণ আছে যেখানে মানুষ বলেছে- একটু থামো, বিষয়টা
পাগলামির দিকে যাচ্ছে। তারা বুঝেছিল পরিস্থিতি খুব বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, তাই
উত্তেজনা কমাতে হবে।
বড় শক্তিধর দেশগুলো জড়িত থাকলে, পারমাণবিক
অস্ত্র থাকার বিষয়টি সবসময় শান্তি প্রতিষ্ঠা বা উত্তেজনা কমানোর পরিকল্পনায়
গুরুত্ব পায়। অধ্যাপক মাইওলোও একমত প্রকাশ করে বলেন, তেল আভিভ, ওয়াশিংটন
এবং তেহরান, তাদের বুঝতে হবে যে তারা যেটুকু অর্জন করতে পারবে তারা সেটার
সীমায় প্রায় পৌঁছে গেছে। তিনি বলেন, আরো যুদ্ধ করে কোনো পক্ষই কাক্সিক্ষত
ফল পাবে না।
কিছু না কিছু সমঝোতা লাগবে। যেমন- নিষেধাজ্ঞা শিথিল
করা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করা, এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইরানের অবস্থান
নিয়ে বোঝাপড়া করা। মাইওলো বলেন, কেবল মধ্যস্থতার মাধ্যমেই এই শক্তিগুলো
যুদ্ধবিরতিতে আসতে পারে এবং পরে সেটাকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে রূপ দিতে পারে।
এএডি/