আমেরিকান যুদ্ধযন্ত্র দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী সামরিক কাঠামো। এর ভিত কেবল অস্ত্র বা অর্থ নয়, বরং বয়ান (ন্যারেটিভ)। সেই বয়ানের বড় অংশই তৈরি হয়েছে অর্ধসত্য, তথ্য গোপন আর সরাসরি মিথ্যার ওপর। যুদ্ধ শুরু করার আগে জনগণকে রাজি করানো দরকার হয়। সেই জায়গাতেই তৈরি হয় গল্প। শত্রুকে ভয়ংকর করে তোলা হয়। নিজেদের পদক্ষেপকে ন্যায্য দেখানো হয়। আর এই প্রক্রিয়া একবার নয়, বহুবার ঘটেছে। সাম্প্রতিক ইরান প্রসঙ্গ সেই ধারারই নতুন উদাহরণ। কিন্তু এই ঘটনাকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় ইতিহাসের ভেতরে, যেখানে একই ধরনের কৌশল বারবার দেখা গেছে। বিকল্প ধারার সংবাদমাধ্যম ট্রুথ আউটের জন্য করা এক সংবাদ বিশ্লেষণে সেই বাস্তবতাই তুলে ধরেছেন স্কট কুরাশিগে।
ইরান প্রসঙ্গ ও সাম্প্রতিক অভিযোগ : ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভয়াবহ বোমা হামলা হয়। বহু শিশু ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়। ঘটনার পরপরই আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে- এই হামলার পেছনে কে? বিভিন্ন সূত্রে ইঙ্গিত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুতই দায় চাপান ইরানের ওপর। তিনি বলেন, এটি ইরানের কাজ। কিন্তু এই দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ তিনি দেননি।
এই ধরনের প্রতিক্রিয়া নতুন নয়। বরং এটি একটি পুরোনো কৌশলের অংশ। যখন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন দৃষ্টি ঘোরাতে অন্য পক্ষকে দায়ী করা হয়। এতে জনমত প্রভাবিত করা সহজ হয়। সাধারণ মানুষ দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। এই ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- এটি যুদ্ধ শুরুর আগেই নয়, বরং যুদ্ধ চলাকালীন দেওয়া বক্তব্য। অর্থাৎ, এখানে আগে থেকে সমর্থন তৈরির চেষ্টাও তেমন ছিল না। লেখকের মতে, এটি দেখায় যে যুদ্ধযন্ত্র এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে অনেক সময় বিস্তারিত ব্যাখ্যারও প্রয়োজন পড়ে না।
এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে বড় প্রশ্ন তোলে। যদি সত্যিই তথ্য বিকৃত করা হয়ে থাকে, তবে তা শুধু একটি ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ধারা, যেখানে যুদ্ধকে ন্যায্য দেখাতে সত্যকে বদলে দেওয়া হয়। আর এই প্রক্রিয়া যতবার ঘটে, ততবার মানুষের বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
হিরোশিমা ও নাগাসাকির উদাহরণ : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র জাপানে দুটি শহরে পারমাণবিক বোমা ফেলে। এই ঘটনাকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এটিকে অন্যভাবে তুলে ধরে। প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ঘোষণা দেন, হিরোশিমা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। বাস্তবে সেখানে নিহতদের বড় অংশই ছিল সাধারণ মানুষ। হাজার হাজার শিশু, নারী ও নিরস্ত্র নাগরিক মারা যায়।
অনেকেই তৎক্ষণাৎ নিহত হয়, আবার অনেকে বিকিরণের কারণে দীর্ঘদিন কষ্ট পেয়ে মারা যায়। নাগাসাকিতেও একই চিত্র দেখা যায়। একটি বিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিহত হয়। তবু এই ঘটনাকে বহু বছর ধরে এমনভাবে শেখানো হয়েছে, যেন এটি যুদ্ধ দ্রুত শেষ করে অসংখ্য প্রাণ বাঁচিয়েছে। এই বয়ান এতটাই শক্তিশালী ছিল যে অনেক মানুষ বিকল্প তথ্য জানার সুযোগই পায়নি। এখানেই বোঝা যায়, কীভাবে একটি রাষ্ট্র নিজের পদক্ষেপকে ন্যায্য দেখাতে বাস্তবতার একটি অংশ তুলে ধরে, আর বাকিটা আড়াল করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আংশিক সত্যই পূর্ণ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এই উদাহরণ শুধু একটি ঘটনার নয়। এটি দেখায়, কীভাবে একটি বড় সামরিক সিদ্ধান্তকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য গল্প তৈরি করা হয়। আর সেই গল্প প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকে।
যুদ্ধের অজুহাত তৈরির ইতিহাস : যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে যুদ্ধ শুরুর আগে সন্দেহজনক বা অসম্পূর্ণ তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। উনিশ শতকের শেষ দিকে একটি যুদ্ধজাহাজ বিস্ফোরণের ঘটনা ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি করে। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরু হয়। পরে এর প্রকৃত কারণ নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। ষাটের দশকে আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখযোগ্য। একটি তথাকথিত নৌ-সংঘর্ষকে বড় করে দেখানো হয়। বলা হয়, শত্রুপক্ষ আক্রমণ করেছে। এই ঘটনার ভিত্তিতে যুদ্ধের অনুমোদন নেওয়া হয়। কিন্তু পরে জানা যায়, সেই সংঘর্ষের অনেক অংশই অস্পষ্ট ছিল।
এই ধরনের উদাহরণ দেখায়, যুদ্ধ শুরু করার আগে একটি নির্দিষ্ট গল্প তৈরি করা হয়। সেই গল্পে শত্রুপক্ষকে আক্রমণকারী হিসেবে দেখানো হয়। এতে যুদ্ধকে আত্মরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা সহজ হয়। এই কৌশল শুধু একটি সময়ের নয়। এটি বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। আর প্রতিবারই জনমতকে প্রভাবিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি : ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের ব্যাখ্যা দেন। তিনি দাবি করেন, আগের সরকারের পারমাণবিক চুক্তি ইরানকে শক্তিশালী করেছে।
তিনি আরও বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু এই দাবিগুলোর পক্ষে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ দেওয়া হয়নি। ফলে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, এই বক্তব্য কতটা বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে। এই ধরনের বক্তব্যের একটি বড় দিক হলো ভয় তৈরি করা। যখন জনগণ মনে করে যে তারা বিপদের মুখে, তখন তারা কঠোর পদক্ষেপকে সহজে সমর্থন করে। এই প্রক্রিয়া নতুন নয়। অতীতেও এমন হয়েছে। তবে এখানে পার্থক্য হলো, অনেক সময় আগে থেকেই সমর্থন তৈরির চেষ্টা করা হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়াও সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে।
শুধু যুদ্ধ নয়, শান্তিকালেও মিথ্যা : লেখক মনে করেন, মিথ্যা শুধু যুদ্ধের সময় সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং শান্তিকালেও তা বজায় থাকে। ইতিহাসের বই, শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম- সব জায়গায় একটি নির্দিষ্ট বয়ান প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই বয়ানে যুক্তরাষ্ট্রকে সবসময় ন্যায্য শক্তি হিসেবে দেখানো হয়। বলা হয়, তারা বিশ্বে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র ছড়ায়। কিন্তু এই বয়ানের বাইরে অনেক বাস্তবতা থাকে, যা সাধারণ মানুষের সামনে আসে না। এইভাবে একটি জাতির পরিচয় গড়ে ওঠে আংশিক সত্যের ওপর। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, তাদের দেশ সবসময় সঠিক কাজ করে। এই ধারণা ভাঙা কঠিন। কারণ এটি শুধু তথ্য নয়, আবেগের সঙ্গেও জড়িত।
আড়াল করার সবচেয়ে বড় কৌশল : সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো তথ্য বাদ দেওয়া। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সরকারি নথি বা পাঠ্যপুস্তকে থাকে না। ফলে মানুষ সেই ঘটনাগুলো জানতেই পারে না। এইভাবে ইতিহাসের একটি বড় অংশ অদৃশ্য হয়ে যায়। যা থাকে, তা হলো নির্বাচিত কিছু তথ্য। এই প্রক্রিয়া এতটাই গভীর যে অনেক সমালোচকও পুরো চিত্রটি বুঝতে পারেন না। তারা একটি ঘটনার সমালোচনা করেন, কিন্তু বৃহত্তর ধারাটি ধরতে পারেন না।
বর্ণবাদ ও মানবজীবনের মূল্য : যুদ্ধের সময় বর্ণবাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শত্রুপক্ষকে কম মূল্যবান হিসেবে দেখানো হয়। এতে তাদের ওপর সহিংসতা চালানো সহজ হয়ে যায়। এই মনোভাব শুধু সৈন্যদের মধ্যেই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে যুদ্ধের প্রতি সমর্থন বাড়ে।
ফিলিপাইন থেকে ভিয়েতনাম, কোরিয়া, ইরাক ও আফগানিস্তান : ফিলিপাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ব্যাপক সহিংসতা দেখা যায়। মানুষকে নির্যাতন, হত্যা, শিবিরে আটকে রাখা- সবই ঘটে। পরে ভিয়েতনামেও একই চিত্র দেখা যায়। একটি গ্রামে গণহত্যা ঘটে। প্রথমে এটিকে সফল অভিযান বলা হয়। পরে সত্য প্রকাশ পায়। কোরিয়ায় নিরস্ত্র মানুষের হত্যার ঘটনা দীর্ঘদিন গোপন ছিল। পরে সাংবাদিকরা তা প্রকাশ করেন। ইরাকে বোমা হামলায় শত শত মানুষ মারা যায়। এটিকে ‘সহযোগী ক্ষতি’ বলা হয়। আফগানিস্তানে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই দায় নির্ধারণ করা হয়েছে।
সময়ের আলো/আআ