ক্ষমতায় আসার পর সরকার ও বিএনপি অনেকটা একাকার। দলের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ নেতা এখন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। তৃণমূলের সামনের সারির নেতারাও এখন স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করছেন। দলের অঙ্গসংগঠনের শীর্ষনেতারাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত। এমনকি অনেকে চেষ্টা-তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন সরকারের বড় পদে আসীন হতে। এই অবস্থায় কার্যত আমেজ ও আবেদন কমেছে দলটির রাজনীতির চেনা ঠিকানা নয়াপল্টনের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা দলগুলোর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া নতুন কিছু নয়। তবে সরকার পরিচালনায় সফল হতে হলে দল ও সরকারের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য। প্রায় ২০ বছর পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। মাসদেড়েক সরকারের বয়স। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েও স্বস্তিতে বিএনপি। কারণ দল পরিচালনায় থাকা নেতারা এখন সামলাচ্ছেন দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব। ফলে নেতারা যখন সরকার পরিচালনায় তখন দলীয় রাজনীতিতে এক ধরনের সাংগঠনিক স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকায় দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নিয়মিত কমিটি দেওয়া হয়ে ওঠেনি। দলের ১১টি সহযোগী সংগঠনের ১০টিরই মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে অনেক আগেই। ফলে অঙ্গসংগঠনগুলোর কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। মূল দল বিএনপিরও কাউন্সিল হয় না ১০ বছর ধরে।
জানা গেছে, সরকারের ভিড়ে ঝিমিয়ে পড়া দল ও অঙ্গসংগঠন চাঙ্গা করতে সম্প্রতি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ধারণা করা হচ্ছে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সারা দেশে দলের সর্বস্তরে বড় ধরনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এ ছাড়া নতুন করে দলের কাউন্সিল করার চিন্তাও আছে বিএনপির হাইকমান্ডের। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এমনটাই জানিয়েছেন।
এ ছাড়া ঈদের আগে তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপির অঙ্গসংগঠনের দিকে মনোযোগ বাড়ানোর কথা বলেন। বিএনপির পাশাপাশি ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের মতো ভ্যানগার্ড সংগঠনগুলোকে নতুন করে সাজানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঈদের আগে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাদের অনেকে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত ছিলেন। কেউ কেউ ভোটে পরাজিত হন। দায়িত্ব দেওয়ায় পর তারাও সরকারি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ঢাকার দুই সিটিসহ দেশের ১১সিটি করপোরেশনে বিএনপি নেতাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হয়েছেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মো. আব্দুস সালাম। একসময় তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক ছিলেন। গত নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট ছিলেন আব্দুস সালাম।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপি নেতা মো. শফিকুল ইসলাম খান। গত নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের কাছে হেরে যান। বাকিগুলোতেও বিএনপির সাংগঠনিক নেতাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দুই দফায় ৫৬ জেলা পরিষদে প্রশাসক বসিয়েছে সরকার। নিয়োগ পাওয়া এই প্রশাসকদের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে প্রার্থী হওয়া অন্তত আটজন রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এমপি, গত নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী ও দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হারুনুর রশিদ ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ-১ আসনের পরাজিত প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স।
সচিবালয়মুখী নেতাকর্মীরা, অচেনা নয়াপল্টন : সরকারের নতুন মন্ত্রিসভা, উপদেষ্টা পরিষদ, সংসদীয় কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপির নীতিনির্ধারক ও প্রভাবশালী নেতাদের। ফলে তাদের বেশিরভাগ সময় কাটছে নিজ নিজ দফতরের কাজ সামলাতে। অথচ একটা সময় তাদের দিনের বেশির সময় দলীয় কার্যালয় ও কর্মসূচি পালনে কাটত। দল সরকারে আসার পর থেকে সেভাবে সাংগঠনিক ব্যস্ততা নেই। সে থেকেই অচেনা দৃশ্য দেখা যাচ্ছে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনে। নেই কোনো দলীয় কর্মসূচি, সাংগঠনিক সভা কিংবা সংবাদ সম্মেলন। কিছু দিন আগেও যেগুলো খুবই নিত্যচিত্র ছিল রাজধানীর নয়াপল্টন কার্যালয়ের। নয়াপল্টনের সরগরম দফতরটি এখন প্রায়ই নেতাকর্মীশূন্য দেখা যায়। রোজই নেতাকর্মীরা মন্ত্রীদের দফতর ও সচিবালয়ে ভিড় করছেন।
সবশেষ ঈদুল ফিতরের পরদিন ২২ মার্চ দুপুরে নয়াপল্টনে মহান স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচি ঘোষণা উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। দফতরের দায়িত্বে থাকা দলের রিজভী অসুস্থ থাকায় দীর্ঘদিন অফিস করতে পারেননি।
বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। ১৯ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটির বেশ কয়েকটি পদ দীর্ঘদিন ধরেই শূন্য। সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা যান গত বছর ৩০ ডিসেম্বর। তিনি টানা ৪১ বছর দলটির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত থেকে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হন তারেক রহমান।
সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে ঘোষণা করা হয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের তালিকা। পদাধিকার বলে কমিটির সদস্য দলটির চেয়ারম্যান। তখন মোট ১৯টি পদের মধ্যে দুটি পদ শূন্য রাখা হয়। পরে এম তরিকুল ইসলাম, আ স ম হান্নান শাহ ও এম কে আনোয়ার মারা যান। তিনজন মারা গেলে পদ শূন্য হয় পাঁচটি। এরপর ১৯ জুন ২০১৯ বেগম সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়। গণঅভ্যুত্থানের পরপর মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনকে স্থায়ী কমিটির সদস্য করে বিএনপি। হাফিজ উদ্দিন আহমদ ত্রয়োদশ সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ করায় তার দলীয় পদটিও শূন্য হয়েছে। এখন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য হলেন ১৫ জন। এর মধ্যে অসুস্থতায় দীর্ঘদিন ধরে দলে নিষ্ক্রিয় আছেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া।
সরকার গঠনের পর শনিবার দলের প্রথম স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উঠে এসেছে কাউন্সিলের বিষয়টি। বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকান্ড আরও বিস্তৃত করে ভবিষ্যতে কিভাবে দলকে দ্রুত কাউন্সিলের দিকে নিয়ে যেতে পারি সেই বিষয়গুলো নিয়ে আজকের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। আমরা মনে করি যে, খুব দ্রুতই আমরা চেষ্টা করব দলকে কাউন্সিলের দিকে যাওয়ার জন্য। তবে এখনও আমরা সময় নির্ধারণ করিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দলের কার্যক্রম তো চলছে, ছোটখাটোভাবে তো চলেছে। এক মাসে সরকার গঠন করতে তো সময় লেগেছে। দলের লোক বেশিরভাগই সরকারে চলে গেছেন। সে জায়গাগুলোতে সময় লাগবে। এটা বিচ্ছিন্ন ব্যাপার না। এটা আলাদা করে দেখা যাবে না। সরকার তার কাজ করবে, দল তার কাজ করবে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স সময়ের আলোকে বলেন, সরকারি দায়িত্বে থাকা সবাই তো দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। এই জায়গায় রিপ্লেসমেন্টটা কঠিন। কারণ দলে গ্রহণযোগ্য ও ত্যাগী মেধাবী নেতার দরকার আছে। আবার দল পুনর্গঠনও দরকার। এটা চলমান প্রক্রিয়া। নেতৃত্ব পরিবর্তনশীল। দল ও সরকার কোনোটাই যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য অত্যন্ত চিন্তাভাবনা করে বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজটি করতে হবে।
দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাসনামলের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, শহিদ জিয়াউর রহমানের সময় একটি নিয়ম ছিল যারা সরকারে থাকবে তারা দলের দায়িত্বে থাকতে পারবে না। তারপরও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মতো ব্যক্তিকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখতে হয়েছে। অনেক চেষ্টা হয়েছে কিন্তু সরকার থেকে পুরোপুরি দলকে আলাদা করা সম্ভব হয়নি।
দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হারুনুর রশিদ সময়ের আলোকে বলেন, দল পুনর্গঠন হবে। দলের যেসব নেতারা মন্ত্রিপরিষদে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজে নিয়োজিত আছেন, তাদের জায়গায় নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। সময় হলে তারা দলের দায়িত্ব অন্যদের কাছে হস্তান্তর করবেন। আর অতীতেও তো এমনই ছিল। বিএনপির সিনিয়র নেতারা সরকারি দায়িত্বে ছিলেন। এমনকি আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও সরকারে ছিলেন। এতে দলের কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্বে থাকলেও দলের কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়েনি। দলের কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক আছে। দল যে দায়িত্ব দিচ্ছে, তা পালন করছি।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, সরকার গঠনের নানা ব্যস্ততা বেড়েছে। এখন আমাদের অগ্রাধিকার হবে সাংগঠনিক পুনর্গঠন। শিগগিরই সেদিকে নজর দেওয়া হবে।
দল ও সরকারের মধ্যে ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক সময়ের আলোকে বলেন, সরকার পরিচালনায় সফল হতে হলে দল ও সরকারের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ক্ষমতায় গেলে অনেক সময় দল ও সরকার কার্যত একীভূত হয়ে পড়ে; ফলে নীতিনির্ধারণ ও দলীয় কাঠামোর সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। এতে জবাবদিহি কমে এবং উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যারা সরকারে থাকেন, তাদের বড় অংশই দলে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকেন; আবার দলীয় নেতারাও সরাসরি সরকারে যুক্ত থাকেন, ফলে পার্থক্য নির্ধারণ কঠিন হয়ে ওঠে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. শামসুল আলম বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা দলগুলোর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া নতুন কিছু নয়। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যারা মন্ত্রিসভায় আছেন তারা আবার দলের সঙ্গেও আছেন। তারা এতদিন অত্যাচার-নির্যাতনের মুখে দলের সঙ্গে ছিলেন। যে কারণে সংগঠনের ওপর চাপ পড়া স্বাভাবিক। এর মধ্যেও সংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। কিন্তু গতি কম।
সময়ের আলো/আরবিএন