৪৫ দিনের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে আলোচনার কথা জানা গেছে। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত মার্কিন, ইসরাইলি ও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সূত্র মারফত জানা গেছে, এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিই ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করার পথ প্রশস্ত করতে পারে। তবে ইরান যুদ্ধবিরতির নামে গাজা বা লেবাননের মতো পরিস্থিতির শিকার হতে চায় না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো আংশিক চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তা সত্ত্বেও এই শেষ মুহূর্তের প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই চেষ্টা ব্যর্থ হলে যুদ্ধের তীব্রতা অভাবনীয়ভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ইরানের জনবসতিপূর্ণ এলাকার অবকাঠামোতে বড় হামলা চালাতে পারে আমেরিকা ও ইসরাইল।
পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানও উপসাগরীয় দেশগুলোর পানি ও জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে।
ইরানকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ১০ দিনের সময়সীমা সোমবার সন্ধ্যায় শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে রোববার ট্রাম্প সেই মেয়াদ আরও ২০ ঘণ্টা বাড়িয়ে মঙ্গলবার পর্যন্ত সময় দিয়েছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে রোরবার ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে এখন যুক্তরাষ্ট্রের ‘গভীর আলোচনা’ চলছে। মঙ্গলবারের সময়সীমা ফুরানোর আগেই চুক্তিতে পৌঁছা যাবে বলে তিনি আশাবাদী।
ট্রাম্প বলেন, চুক্তি হওয়ার ভালো সুযোগ আছে। কিন্তু ওরা চুক্তি না করলে আমি ওখানে সব কিছু গুঁড়িয়ে দেব।
ইরান সরকারের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে দেশটির বেসামরিক নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে ইরানও জানিয়েছে, এমন কিছু ঘটলে তারা ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাবে।
দুটি সূত্রের দাবি, ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ বোমা হামলার পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই প্রস্তুত।
চারটি সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্ক এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে সরাসরি টেক্সট মেসেজও বিনিময় চলছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প প্রশাসন গত কয়েক দিনে ইরানকে বেশ কিছু প্রস্তাব দিলেও তেহরান এখনও তাতে সায় দেয়নি।
সূত্র মতে, মধ্যস্থতাকারীরা আপাতত দুই পর্যায়ের একটি চুক্তির কথা ভাবছেন। প্রথম পর্যায়ে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হবে। সেই সময়ের মধ্যেই আলোচনা চালিয়ে যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ করার চেষ্টা করা হবে। আলোচনার অগ্রগতির জন্য বাড়তি সময়ের প্রয়োজন হলে ৪৫ দিনের এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও বাড়ানো হতে পারে। এ প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় পর্বে পাকাপাকিভাবে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে চুক্তিতে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র জানায়, মধ্যস্থতাকারীরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং ইরানের মজুদ অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের নিষ্পত্তি এই দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সমাধান একমাত্র চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমেই সম্ভব। ইরান তাদের মজুদ ইউরেনিয়াম হয় দেশ থেকে সরিয়ে ফেলবে, নয়তো তার ঘনত্ব কমিয়ে সাধারণ স্তরে নামিয়ে আনবে।
সূত্রের দাবি, আপাতত হরমুজ প্রণালি ও অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের বিষয়ে ইরানকে দিয়ে কিছু ‘আস্থা বৃদ্ধিমূলক’ পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করছে মধ্যস্থতাকারীরা। আসলে দরকষাকষির টেবিলে এই দুটি বিষয়ই তেহরানের প্রধান হাতিয়ার। তাই মাত্র ৪৫ দিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে ইরান এখনই তুরুপের তাস হাতছাড়া করতে রাজি হবে না বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
মধ্যস্থতাকারীরা খতিয়ে দেখছে, চুক্তির প্রথম পর্বে ইরান এই দুই ইস্যুতে অন্তত আংশিক কোনো পদক্ষেপ নিতে রাজি হয় কি না। পাল্টা ট্রাম্প প্রশাসনকেও এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে ইরান নিশ্চিত হয় যে এই যুদ্ধবিরতি কেবল সাময়িক নয় এবং আমেরিকা বা ইসরাইল নতুন করে যুদ্ধ শুরু করবে না।
এদিকে ইরানি কর্তারা মধ্যস্থতাকারীদের কাছে স্পষ্ট করেছেন, তারা গাজা বা লেবাননের মতো পরিস্থিতির শিকার হতে চান না। সেখানে কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও কার্যত ইসরাইল ও আমেরিকা নিজেদের ইচ্ছামতো যখন-তখন হামলা চালায়। এই অবিশ্বাস দূর করতে এবং ইরানের কিছু দাবি মেটাতে ওয়াশিংটন আর কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে, তা নিয়েও চিন্তা-ভাবনা চলছে। যদিও এই বিষয়ে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
আলোচনার বিষয়ে সরাসরি অবগত এক সূত্রের দাবি, আমেরিকা ও ইসরাইল যদি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তবে তেহরান যে পাল্টা আঘাত করবে তা উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও পানি সরবরাহব্যবস্থার জন্য ধ্বংসাত্মক হতে পারে। এই আশঙ্কাতেই প্রবল উদ্বেগে রয়েছে মধ্যস্থতাকারীরা।