সুষ্ঠু বিচারের অন্তরায় মালখানার অব্যবস্থাপনা

মোহাম্মদ গাফফার হোসেন

জাতীয়

অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রথম দায়িত্বগুলোর একটি হলো ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা। এসব আলামতই পরবর্তী সময়ে

2026-04-07T02:26:19+00:00
2026-04-07T02:27:06+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
সুষ্ঠু বিচারের অন্তরায় মালখানার অব্যবস্থাপনা
মোহাম্মদ গাফফার হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬, ২:২৬ এএম  আপডেট: ০৭.০৪.২০২৬ ২:২৭ এএম
সংগৃহীত ছবি
অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রথম দায়িত্বগুলোর একটি হলো ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা। এসব আলামতই পরবর্তী সময়ে মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হলে সেই আলামত আদালতের মালখানায় সংরক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব আলামত সংরক্ষণের দায়িত্ব থাকে আদালত প্রশাসনের ওপর। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, সেই মালখানার অব্যবস্থাপনা এখন সুষ্ঠু বিচারপ্রক্রিয়ার অন্যতম অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যেখানে অপরাধের নীরব সাক্ষ্যগুলো জমা থাকে সেই স্থানগুলোই আজ অবহেলা, অনিয়ম আর অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে একপ্রকার ‘ঝুঁকিপূর্ণ গুদামে’ পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা আলামত, অপর্যাপ্ত জায়গা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং দুর্বল তদারকি সব মিলিয়ে আলামত সংরক্ষণ ব্যবস্থার একটি নাজুক চিত্র ফুটে উঠেছে।

এই অব্যবস্থাপনার বিষয়টি নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে মালখানার করুণ অবস্থা উঠে আসার পর ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচজন আইনজীবী একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। রিটে উল্লেখ করা হয়, কোটি কোটি টাকার জব্দ করা সম্পদ, বিশেষ করে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উচ্চ আদালত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সারা দেশের মালখানাগুলোর অবস্থা জানার নির্দেশ দেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্ট বিভাগ পুলিশপ্রধানকে দুই মাসের মধ্যে থানা ও আদালতের মালখানার হালনাগাদ প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেয়।

তবে নির্দেশনার পরও মাঠপর্যায়ে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

রাজধানী ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের মালখানার চিত্র এই সংকটের একটি প্রকট উদাহরণ। ঢাকার ৫০টি থানার মামলার সব আলামত এখানে জমা হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এখানে আলামতের চাপ বেশি। বর্তমানে দুই থেকে আড়াইল লাখ মামলার আলামত গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। মামলার সংখ্যার তুলনায় আলামতের জট এত বেশি যে বিচারিক কার্যক্রমে বিলম্ব হওয়া এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

মালখানার ভেতরের দৃশ্য আরও উদ্বেগজনক। একটির ওপর আরেকটি করে স্তূপাকারে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আলামত মোটরসাইকেল, রিকশা, ভ্যান, লোহার রড, আসবাবপত্র, প্লাস্টিকের ড্রাম থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক পণ্য পর্যন্ত। অনেক আলামতে মরিচা ধরেছে, কিছু ভেঙে গেছে, আবার কিছু ধুলোর স্তরে ঢেকে গেছে। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি অচল হয়ে পড়ছে, আর ইঁদুরে কেটে ফেলছে গুরুত্বপূর্ণ নথি বা উপকরণ।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিচারপ্রক্রিয়ায়। একটি ফৌজদারি মামলায় আলামত হলো অপরাধ প্রমাণের অন্যতম প্রধান উপাদান। সাক্ষীর বয়ানকে শক্তিশালী করে আলামত। কিন্তু সেই আলামত যদি নষ্ট হয়ে যায় বা হারিয়ে যায়, তা হলে মামলার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন দুর্বল হয়ে যাওয়ায় আসামিরা খালাস পেয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

ঢাকা আদালত এলাকায় দুটি প্রধান মালখানা রয়েছে সিএমএম আদালত ভবনের নিচ তলায় একটি এবং সিজেএম আদালতের নিচ তলায় আরেকটি। কিন্তু বিপুল পরিমাণ আলামত সংরক্ষণের জন্য এ দুটি স্থান একেবারেই অপ্রতুল। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনও তাদের প্রতিবেদনে প্রশস্ত ও আধুনিক মালখানা নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তদন্ত শেষে আলামত আদালতে পাঠানো বাধ্যতামূলক এবং মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তা সংরক্ষণ করতে হয়। ফলে ৫ থেকে ২০ বছর আগের মামলার আলামতও এখনও মালখানায় পড়ে আছে। নতুন আলামত যুক্ত হওয়ার ফলে জায়গা সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।

সংরক্ষণ পদ্ধতিতেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আলামতের গায়ে কেবল মামলার নম্বর বা তথ্য ট্যাগ করে রাখা হয়। উন্নত কোনো ডিজিটাল ট্র্যাকিং বা ক্যাটালগিং ব্যবস্থা নেই। ফলে নির্দিষ্ট কোনো আলামত দ্রুত খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।


মাদক মামলার ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন নিয়ম থাকলেও সেটিও পুরোপুরি কার্যকর নয়। উদ্ধার করা মাদকের নমুনা সংরক্ষণ করে বাকিগুলো আদালতের অনুমতি নিয়ে ধ্বংস করা হয়। 

কিন্তু অন্যান্য আলামতের ক্ষেত্রে এমন কোনো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেই। মামলা নিষ্পত্তির পর সেগুলো নিলামে বিক্রি করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে অনেক আলামত নিলামের আগেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া নিরাপত্তা ঝুঁকিও বড় একটি উদ্বেগের বিষয়। গাদাগাদি করে রাখা আলামতের কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি সবসময় বিদ্যমান। ইতিমধ্যে সিজেএম আদালতের মালখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা বড় ধরনের বিপদের ইঙ্গিত দেয়। নিচ তলায় অবস্থিত হওয়ায় বর্ষাকালে পানি ঢুকে আলামত নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

ঢাকার মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘আলামত ঠিকভাবে সংরক্ষণ না হলে মামলার প্রমাণ উপস্থাপন দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

অপরদিকে পুলিশের অপরাধ, তথ্য ও প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ আশিশ বিন হাছান বলেন, পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় আলামত একটির ওপর আরেকটি করে রাখতে হচ্ছে। এতে অনেক সময় আলামতের আকৃতি ও গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক ও ধাতব আলামত দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। আধুনিক ও ডিজিটাল মালখানা ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত জায়গা, সঠিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নিয়মিত তদারকি এবং দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া সবকিছুর সমন্বয় ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

সবশেষে বলা যায়, মালখানার অব্যবস্থাপনা কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি নয়; এটি সরাসরি বিচারপ্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রভাব ফেলছে। আলামতই যেখানে অপরাধ প্রমাণের মূল ভিত্তি, সেখানে সেই আলামতের নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি দায়িত্ব। এখন দেখার বিষয় নির্দেশনা ও প্রতিশ্রুতির বাইরে বাস্তবে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।


  বিষয়:   অপরাধ  আইনশৃঙ্খলা  মালখানা 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: