সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারিতে ফাঁসছেন প্রকৌশলীরা

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের উদ্বোধনী বৈঠকেই সংসদ কক্ষের সাউন্ড সিস্টেমে বিভ্রাট দেখা গিয়েছিল। সেই একই সমস্যা দেখা দিয়েছে গত রোববারও।

2026-04-08T02:27:22+00:00
2026-04-08T02:27:48+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারিতে ফাঁসছেন প্রকৌশলীরা
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬, ২:২৭ এএম  আপডেট: ০৮.০৪.২০২৬ ২:২৭ এএম
সংগৃহীত ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের উদ্বোধনী বৈঠকেই সংসদ কক্ষের সাউন্ড সিস্টেমে বিভ্রাট দেখা গিয়েছিল। সেই একই সমস্যা দেখা দিয়েছে গত রোববারও। সাউন্ড সিস্টেমের সমস্যার কারণে ওইদিন ৪০ মিনিটের জন্য সংসদ মুলতবি করা হয়। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে পুরো সাউন্ড সিস্টেম পাল্টানোসহ এর সংস্কারকাজের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। 

এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটিও অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার কাজ করছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৭ নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে অন্যত্র বদলি করার পর জড়িত আরও একাধিক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠান আমানত এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

এ ছাড়া সাইমুলটেনিয়াস ইন্টারপ্রিটিশন সিস্টেম (এসআইএস) এবং অধিবেশন কক্ষের সাউন্ড সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান সিটিএলের গাফিলতি রয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিটিএলকে প্রতি বছর মোটা অঙ্কের টাকা সার্ভিস চার্জ দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে বারবার বিভ্রাট ও কয়েক দফা সংসদ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সংসদ কক্ষের সাউন্ড সিস্টেম পুরোটাই পাল্টে নতুন করে বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাজেট অধিবেশনের আগে আগামী মে মাসে নতুন সাউন্ড সিস্টেম বসানোর প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের ৪ কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে।

সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে হাজারো মানুষ। এ সময় তারা অধিবেশন কক্ষ, শপথকক্ষ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংসদ উপনেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপদের কক্ষসহ ৯ তলা ভবনের প্রায় সব কক্ষই তছনছ করে। 

অধিবেশন কক্ষের সাউন্ড সিস্টেম নষ্ট করার পাশাপাশি এমপিদের বসার বেশ কিছু আসন ও টেবিল এবং টেবিলের ওপর থাকা মাইক্রোফোনগুলো ভেঙে ফেলা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সাইমুলটেনিয়াস ইন্টারপ্রিটিশন সিস্টেম (এসআইএস) এবং অধিবেশন কক্ষের সাউন্ড সিস্টেমের মেরামত কাজ শেষ করে গণপূর্ত অধিদফতর। 

সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা জানান, সাউন্ড সিস্টেমসহ এসআইএস নতুন করে বসাতে প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ হতো। তবে বাজেট স্বল্পতার কারণে এটা নতুন না বসিয়ে সংস্কার করতে মাত্র ৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। সংস্কারের এই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল সংসদ ভবন এলাকার দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৭-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমানত এন্টারপ্রাইজকে। 

তবে এই প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ নিলেও তারা কাজটি করায় এসআইএসের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিটিএলকে দিয়ে। কিন্তু তারা যথাযথভাবে কাজ না করে জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করার কারণে এর কার্যক্ষমতা নিয়ে আগেই প্রশ্ন উঠেছিল। তা ছাড়া আমানত এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে কাজ ঠিকমতো না করে বিল নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপদের বাসভবনের যেসব কাজ হয়েছে তা আমানত এন্টারপ্রাইজের নামে কার্যাদেশ দেওয়া হলেও ওই প্রতিষ্ঠান কাজ করেনি। প্রায় তিন কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে দেখানো হলেও দরপত্র স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে কোনো কাজে অনিয়ম হয়নি দাবি করে নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, কার্যাদেশ অনুযায়ী যথাযথভাবেই সাউন্ড সিস্টেম সংস্কার করা হয়েছে। দরপত্র আহ্বান করা হলে আমানত এন্টারপ্রাইজ ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং সিটিএল ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় কাজটি করার প্রস্তাব দিলে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে আমানত এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। 

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয়ের জন্য নতুন সিস্টেম না লাগিয়ে মেরামত করা হয়েছে। এক মাইক্রোফোন থেকে অন্য মাইক্রোফোনের সংযোগ তার ভালো থাকায় মেরামত করার সময় এটা পরিবর্তন করা হয়নি। তবে অধিবেশন শুরু হলে কয়েকটি তারে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় পুরো সাউন্ড সিস্টেম দুই দফায় অচল হয়ে যায়। রোববারের ঘটনার পর এটা আবারও ঠিক করা হয়েছে এবং পরের দিন কোনো সমস্যা হয়নি। তার দাবি এখন নতুন সাউন্ড সিস্টেম না বসালেও কোনো সমস্যা হবে না। বর্তমান সাউন্ড সিস্টেম ঠিক আছে।  

সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সংসদ কক্ষের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সাউন্ড সিস্টেম ঠিকমতো সংস্কার হচ্ছে কি না তদারকির দায়িত্ব ছিল গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী, গণপূর্ত সচিব, সংসদ সচিব এবং স্পিকারের অবর্তমানে সংসদের দায়িত্বে থাকা আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ওপরও। ফলে সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারির দায় তাদের ওপরও বর্তায়। জাতীয় সংসদের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী ও ই/এম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হকসহ অধিদফতরের একটি টিম গত সোমবার জাতীয় সংসদে স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের পুরো বিষয়টি অবহিত করেন। 

এ সময় স্পিকার দেশের সর্বোচ্চ হাউসের সংস্কারকাজের ক্ষেত্রে অবহেলায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে হাউস চালানো অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সাউন্ড সিস্টেম প্রতিস্থাপনের নির্দেশ দেন। চলতি অধিবেশন শেষ হওয়ার পরপরই এর কাজ শুরু করার নির্দেশ দেন যাতে আগামী বাজেট অধিবেশনের আগে মে মাসের মধ্যে কাজ শেষ করা যায়। চলতি অধিবেশন ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। ফলে অধিবেশন শেষে নতুন সাউন্ড সিস্টেম বসাতে এক মাসের মতো সময় পাওয়া যাবে। বাজেট অধিবেশনের আগেই নতুন সাউন্ড সিস্টেম দিতে হবে বলে জানিয়ে দেন স্পিকার।

গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানান, স্পিকারের নির্দেশে সংসদ কক্ষে বিশ্বের সর্বাধুনিক এসআইএস সিস্টেম বসানো হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সারা বিশ্বে খোঁজ নিয়ে তা সংগ্রহের চেষ্টা করা হবে।

কেন বারবার সাউন্ড সিস্টেমে সমস্যা হচ্ছে সংসদকে তার ব্যাখ্যা দিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষুব্ধ জনতা জাতীয় সংসদের আসবাব ও যন্ত্রপাতি ইত্যাদি তছনছ করে। সেই কারণেই ক্রমাগত মাইকের বিভ্রাট দেখা যাচ্ছে। জাতীয় সংসদের সাউন্ড সিস্টেম মেরামত করতে আমেরিকার কোম্পানির আগ্রহ নেই। 

তিনি জানান, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ২০২২ সালে এই সাউন্ড সিস্টেম স্থাপিত করা হলেও এর কোনো ওয়ারেন্টি ছিল কি না, মাইকের কার্যকারিতা কত দিন থাকবে এ নিয়ে কোনো কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে না। অত্যন্ত হেলাফেলার সঙ্গে এই বিশাল কাজ করা হয়েছে। সংসদ কর্তৃপক্ষ আমেরিকার সেই কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সাউন্ড সিস্টেম মেরামতে ওই কোম্পানির কোনো আগ্রহ নেই। তারা অ্যাভয়েড করে যাচ্ছে ক্রমাগত। স্থানীয় যে প্রতিনিধি এই কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল, তারাও দায়সারাভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি সংসদ সচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন, এই ব্যাপারে তদন্ত করে জানানোর জন্য।


  বিষয়:   জাতীয়  সংসদ  অধিবেশন  সাউন্ড  সিস্টেম 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: