গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ঈদের দীর্ঘ ছুটির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি কমেছে। উৎপাদন খাত সংকোচন ধারায় চলে যাওয়ার পাশাপাশি কৃষি ব্যবসা খাতের গতি বেশ কমে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির গতি কমেছে।
ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স (এমসিসিআই) ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশ যৌথভাবে প্রকাশিত পিএমআই সূচকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল বুধবার মার্চ মাসের এই পিএমআই প্রকাশ করা হয়।
মূলত পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স বা পিএমআইয়ের মাধ্যমে প্রতি মাসে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি প্রকাশ করা হয়। গত এক বছরে অর্থনীতির গতি এক মাসে বাড়লে পরের মাসে কমছে। সর্বশেষ গত মাসে পিএমআই মান ২ দশমিক ২ পয়েন্ট কমে ৫৩ দশমিক ৫ পয়েন্ট হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে পিএমআই মান ছিল ৫৫ দশমিক ৭ পয়েন্ট। তার আগের মাসে অর্থাৎ জানুয়ারিতে পিএমআই মান ছিল ৫৩ দশমিক ৯ পয়েন্ট। চলমান সংঘাতের ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় অর্থনৈতিক গতিশীলতা আরও দুর্বল করেছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অর্থনীতি আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অর্থনীতির প্রধান খাত কৃষি ব্যবসা, নির্মাণ, উৎপাদন ও সেবা খাতের ৪০০টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের মতামতের ভিত্তিতে পিএমআই প্রকাশ করা হয়। সূচক তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল ক্রয়, পণ্যের ক্রয়াদেশ, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। মূলত পিএমআই শূন্য থেকে ১০০ নম্বরের মধ্যে পরিমাপ করা হয়।
সূচকের মান ৫০-এর বেশি হলে অর্থনীতির সম্প্রসারণ ও ৫০-এর নিচে হলে সংকোচন বোঝায়। জরিপে অংশ নেওয়া উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের প্রধান অর্থনৈতিক খাতগুলোতে ব্যবসায়িক পরিবেশ মিশ্র অবস্থায় রয়েছে। পবিত্র রমজান মাস ও ঈদুল ফিতর সামনে রেখে মৌসুমি চাহিদা কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে উচ্চ ব্যয় ও অনিশ্চয়তা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। সেবা ও খুচরা খাতে উৎসবকালীন চাহিদার কারণে বিক্রি বাড়ার প্রত্যাশা থাকলেও, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল, শ্রম, পরিবহন ও ইউটিলিটি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মুনাফার ওপর চাপের কথা উল্লেখ করেছেন তারা।
উদ্যোক্তারা আরও বলেছেন, উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে ক্রয়াদেশ কমেছে। বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী ও ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও ব্যবসায়িক আস্থাকে প্রভাবিত করছে।
জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ উদ্যোক্তা বলছেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে আগামী মাসগুলোতে ব্যবসায়িক পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘গত মাসের পিএমআই সূচকগুলো ইঙ্গিত করে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হচ্ছে। যা প্রধানত উৎপাদন খাতের মন্দার কারণে হয়েছে।
দীর্ঘ ছুটি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বৈশ্বিক চাহিদার অনিশ্চয়তা এই খাতে প্রভাব ফেলেছে। চলমান সংঘাতের ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় অর্থনৈতিক গতিশীলতা আরও দুর্বল করেছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অর্থনীতি আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
মার্চ মাসে দেশের উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে সংকোচন
পিএমআই সূচকে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি কিছুটা সম্প্রসারণে থাকলেও উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে উল্লেখযোগ্য সংকোচন পরিলক্ষিত হয়েছে। বিষয়টিকে অর্থনীতির জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পিএমআই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার বিষয়ে সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদান করে থাকে, যাতে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং নীতিনির্ধারকরা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। মার্চ মাসে পিএমআই সূচক ৫৩ দশমিক ৫-এ নেমে এসেছে, যা আগের মাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এই ধীরগতির প্রধান কারণ হিসেবে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
উৎপাদন খাত, যা গত ১৮ মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারণে ছিল, মার্চ মাসে প্রথমবারের মতো সংকোচনের মুখে পড়ে। নতুন অর্ডার ও রফতানি হ্রাস, সমাপ্ত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া, আমদানি কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানে পতনের কারণে এই খাতটি চাপের মধ্যে পড়ে। যদিও কারখানা উৎপাদন, ইনপুট ক্রয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কিছু সূচকে এখনও সম্প্রসারণ বজায় রয়েছে। তবুও সামগ্রিকভাবে উৎপাদন খাতের এই পতন শিল্প খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে নির্মাণ খাত টানা দ্বিতীয় মাসের মতো সংকোচন রেকর্ড করেছে, যেখানে নতুন ব্যবসা ও নির্মাণ কার্যক্রমে স্পষ্ট পতন লক্ষ করা গেছে। বিনিয়োগের ধীরগতি, সতর্ক ক্রেতা আচরণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব- এই খাতের দুর্বলতার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্বল অর্ডার প্রবাহ, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি এই দুই খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ ছুটি ও মৌসুমি প্রভাবও উৎপাদন ও নির্মাণ কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে, যার ফলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি উচ্চ ব্যয়, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকে, তবে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে আগামী মাসগুলোতে ধীরে ধীরে উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিষেবা খাত ধারাবাহিকভাবে ১৮তম মাসের মতো সম্প্রসারণ রেকর্ড করেছে। মার্চে প্রবৃদ্ধির গতি সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন ব্যবসা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, কর্মসংস্থান, ইনপুট খরচ এবং অর্ডার ব্যাকলগ- সব সূচকেই সম্প্রসারণ দেখা গেছে। আগামী দিনের দৃষ্টিকোণ থেকে, ভবিষ্যৎ ব্যবসা সূচক কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও পরিষেবা- অর্থনীতির সব প্রধান খাতেই সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ব্যবসায়িক আশাবাদের প্রতিফলন।
উত্তরদাতাদের মতে, দেশের প্রধান অর্থনৈতিক খাতগুলোতে ব্যবসায়িক পরিবেশ মিশ্র অবস্থায় রয়েছে, যেখানে রমজান ও ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে মৌসুমি চাহিদা কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে উচ্চ ব্যয় এবং অনিশ্চয়তা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
পরিষেবা ও খুচরা খাতে উৎসবকালীন চাহিদার কারণে বিক্রি বাড়ার প্রত্যাশা থাকলেও, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল, শ্রম, পরিবহন ও ইউটিলিটি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মুনাফার ওপর চাপের কথা উল্লেখ করেছে।
তবে অধিকাংশ উত্তরদাতা মনে করছেন যে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে আগামী মাসগুলোতে ব্যবসায়িক পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে।
সময়ের আলো/কেএইচও