বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেরা ক্রিকেটারদের একজন তামিম ইকবাল। যিনি এতদিন ব্যাট হাতে প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন, এবার তাকে নামতে হচ্ছে ভিন্ন এক লড়াইয়ে। বাইশ গজের বাইরে, দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের কঠিন বাস্তবতায়। বিতর্ক, অনিয়ম আর রাজনৈতিক টানাপড়েনের মাঝে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নেতৃত্ব এখন তার কাঁধে। তাই এই নতুন অধ্যায়কে অনেকেই বলছেন, তামিমের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ‘অ্যাসিড টেস্ট’।
মঙ্গলবার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভেঙে দেওয়া হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ। পরক্ষণেই ঘোষণা করা হয় ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি, যার নেতৃত্বে আনা হয় তামিমকে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা, যার বড় অংশই ঘিরে রয়েছে কমিটির গঠন ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা।
তামিমকে এই দায়িত্বে দেখা অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত। কারণ, বিসিবির সর্বশেষ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এরপর বিভিন্ন সময়ে বোর্ডের নানা সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করেছেন খোলাখুলিভাবে। সেই তামিমই এখন বোর্ডের নেতৃত্বে। এই পরিবর্তনই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, তিনি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন।
অবশ্য দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজের অগ্রাধিকার স্পষ্ট করেছেন তামিম। তিনি বলেছেন, ‘প্রথমে মনে করি এখানে যখনই এরকম কেউ দায়িত্ব পান তখন ডেভেলপমেন্টের কথা বলেন বা বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্লাস। আমার টিম এটা ফিল করে, সবাই মিলে আমরা একসঙ্গে ফিল করি যে আমাদের প্রথম কাজ হবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের রেপুটেশন ঠিক করা। এ লাস্ট এক-দেড় বছরে যে রেপুটেশন ড্যামেজ হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের, এই ক্রিকেটের রেপুটেশনটা ঠিক করা হলো আমাদের সবচেয়ে ইমপোর্ট্যান্ট কাজ।’
সাম্প্রতিক সময়ে বিসিবিকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে- নির্বাচনি অনিয়ম, প্রশাসনিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক প্রভাব। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে দেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি। সেই অবস্থায় দাঁড়িয়ে তামিমের প্রথম চ্যালেঞ্জই হচ্ছে এই ক্ষতিগ্রস্ত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা।
তবে শুধু ইমেজ পুনর্গঠনই নয়, সামনে রয়েছে আরও বড় দায়িত্ব- একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন। এনএসসি তামিমদের কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব দিয়েছে। এ বিষয়ে তামিমের অবস্থানও পরিষ্কার, ‘আমাদের একটা দায়িত্ব দিয়ে আনা হয়েছে যে ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন হেল্প করা তিন মাসের মধ্যে।
আমাদের যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমরা এই দায়িত্বটা যতটা অনেস্টিভাবে পালন করতে পারি আর যতটা দ্রুতভাবে আমরা এই জিনিসটা করতে পারি ওই জিনিসটাই করব।’ বিসিবি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণাও দিয়ে রেখেছেন তিনি, ‘অবশ্যই আমরা ইলেকশন করব। এখানে আপনি আমাকে ব্যক্তিকে জিগ্যেস করতে হবে। আমার ইচ্ছা থাকতে পারে আমি করতে পারি বা ওদের ইচ্ছা থাকতে পারে বা ওনার ইচ্ছা নাও থাকতে পারে।’
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, যে বোর্ডে সম্প্রতি একের পর এক অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন ঘিরে, সেখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সহজ হবে না। তার ওপর অ্যাডহক কমিটির সদস্যদের ভবিষ্যৎ নির্বাচন অংশগ্রহণ নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা, যা স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তুলতে পারে।
তামিম ইকবালের সামনে এখন শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং আস্থা ফেরানোর এক কঠিন লড়াই। ব্যাট হাতে তিনি বহু ম্যাচ জিতিয়েছেন, কিন্তু বোর্ডরুমের এই ম্যাচে জয় পেতে হলে লাগবে ভিন্ন ধরনের নেতৃত্ব, কৌশল আর দৃঢ়তা। আগামী তিন মাসই বলে দেবে- এই ‘অ্যাসিড টেস্টে’ তামিম কতটা সফল হন।
সময়ের আলো/কেএইচও