ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে আগামী ১২ মে ভোট গ্রহণ হবে। আর তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই দলের মনোনয়ন পেতে সিনিয়র নেতাদের কাছে তদ্বির ও দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। সরকারি দল বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বায়োডাটা জমা দেওয়ার হিড়িক পড়েছে। তদবিরে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন দলের সিনিয়র নেতারা।
৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১টি আসন পাবেন।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেছে, ইতিমধ্যে তালিকা করার কাজ চলছে। এখন যারা বায়োডাটা জমা দিয়েছেন সেগুলো বাছাই করে শর্ট লিস্ট করে আগ্রহী প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে।
অনেকেই আছেন যারা কখনো বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। আন্দোলন-সংগ্রামেও কোনো অবদান নেই, তারাও মনোনয়নের জন্য বায়োডাটা জমা দিচ্ছেন। গুলশান কার্যালয়, মন্ত্রণালয় বা নেতার বাসায় গিয়ে নানাভাবে তদবির করছেন।
বুধবার সরেজমিন বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে বায়োডাটা জমা দিচ্ছেন। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না থাকায় তাদের অনেককেই চিনতে পারছেন না কার্যালয়ের স্টাফরা। বেশিরভাগ বায়োডাটায় আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা বা দলীয় পদের কথা উল্লেখ নেই। অনেকের বায়োডাটার সঙ্গে আবার মন্ত্রী-এমপিদের সুপরিশ সংযুক্ত করা রয়েছে।
কার্যালয়ের একাধিক স্টাফ সময়ের আলোকে বলেন, ইতিমধ্যে হাজারের অধিক বায়োডাটা জমা পড়েছে। যারা জমা দিচ্ছেন তাদের অধিকাংশকে কোনো দিন রাজপথে বা পার্টি অফিসে দেখা যায়নি। অনেকের পরিবারের কেউ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত নন। এখন তারাই প্রার্থী হতে চাইছেন।
দলের একাধিক সিনিয়র নেতা সময়ের আলোকে বলেছেন, গত ১৭ বছর যে নারীনেত্রীরা আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন, দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পারিবারিক অবদান, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জনসম্পৃক্ততা রয়েছে, সংসদে ভূমিকা রাখতে পারবেন, তাদের খুঁজে বের করে তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি গত মঙ্গলবার বলেছেন, রাজপথের ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা স্থান পাবেন। নতুন-পুরোনো মিলিয়েই নারী সদস্য হিসেবে মনোনীত হবেন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপি যোগ্য, আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখা, ত্যাগী ও পরীক্ষিতদের মূল্যায়ন করবে।
আলোচনায় এগিয়ে যারা : সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেত্রী শিরিন সুলতানা, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের বর্তমান সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেত্রী শাম্মী আক্তার, সাবেক এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি, রেহেনা আক্তার রানু, সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, রাশেদা বেগম হীরা, সংসদ নির্বাচনে পরাজিত ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, সাবিরা সুলতানা, সানজিদা ইসলাম তুলি, নাদিরা চৌধুরী।
এ ছাড়া আলোচনায় রয়েছেন- ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী, মরহুম শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন, বিএনপি নেত্রী অপর্ণা রায়, ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সেলিনা সুলতানা নিশিতা, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, নাদিয়া পাঠান পাপন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, বিএনপির প্রয়াত নেতা নাসিরুদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা, পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক খায়রুন নাহার ও বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা।
কন্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, রিজিয়া পারভীন ও কনকচাঁপা, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসিমউদ্দিন মওদুদ এবং বিএনপির এক সময়ের প্রয়াত মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের মেয়ে ব্যারিস্টার সালিমা বেগম অরুনি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরীর নামও তালিকায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
পরিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে আলোচনায় রয়েছেন- সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, বিএনপির সাবেক এমপি প্রয়াত আমান উল্লাহ চৌধুরী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী প্রয়াত বেগম রাহিজা খানম ঝুনুর মেয়ে নৃত্যশিল্পী ফারহানা চৌধুরী বেবী, লন্ডন বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিন আহমেদের মেয়ে সাবরিনা খান এবং মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পুত্রবধূ খাদিজাতুল কোবরা সুমাইয়া বা এই পরিবারের অন্য কোনো সদস্য।
এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাজমেরি ইসলাম, অধ্যাপক তাহমিনা বেগম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. নাহারিন খান, ডা. সৈয়দা তাজনিন ওয়াইরিস সিমকি, মহিলা দলের সহ-স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ, নেওয়াজ হালিমা আর্লি, সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নী এবং সেলিমুজ্জামান সেলিমের স্ত্রী সাবরিনা শুভ্রও রয়েছেন আলোচনায়।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য আরিফা সুলতানা রুমা সময়ের আলোকে বলেন, কারা গত ১৭ বছর যারা রাজপথে ছিলেন, ত্যাগ তিতিক্ষা রয়েছে, তা বিএনপির শীর্ষ নেতারা জানেন। আমাদের দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি ভাইও বলেছেন, ত্যাগী ও পরীক্ষিতদের খুঁজে বের করে মনোনয়ন দেয়া হবে। দল সেই বিবেচনায় মনোনয়ন দেবে। আমি আশাবাদী।
নিলোফার চৌধুরী মনি সময়ের আলোকে বলেন, যারা আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন না তারাও মনোনয়ন পেতে বায়োডাটা জমা দিচ্ছেন, লবিং তদ্বির করছেন, এটা দুঃখজনক। অবশ্যই দল তাদের বিষয়ে ভাববে এবং কাজ করবে।
সময়ের আলো/কেএইচও