স্বাভাবিক হওয়ার পথে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

এমএকে জিলানী

জাতীয়

বিগত ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশ ভারত বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিল। ২০২৪ এবং

2026-04-10T02:37:57+00:00
2026-04-10T02:37:57+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
স্বাভাবিক হওয়ার পথে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক
এমএকে জিলানী
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৩৭ এএম   (ভিজিট : ২৩)
প্রতীকী ছবি
বিগত ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশ ভারত বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিল। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে ছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পর ভারত একাধিকবার বলেছে যে তারা বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করবে। গত ৭ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি গেলে পরদিন ৮ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে তিনি বৈঠক করেন। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, দুই পক্ষই দুই দেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে সম্মত হয়েছে। সম্পর্ক এখন স্বাভাবিক হওয়ার পথে। তবে ভিসা ও বাণিজ্যসহ সব ইস্যু প্রকৃত অর্থে কোনদিকে যাচ্ছে তা দেখার জন্য আরও সময় অপেক্ষা করতে হবে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় (২০২৪-২০২৬) দুই দেশের সম্পর্কে তিক্ততা বাড়ে। এই তিক্ততার বড় কারণ ছিল, ভারত হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় ঢাকায় অসন্তোষ। এ ছাড়া সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে উত্তেজনা (বিএসএফ-বিজিবি সংঘাত), বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা, অ্যান্টি-ইন্ডিয়া রেটরিকসহ একাধিক কারণ ছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্কে ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। 

ভারত এই ভোটের আগে বলেছিল যে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে তারা কাজ করতে প্রস্তুত। ভোটের পর ঢাকার নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারত তাদের স্পিকার ও পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দেয়। 

সর্বশেষ গত ৮ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর এবং তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ পুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে গত ৭ এপ্রিল ভারতের রাজধানীতে পৌঁছানোর পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গেও একটি বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় উভয়পক্ষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দেয়। তারা গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের একাধিক মন্ত্রীর বৈঠক প্রসঙ্গে ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়, শহিদ ওসমান হাদির সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তিতে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে গ্রেফতার ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা এবং তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশ পক্ষ তাদের অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করে। 

আলোচনার সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর বলেন, আগামী সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা, বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসা সহজ করা হবে। এ ছাড়া সম্প্রতি ভারত কর্তৃক বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ভারতের মন্ত্রী হরদীপ পুরীকে ধন্যবাদ জানান এবং ডিজেল ও সারের সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানোর অনুরোধ করেন। ভারতের মন্ত্রী পুরী ইঙ্গিত দেন যে, ভারত সরকার এই অনুরোধ সানন্দে ও অনুকূলভাবে বিবেচনা করবে।

অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী (ভারতের) নতুন সরকারের (বাংলাদেশের) সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার জন্য ভারতের আকাক্সক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। উভয়পক্ষ প্রাসঙ্গিক দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে অংশীদারত্বকে আরও গভীর করার জন্য প্রস্তাব খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছে। শিগগিরই পরবর্তী আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


কূটনৈতিক সূত্রগুলো আরও বলছে যে চলমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সংকটসহ একাধিক ইস্যুতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে আলাপ হয়েছে। যা ইতিবাচক। ভারত খুব সহসা ভিসা ইস্যু পুরোদমে চালু করার ইঙ্গিত দিয়েছে, এই বিষয়ে শতভাগ কার্যকারিতার জন্য হয়তো পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। হাদি হত্যার আসামিদের ফেরত দেওয়া, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফেরত প্রসঙ্গে ভারতের বিবৃতিতে কিছু বলা হয়নি। এই বিষয়ে সামনের দিনে ভারত কী করে তা জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর প্রসঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার বীণা সিক্রি বলেন, বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর একটি ভালো ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন বিএনপি সরকারকে ভারত অত্যন্ত স্বস্তির সঙ্গে স্বাগত জানিয়েছে। তিনি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, এবং এটিকে আশ্বস্তকারী হিসেবে দেখা হয়েছিল, কারণ এর বিকল্প ছিল জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমতায় আসা। 

অন্তর্বর্তী সরকারে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস যখন ১৮ মাস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তখন জামায়াতে ইসলামীকে ব্যাপকভাবে নেপথ্যের শক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। সেই সময়ে আমরা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি অত্যন্ত নেতিবাচক প্রবণতা প্রত্যক্ষ করি। অধ্যাপক ইউনূস কঠোর মন্তব্য করেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাস্তবায়িত হওয়া অনেক বাণিজ্য ও সংযোগ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন। এর মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের ব্যবহার, মংলা বন্দর পুনরুজ্জীবনের প্রকল্প, চট্টগ্রাম থেকে উত্তর-পূর্ব পর্যন্ত সংযোগ সড়ক এবং আগরতলা-আখাউড়া। সব রাস্তায় দেরি হয়েছিল। ফলে সম্পর্কে অবনতি ঘটেছিল। এখন বাংলাদেশের নতুন সরকারের সময়ে আশা করছি যে দুই পক্ষের সম্পর্ক এগিয়ে যাবে এবং আরও নিবিড় হবে।

অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, ভারত ইস্যুতে বাংলাদেশে বড় আকারে যে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা হচ্ছে যে ভারত বিগত সময়ে বাংলাদেশের একটা দলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছিল। সেই সম্পর্ক জনগণের সঙ্গে ছিল না বা একটি রাজনৈতিক দল ব্যতীত বাকি অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ছিল না। এটাই ছিল বড় সমালোচনা। তারপর গত ১৭ বছরে যে তিনটা নির্বাচন হয়েছে বাংলাদেশে তাতেও অনেক সমস্যা ছিল। 

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত শুরু থেকেই (একাত্তর থেকে) এমন সম্পর্ক চাচ্ছিল যে ঢাকা তার নিজের ইস্যুতে তাদের (ভারত) কনসার্ন ছাড়া তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারবে না। এ সমালোচনাই বড় সমালোচনা। এখন প্রশ্ন উঠেছে যে এই সমালোচনা কাটিয়ে ওঠা যাবে কি না? পরিবর্তন হবে কি না? 

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব যখন ঢাকা সফরে এসেছিলেন তখন তিনি বলেছেন এবং তাদের বিবৃতিতেও ছিল যে ভারত বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক করতে চায়। ভারত হয়তো বুঝতে পেরেছে যে তাদের কৌশলে পরিবর্তন বা সংশোধন আনতে হবে। এখন কাজে যতক্ষণ পর্যন্ত এই বিষয়টির প্রতিফলন না ঘটবে ততক্ষণ পর্যন্ত বোঝা মুশকিল।

এফআর


  বিষয়:   স্বাভাবিক  ঢাকা  দিল্লি  সম্পর্ক 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: