দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জয়ী হয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পাশাপাশি সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং চিফ হুইপ ও ৬ জন হুইপ নিয়োগ সম্পন্ন করেছে বিএনপি। ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হওয়ার আগে বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতা নিয়োগের প্রজ্ঞাপনও জারি হয়েছে। এখন বাকি রয়েছে শুধু সংসদ উপনেতা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংসদ সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন। সংসদের চলমান প্রথম অধিবেশনের শেষ দিকে কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে এবং পরবর্তী অধিবেশনে সব কমিটি গঠন শেষ করা হবে বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম মনি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভায় বাদ পড়া সিনিয়র নেতা ও একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদীয় কমিটির সভাপতি হতে তৎপর হয়েছেন। বিএনপির বাইরে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি থেকে ১০ জনকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদের দফা (১)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংসদ (ক) সরকারি হিসাব কমিটি, (খ) বিশেষ অধিকার কমিটি এবং (গ) সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্দিষ্ট অন্যান্য স্থায়ী কমিটি গঠন করা হবে। একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংসদীয় কমিটি ছিল ৫০টি। এর মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি এবং বাকিগুলো সংসদ সম্পর্কিত। সংসদ সম্পর্কিত কমিটিগুলো হচ্ছে কার্য উপদেষ্টা কমিটি, কার্যপ্রণালি বিধি সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, পিটিশন কমিটি, লাইব্রেরি কমিটি, সংসদ কমিটি, বেসরকারি সদস্যদের বিল ও বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি, সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটি এবং সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি অনেকটা ছায়া মন্ত্রীর মতোই। রেওয়াজ অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের কাজের তদারকি করবে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। তাই মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিতে কারা আসছেন, এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী কমিটিগুলো করেন সংসদ নেতা নিজেই। চিফ হুইপ বা স্পিকার সংসদ নেতার অনুমোদনক্রমে এগুলো সংসদে উপস্থাপন করার পর কণ্ঠভোটে তা গ্রহণ করে সংসদ।
আরও পড়ুন
সরকার দলীয় একাধিক এমপি ও হুইপ জানান, সাধারণত সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এমপি নির্বাচিত হয়ে থাকলে তাদের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিতে না পারলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়। কিন্তু এবার নির্বাচিতদের অধিকাংশই নতুন এবং সাবেক মন্ত্রীদের অনেকেই মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। ফলে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে সিনিয়র এবং নতুন এমপিদের জায়গা দেওয়া হবে।
এবার অর্থ অথবা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান এবং স্বাস্থ্য অথবা জ্বালানি মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন আসতে পারেন। এ ছাড়া গয়েশ্বর চন্দ্র রায় পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়, ড. ওসমান ফারুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়, আলতাফ হোসেন চৌধুরী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, বরকত উল্লাহ বুলু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জয়নুল আবদীন ফারুক গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, আমান উল্লাহ আমান প্রবাসী কল্যাণ অথবা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, লুৎফুজ্জামান বাবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আলী আজগর লবি যুব ও ক্রীড়া, গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, জয়নুল আবেদীন আইন মন্ত্রণালয়, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
সভাপতি হিসেবে আরও আলোচনায় রয়েছে আজিজুল বারী হেলাল, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, জয়নাল আবেদীন, খায়রুল কবির খোকন, কলিম উদ্দিন আহমেদ, এবিএম মোশাররফ হোসেন, আবুল হোসেন খান, এ কে এম ফজলুল হক মিলন, আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, রেজা কিবরিয়া, কুষ্টিয়া-১-এর রেজা আহমেদ এবং বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থের নাম।
এ ছাড়া জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী বিরোধী দল থেকে এবার গুরুত্বপূর্ণ চারটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ পাচ্ছে। এগুলো হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি, সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ও বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। এর বাইরে এমপির আনুপাতিক হারে আরও ৬টি কমিটি জামায়াত জোট পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জামায়াত জোট থেকে সভাপতি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন জামায়াতের শাহাজান চৌধুরী, জি এম নজরুল ইসলাম, এটিএম আজহারুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম খান ও এনসিপির আকতার হোসেন।
সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের নির্ধারিত কোনো পদমর্যাদা না থাকলেও সংসদ ভবনে সরকারিভাবে একটি অফিস পেয়ে থাকেন। এর বাইরে সিনিয়র সহকারি সচিব অথবা উপসচিব পদমর্যাদার একজন একান্ত সচিব (পিএস) ও একজন অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর এবং অফিসে আপ্যায়ন খরচ বাবদ ১২ হাজার টাকা মাসিক ভাতা পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া গাড়িতে সংসদের পতাকা ওড়াতে পারেন।
সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার জন্য এমপিদের অনেকেই দলের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও চিফ হুইপের সঙ্গে দেখা করে আগ্রহ প্রকাশ করে বিষয়টি সংসদ নেতা তারেক রহমানের নজরে আনার অনুরোধ করছেন।
একজন হুইপ জানান, যতটুকু অনুমান করতে পারি বা করতে পারছি তা হচ্ছে মন্ত্রিসভা-সংসদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের মতো চমকই তিনি দেবেন। যাদের মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া সম্ভব হয়নি, অতীতে অনেকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের প্রাধান্য দেবেন।
তিনি বলেন, মন্ত্রিসভা গঠনে তারেক রহমান যেমন চমক দিয়েছেন, তেমনই সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পদেও চমক অপেক্ষা করছে। এ ছাড়া সংসদের ভারসাম্য ও স্বচ্ছতার জন্য বিরোধী দল ও স্বতন্ত্রদের মধ্যে সংসদ বিষয়ে দক্ষদের এবার সভাপতি করা হতে পারে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম মনি সময়ের আলোকে বলেন, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী চলতি অধিবেশনেই সংসদীয় কমিটি গঠনের কাজ শুরু হবে এবং পরবর্তী অধিবেশনে সব কমিটি গঠনের কাজ শেষ হবে। সভাপতি ও সদস্য কারা হবেন তা সংসদ নেতাই ঠিক করে দেবেন। এরপর তা অনুমোদনের জন্য সংসদে উত্থাপন করা হবে। কমিটির বিষয়ে সংসদ নেতা এখনও কোনো দিকনির্দেশনা দেননি।
তিনি জানান, ঐকমত্য অনুযায়ী বিরোধী দল থেকে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে।
এমপির আনুপাতিক হারে বিরোধী দল সভাপতি পাচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সংসদ নেতা এ বিষয়ে নির্দেশনা দেবেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র এমপিদের মধ্য থেকে কাউকে সভাপতি করা হবে কি না সে বিষয়েও সংসদ নেতা সিদ্ধান্ত দেবেন।
দেশের সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদের দফা (২)-এ সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা ও কার্যাবলির বর্ণনায় বলা হয়েছে, কমিটি সংবিধান ও অন্য কোনো আইন সাপেক্ষে (ক) খসড়া বিল ও অন্যান্য আইনগত প্রস্তাব পরীক্ষা করতে পারবে; (খ) আইনের বলবৎকরণ পর্যালোচনা এবং অনুরূপ বলবৎকরণের জন্য ব্যবস্থাদি গ্রহণের প্রস্তাব করতে পারবে; (গ) জনগুরুত্বসম্পন্ন বলে সংসদ কোনো বিষয় সম্পর্কে কমিটিকে অবহিত করলে সে বিষয়ে কোনো মন্ত্রণালয়ের কাজ বা প্রশাসন বিষয়ে অনুসন্ধান বা তদন্ত করতে পারবে।
এএডি/