সুজনের প্রয়াত পাঁচ নেতার স্মরণে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার বিকেল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে শোকসভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বক্তারা সুজনের সভাপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ড. তোফায়েল আহমেদ, জাতীয় কমিটির সদস্য রওশন জাহান, রংপুর বিভাগের সমন্বয়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন এবং সিলেট বিভাগের সমন্বয়ক ফারুক মাহমুদ চৌধুরীকে স্মরণ করেন। তারা সভায় প্রয়াত এই পাঁচ নেতার সততা, কর্মনিষ্ঠা ও জনকল্যাণে অবদানের কথা তুলে ধরেন।
তারা বলেন, এসব নেতা নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ ও তৃণমূলে সমাজসেবামূলক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিচারপতি এম এ মতিন। তিনি বলেন, এম হাফিজ উদ্দিন খান ও ড. তোফায়েল আহমেদ ছিলেন কাজপাগল মানুষ, যারা আজীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। তারা ছিলেন আপাদমস্তক ভদ্রলোক। আমরা তাদের ধারেকাছেও যেতে পারবো না। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে সৎ ও যোগ্য লোক খোঁজা হচ্ছিল। তখন চাকরি জীবনে সততা ও যোগ্যতার কারণে এম হাফিজ উদ্দিন খানকে উপদেষ্টা হিসেবে বাছাই করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, রওশন জাহান ছিলেন একজন মানবতাবাদী মানুষ ও সুলেখক। আকবর হোসেন তার কাজের মাধ্যমে বহু মানুষের জীবন স্পর্শ করেছেন। ফারুক মাহমুদ চৌধুরী সবসময় সিলেটের উন্নয়নে, মানুষের উন্নয়নে কী কাজ করা যায় সবসময় ভাবতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সদালাপী মানুষ।
স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্যে সুজন সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এম হাফিজ উদ্দিন খান, ড. তোফায়েল আহমেদসহ প্রয়াত সুজন নেতাদের প্রত্যেকের সঙ্গে ছিল আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এম হাফিজ উদ্দিন খানের সঙ্গে খেলা মেলা ভাবে কথা বলতে পেরেছি, তার সঙ্গে কাজ করা অত্যন্ত সহজ ছিল। মানুষের অধিকার, তথ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা অনেকগুলো মামলা করেছি, প্রায় সবগুলোতে হাফিজ উদ্দিন খান ও তোফায়েল আহমেদ বাদী ছিলেন।
তিনি বলেন, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন আমার বন্ধু ও সহযোগী। বিভিন্ন বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক হলেও আমাদের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ছিল। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন যেন বাস্তবায়ন হয় সেজন্য আমি আমার দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রওশন জাহানের বোন ড. রওনক জাহান বলেন, আমার বোন রওশন জাহান ছিলেন একজন দয়ালু ও বিনয়ী একজন নারী অধিকারকর্মী। তিনি কর্মী হয়ে থাকতেই পছন্দ থাকতেন। তিনি স্বেচ্ছাব্রতী হিসেবে বিভিন্ন সংগঠনে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইংরেজি ও বাংলা দু ভাষাতেই দক্ষ ছিলেন। সম্মানী ছাড়াই তিনি বিভিন্ন সংগঠনের বার্ষিক প্রতিবেদন ও প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরি করে দিতেন। এক ভলিউমে রওশন জাহানের সব লেখাপত্র প্রকাশ হওয়া দরকার হওয়া দরকার বলেও এসময় মন্তব্য করেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাসুম বলেন, সুজনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মোজাফফর আহমদের সঙ্গে কাজ গিয়ে রওশন জাহানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনি অত্যন্ত স্নেহশীলা মানুষ ছিলেন। আমি আশা করি, প্রয়াত সুজন নেতৃবৃন্দ যেসব ভালো কাজ করে গেছেন সেগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়িত হবে।
ড. তোফায়েল আহমেদের স্ত্রী মাসুদা আক্তার চৌধুরী বলেন, আমি একজন ভালো মানুষকে হারিয়ে ফেলেছি। তিনি কাজকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। অনেকটাই সংসার বিমুখ মানুষ ছিলেন। তিনি বন্ধু-বান্ধব ছাড়া চলতে পারতেন না। শেষ বয়সে তিনি ধর্ম-কর্মের দিকে ঝুঁকে গেলেন। তাঁকে হারিয়ে এখন মনে হচ্ছে, আমি কার সঙ্গে ঝগড়া করেছি। তিনি কারো সঙ্গে ঝগড়া করতেন না। আমি যদি বলতাম কেন এত পরিশ্রম করেন? তিনি বলতেন, আমি মরে গেলে আমার বইপত্র ও কমিশনের প্রতিবেদনগুলো কেউ না কেউ পড়বে। আমার আশা থাকবে, যাতে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সভায় আরও বক্তব্য দেন সুজনের নির্বাহী সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম, নারী উদ্যোক্তা ও সংগঠক তাজিমা হোসেন মজুমদার, বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও রওশন জাহানের বোন নিলুফার আহমেদ, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড-বার্ডের পরিচালক ফৌজিয়া নাসরীন কলি প্রমুখ।