জ্বালানি ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে চালু হওয়া ফুয়েল পাস অ্যাপে নিবন্ধন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহকরা। অ্যাপস ও ওয়েবসাইট ঠিকমতো কাজ না করায় অনেকে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারছেন না। অন্যদিকে রাজধানীতে বড় ধরনের সংকট না থাকলেও পাম্পে পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাননি অনেকে। পর্যাপ্ত তেলের অভাবে যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে হাতিরঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিন জেলায় অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার লিটার তেলের অবৈধ মজুদ শনাক্ত করেছে র্যাব।
জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে পরীক্ষামূলকভাবে ফুয়েল পাস অ্যাপ চালু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রাথমিকভাবে তেজগাঁও ট্রাস্ট ও আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে শুধু মোটরসাইকেল চালকদের জন্য এই পাইলটিং কার্যক্রম উন্মুক্ত করা হয়েছে। এই পরীক্ষা সফল হলে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সব ধরনের যানবাহনের জন্য অ্যাপটি বাধ্যতামূলক করা হবে। তবে বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।
গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন, ফুয়েল পাসের ওয়েবসাইটটি সঠিকভাবে কাজ করছে না। ফলে অনেকে নিবন্ধন করতে পারছেন না এবং একটি ফিলিং স্টেশনে এই ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে না। সমস্যা সমাধানে দ্রুত সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ চান ভুক্তভোগীরা।
শনিবার আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে ফুয়েল পাসের কার্যক্রম চালু থাকলেও বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে ওয়েবসাইটে সমস্যা থাকায় নিবন্ধন ছাড়াই তেল বিক্রি করতে দেখা গেছে। সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালকদের দুটি লাইন। এর মধ্যে একটি ফুয়েল পাসের। এই পাসের মাধ্যমে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলগুলোকে এক হাজার টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। তবে ফুয়েল পাস অ্যাপসে নিবন্ধন করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয় অধিকাংশ গ্রাহককে।
আসাদগেট হর্টিকালচার সেন্টারের সামনে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী অনিক আর খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, রাত থেকে রেজিস্ট্রেশন বন্ধ দেখাচ্ছে। আজকে এখনও বন্ধ আছে রেজিস্ট্রেশন। এ সময় পাশে থাকা মো. মনিরুজ্জামান মনির বলেন, সরকার বলল অ্যাপসে আসলে তেল বেশি দেবে। এখন তো আমরা অ্যাপসে রেজিস্ট্রেশনই করতে পারছি না।
ফুয়েল পাস অ্যাপসের সফটওয়্যার সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ওয়েবসাইট রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে। পাশাপাশি বিআরটিএতে তথ্য আপলোডে সাময়িক সমস্যা থাকায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে এটি শিগগিরই সমাধান হয়ে যাবে বলে জানান তারা।
সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে উপস্থিত সফটওয়্যার প্রতিনিধি মো. ইউসূফ বলেন, ওয়েবসাইটটি বর্তমানে আন্ডার মেইনটেন্যান্সে আছে। সিকিউরিটি ও তথ্য আপডেটের জন্য এ কাজ চলছে। আমাদের সফটওয়্যারের পক্ষ থেকে সবকিছু সম্পন্ন হয়েছে। তবে বিআরটিএতে ডাটা আপলোডে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। কিছু তথ্য সঠিকভাবে আপলোড হচ্ছে না।
শনিবার তো বিআরটিএর ছুটির দিন তাই এমনটি হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন সবাইকে ফুয়েল পাস নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি, যাতে ফুয়েল পাসের ডিমান্ড স্বাভাবিক থাকে।
আরেক সফটওয়্যার প্রতিনিধি মো. সাফায়েত বলেন, অতিরিক্ত ডাউনলোডের কারণে সার্ভার ব্যস্ত রয়েছে। এ ছাড়া অন্য কোনো সমস্যা নেই।
পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, তেল থাকলে সরবরাহে তাদের সমস্যা নেই।
সোনার বাংলা পাম্পের ক্যাশিয়ার সোহরাব বলেন, আমরা সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত পাম্প খোলা রাখছি। যতক্ষণ তেল আছে আমাদের দিতে তো সমস্যা নেই।
বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা যায়, ওয়েবসাইটে নিবন্ধন কার্যক্রম ঠিকমতো কাজ না করায় নিবন্ধন ছাড়াই তেল বিক্রি করা হচ্ছে। স্টেশনের সামনে কথা হয় তেলের জন্য লাইনে দাঁড়ানো রাজীব নোমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ফুয়েল পাস এখনও নিইনি। এটা কোথা থেকে দিচ্ছে সেটাও এখন পর্যন্ত জানি না।
রাজধানীতে জ্বালানি তেলের বড় ধরনের সংকট না থাকলেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও চরম ভোগান্তি দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল নেওয়ার প্রবণতা, সরবরাহে সাময়িক চাপ এবং গুজব এই তিন কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি অভিযান চালাচ্ছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা।
শনিবার সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন তেল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, কিছু বন্ধ থাকলেও বেশিরভাগ পাম্পে তেল রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত তেল না থাকায় মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ৪ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন গ্রাহকরা।
তেলের জন্য অপেক্ষায় থাকা গ্রাহকদের অভিযোগ, অবৈধভাবে মজুদের কারণেই এই সংকট। অপেক্ষমাণ গ্রাহকরা সরকারকে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, ডিপো থেকে নিয়মিত সরবরাহ এলেও চাহিদা পূরণে তা অপর্যাপ্ত। তারা জানান, প্রতিদিন ডিপো থেকে একই পরিমাণের তেল পাচ্ছেন তারা। তবে গ্রাহকদের চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে, যার ফলে তেলের এই সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।
রমনা পেট্রোল পাম্পের সামনে কথা হয় আতিকুজ্জামান পরশের সঙ্গে। তিনি বলেন, সকাল ৭টা বাজে সিরিয়ালে দাঁড়িয়েছি প্রেস ক্লাবের মাথা থেকে। এখন মাথা ঘোরাচ্ছে।
পাশে থাকা নিজামুদ্দীন বলেন, সরকার বলে তেল আছে, পাম্পে গেলে তেল পাই না। এই কষ্ট, ভোগান্তি আর কতদিন?
প্রাইভেট কারে জ্বালানি নিতে আসা চাঁন মিয়া বলেন, কত সময় লাগবে জানি না। তেল পাব কি না তাও অনিশ্চিত। ফেরেশতারাও এ দেশ চালাতে পারবে না। তারা ফেল হয়ে যাবে। আমরা অনেক অসৎ হয়ে গেছি।
আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনে শনিবার সকাল থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বন্ধ থাকে। পদ্মা অয়েল ডিপো থেকে তেল সরবরাহ না আসায় স্টেশনটিতে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়। তবে সরবরাহ বন্ধ থাকার পরও সেখানে মোটরসাইকেল ও চার চাকার গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে শুরু করে বড় যানবাহনগুলো জ্বালানি তেলের জন্য অপেক্ষা করছে।
তেলের জন্য লাইনে অপেক্ষা করা শেখ সাহাবুদ্দিন বলেন, কখন তেল পাব বলতে পারছি না। ইতিমধ্যে চার ঘণ্টা চলে গেছে। আরও কয় ঘণ্টা যে লাইনে থাকতে হয় আল্লাহই ভালো জানে।
পাশের সোনার বাংলা স্টেশনে তেল নিতে লাইনে দাঁড়ানো আকরাম হোসেন বলেন, আমরা এখানে এসেছি ভোর ৫টার দিকে। এখনও তেল পাইনি। কখন তেল পাব এটা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।
তেজগাঁওয়ের সাউদার্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা যায়, দূরপাল্লার গণপরিবহন ও ঢাকা শহরের লোকাল বাসগুলো ডিজেল সংগ্রহ করছে। পাম্পটিতে দূরপাল্লার বাসগুলোকে সর্বোচ্চ ৪০ লিটার ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। লোকাল বাসগুলোতে তার চেয়েও কম পরিমাণে ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া অকটেনের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলে ৫০০ টাকা এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল দেওয়া হচ্ছে।
সাউদার্ন ফিলিংয়ের এক বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, গত মাস থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে যে জ্বালানি সংকট চলছে তা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
মতিঝিল আরামবাগের মেসার্স এইচ কে ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা যায়, তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন। এ সময় লাইনে আগে-পরে দাঁড়ানো নিয়ে তর্কবিতর্ক করতে দেখা যায় গ্রাহকদের।
লাইনে দাঁড়ানো মোটরসাইকেল চালক আরাফাত মাহমুদ বলেন, নীতিনির্ধারকরা কিছু করছেনও না, আবার বুঝতেও পারছেন না। আমাদের ভোগান্তি ঘুরেফিরে আমাদেরই।
তবে পাম্প কর্তৃপক্ষের দাবি, পর্যাপ্ত তেল পাওয়ায় সরবরাহ সংকটের শঙ্কা নেই। কিন্তু গ্রাহকের চাপ অনেক বেশি।
এইচ কে ফিলিং স্টেশনের একজন বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, অন্য সময় যে পরিমাণ তেল আসত এখনও সেই পরিমাণ তেলই আসে। কিন্তু গ্রাহকের সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না। এখন গ্রাহকদের চাহিদাটা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
অন্যদিকে তেলের সংকটে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে হাতিরঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিসে। ইতিমধ্যে অর্ধেকের বেশি ট্রিপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময় সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস সূত্র জানায়, গত ঈদুল ফিতরের পর থেকেই তেলের সংকট তীব্র হতে শুরু করে। এর ফলে ধাপে ধাপে ট্রিপ কমাতে বাধ্য হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আগে যেখানে ৫ থেকে ৭ জন যাত্রী হলেই একটি ট্যাক্সি ছেড়ে দেওয়া হতো, এখন সেখানে ১৫ থেকে ২৫ জন যাত্রী না হলে ইঞ্জিন চালু করা হচ্ছে না। এতে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় ঘাটে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
ওয়াটার ট্যাক্সি সূত্র আরও জানায়, প্রতিটি ট্যাক্সির জন্য দিনে ৩০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হলেও বর্তমানে দেওয়া হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ লিটার। এতে দিনে মাত্র চার ঘণ্টা সেবা চালানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে দুপুরের সময় অধিকাংশ ট্যাক্সি বন্ধ রাখা হচ্ছে।
এফডিসি ঘাটের টিকেট চেকার সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, কোম্পানি থেকে চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ১৫টির মধ্যে চারটি ট্যাক্সি এখন বিকল হয়ে পড়ে আছে। বাকিগুলো শুধু ভিড়ের সময় চালানো হচ্ছে।
ওয়াটার ট্যাক্সি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান করিম গ্রুপের অপারেশন্স ম্যানেজার মোরশেদুল আলম গণমাধ্যমে বলেন, আগে আমরা কখনো এমন সংকটে পড়িনি। তেলের অভাবে আমরা এখন অর্ধেক ট্রিপ চালাতে পারছি। আয়ও কমে গেছে অর্ধেক। ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সার্ভিসটি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।
জ্বালানি ও ভোজ্য তেলের কৃত্রিম সংকট রোধে দেশের তিন জেলায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫০ হাজার লিটার তেলের অস্বাভাবিক মজুদ শনাক্ত করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। একই সঙ্গে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৩ লাখ ৬১ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
গত শুক্রবার চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় ৮টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব অভিযান চালানো হয় বলে শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে র্যাব।
বিজ্ঞপ্তিতে র্যাব বলেছে, চট্টগ্রামের ছয়টি স্থানে এবং সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা ও ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানায় অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে হাটহাজারী, কর্ণফুলীর মইজ্জারটেক বাজার, নগরের সদরঘাট ও মেডিকেল রোড এলাকা এবং কয়েকটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট ও ব্যক্তিগত গুদাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এ সময় অবৈধভাবে মজুদ রাখা ৪৫ হাজার ৫৪৯ লিটার অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল ও ভোজ্য তেল উদ্ধার করা হয়। অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তেল উৎপাদন এবং অবৈধ মজুদের অভিযোগে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ ১ হাজার ৫০০ লিটার তেল জব্দ করা হয় বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।