স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সেখানেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে সিটি করপোরেশন নাকি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কোনটি আগে করা হবে। এমনটিই জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ। তবে কবে নাগাদ বসবে এ বিষয়ে কিছু স্পষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি।
গতকাল সময়ের আলোকে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করা হবে। সব নির্বাচন এক বছরেও শেষ করতে পারব কি না সন্দেহ আছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ধাপে ধাপে হয় সে ক্ষেত্রে সময়ের ব্যাপার আছে। উপজেলা নির্বাচন সময়ের ব্যাপার। অনেক পৌরসভা খালি হয়ে বসে আছে। সবই ধাপে ধাপে করা হবে। তবে এখানে আবহাওয়ার একটা বিষয় আছে, কারণ ওই সময়ে বৈরী আবহাওয়া থাকবে।
এ মাসের মধ্যে কোনো তফসিল হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন ‘না’ কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে একশ পারসেন্ট নিশ্চিত যে নির্বাচন হবে। কোন অংশের নির্বাচন আগে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব নির্বাচন পেন্ডিং। সবই করতে হবে কিন্তু সব তো আর একসঙ্গে করতে পারব না। সব করতে দশ মাস থেকে এক বছর সময় লাগবে। এখন আমরা স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করব যেখানে প্রয়োজন সেখানে আগে করব। নির্দিষ্ট কোনো রোটেশন নেই। কোন অংশ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিগত ১৯ মাস ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়াই চলছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে নাগরিকসেবা। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
তবে স্থানীয় সরকারের কোন অংশের নির্বাচন আগে আয়োজন করা হবে এ বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি ইসি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জানতে চাইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, এখন এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। সরকারের সঙ্গে বসে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আইন-কানুন ও অধ্যাদেশের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং আরেক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সব কাউন্সিলরকে অপসারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর আদালতের রায়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন বিএনপি নেতা ডা. শাহাদত হোসেন।
আর বাকি ১১টি সিটি করপোরেশনে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিল বিগত সরকার। এরপর ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। অনেক ইউনিয়ন পরিষদও হয়ে পড়েছে জনপ্রতিনিধিহীন। ফলে প্রায় ১৯ মাস ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়া চলছে প্রায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। ঈদের আগে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বর্তমান সরকার। যদিও একে নির্বাচনের পূর্বপ্রস্তুতি ও প্রশাসন দখলের চেষ্টা হিসেবে দেখছে বিরোধী দলগুলো।
রোজার ঈদের আগে ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য চিঠি এসেছে। বিষয়টি কমিশনে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের পাঠানো পৃথক ওই দুই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২০ সালের ২ জুন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে অনুযায়ী গত বছরের ১ জুন এই সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। আর ২০২০ সালের ৩ জুন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ২ জুন। এ ছাড়া ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় সে হিসেবে এ সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২২ ফেব্রুয়ারি।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী, প্রথম সভার তারিখ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর একটি সিটি করপোরেশনের মেয়াদ গণনা করা হয়। মেয়াদ পূর্তির পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে আলোকে তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কাজ চলছে। নিঃসন্দেহে এ বছরেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
অন্যদিকে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় লোকদের প্রশাসক দিলেও নতুন করে আর প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
তিনি বলেন, বর্তমানে যেসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে এডিসি ও ইউএনওরা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, সেখানে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা হবে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই ভবিষ্যতে এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেবেন।
কোন উপায়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন : অন্যদিকে নির্বাচন দলীয় নাকি নির্দলীয়ভাবে হবে সে সিদ্ধান্তের জন্য সংসদের দিকে তাকিয়ে আছে নির্বাচন কমিশন। কারণ সদ্যবিলুপ্ত অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় নির্বাচন পূর্বের মতো নির্দলীয়ভাবে সম্পন্ন করার অধ্যাদেশ করেছে। তবে সেটি সংসদ অধিবেশনে পাস হতে হবে। এরপর কমিশন আবার বিধিমালা তৈরি করবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে ইসি আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আমার জানা মতে অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে মেয়র প্রার্থী পদে দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা মূলত সংসদের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছি।