যতই দিন যাচ্ছে, ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে হামের প্রাদুর্ভাব। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা। রোগীর চাপে হাসপাতালগুলো চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে গত কয়েক দিনে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা।
হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে নির্ধারিত সব শয্যাই পূর্ণ। ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুর বয়স এক বছরের কম। এসব শিশুর কারও কারও সারা শরীরে ছোপ ছোপ দাগ ও ফুসকুড়ি দেখা যাচ্ছে। কারও শরীরে স্যালাইন চলছে, কারও নাকে নল, আবার কারও মুখে অক্সিজেন লাগানো। এমনকি অনেক শিশুর মাথার আংশিক চুল কেটে ক্যানুলা বসাতে হয়েছে। প্রচণ্ড জ্বর ও ব্যথায় শিশুরা অনবরত কেঁদে যাচ্ছে।
পাশে বসে থাকা মা-বাবা, স্বজনদের চোখ টলমল করছে। কখনো সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কখনো ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিচ্ছেন, কখনো ওষুধ খাওয়াচ্ছেন। মাঝে মধ্যে নার্সদের ডেকে সন্তানের সমস্যার কথা জানাচ্ছেন। সন্তানের যন্ত্রণাকাতর মুখ দেখে নীরবে লড়াই করছেন অভিভাবকরা। এ ছাড়া অনেকেই শয্যা ফাঁকা না পেয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরে যাচ্ছেন।
শনিবার সরেজমিন হাসপাতালে এসব দৃশ্য দেখা গেছে। শিশু হাসপাতালের তথ্যমতে, বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে ৪৪টি। একই ওয়ার্ডে ১৬ শয্যার একটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) রয়েছে। অর্থাৎ মোট ৬০টি শয্যা হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত। বর্তমানে সেখানে ৭৫ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সন্দেহজনক হামে এই হাসপাতালে মোট ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২৫৫ শিশু।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সুস্থ হওয়ার তুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীরা আসছেন। কিন্তু বিশেষায়িত ওয়ার্ড ও আইসিইউ উভয় ক্ষেত্রেই শয্যা সীমিত। ফলে হামের প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগের চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, যেসব শিশুর শুধু হামের উপসর্গ আছে এবং শ্বাসকষ্ট বা জটিলতা নেই, তাদের ভর্তি করা হচ্ছে না। প্রাথমিক চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বাড়িতে চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, নিউমোনিয়া, ডেঙ্গু, পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি, অনকোলজি, চক্ষু, সার্জারি ওয়ার্ড, ক্যাথ ল্যাব, আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, টিকেট কাউন্টার, ব্যাংক বুথ এবং বহির্বিভাগ সব জায়গাতেই রোগীর উপচেপড়া ভিড়। বিভিন্ন ওয়ার্ডে বেড না পেয়ে অনেক রোগী মেঝে, করিডর, বারান্দা ও সিঁড়িতে বসে বা শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে অনেকেই অভিযোগ করেছেন।
বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে কথা হয় লক্ষ্মীপুর সদরের বাসিন্দা মো. তারেকের সঙ্গে। তার তিন মাস বয়সি শিশু তাজিন পাঁচ দিন ধরে এখানে ভর্তি। তিনি বলেন, ‘১০-১২ দিন আগে বাচ্চার সর্দি, জ্বর ও কাশি শুরু হয়। পরে শরীরে র্যাশ উঠলে নোয়াখালী সদর হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে উন্নতি না হওয়ায় এখানে রেফার করা হয়। কিন্তু এখনও তেমন উন্নতি নেই। বাচ্চা কিছু খায় না, শুধু কাঁদে। এই অবস্থা সহ্য করা কঠিন।’
একই ওয়ার্ডে আরেক শিশুর মা রুমা আক্তার সন্তানের দিকে নির্বাক তাকিয়ে ছিলেন। তার ছয় মাস বয়সি সন্তান আব্দুর রহমানের হাতে ক্যানুলা, সারা শরীরে ফুসকুড়ি। তিনি সন্তানের শরীর ভেজা কাপড় দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছিলেন।
রুমা আক্তার বলেন, ‘প্রথমে ডাক্তাররা বলেছিলেন অ্যালার্জি। পরে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ১০ দিন চিকিৎসার পর ঢাকায় আসি। টানা কয়েক দিন ধরে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরছি। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। সন্তানের এই অবস্থা ভাষায় বোঝানো যায় না।’
শিশু সংক্রামক রোগ ও কমিউনিটি শিশুস্বাস্থ্য ইউনিটের ইনচার্জ অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘অন্য বছরের তুলনায় এবার হামের সংক্রমণ বেশি। জরুরি ভিত্তিতে একটি ইউনিট চালু করেছি, তবে চাহিদা অনুযায়ী আইসিইউ ও পিআইসিইউ দিতে পারছি না।’
তিনি আরও বলেন, টিকা না নেওয়া এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ছে। বিশেষ করে ছয় মাস থেকে তিন বছর বয়সি শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম ডোজ নেওয়া হলেও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া হয়নি। ফলে পুষ্টিহীনতাসহ নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। তিনি শিশুদের নিয়মিত টিকাদান ও পুষ্টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল হক বলেন, ‘প্রতিদিন অনেক রোগী আসছে, কিন্তু সবাইকে ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। যাদের জটিলতা বেশি, শুধু তাদেরই ভর্তি করা হচ্ছে।’
তিনি জানান, হামে আক্রান্ত হলে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তাই ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল, তরল খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৮৮ জন এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৮০ জন। একই সময়ে সন্দেহজনক হামে একজন এবং নিশ্চিত হামে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, ১৫ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে ১৪ হাজার ৩৮৫ জনের মধ্যে। এ সময় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯ হাজার ৪৬৩ জন। নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৮৯ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭ হাজার ২২ জন।
এ সময়ের মধ্যে নিশ্চিত হামে ২৪ জন এবং সন্দেহজনক হামে ১৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলেও জানানো হয়।
অন্যদিকে দেশে হামের উদ্বেগজনক প্রাদুর্ভাবের মধ্যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়েছে। আজ রোববার থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। আগামী ২০ এপ্রিল থেকে তা সারা দেশে চালু হবে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, এই চার মহানগরে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি ১২ লাখ ১৯ হাজার ৯৫৭ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানায়, ৫ এপ্রিল থেকে দেশে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় এমআর টিকাদান কার্যক্রম চালু হয়েছে। সংক্রমণ বেশি এমন এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এই কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সি সব শিশু এমআর টিকা পাবে। আগে টিকা নেওয়া থাকলেও পুনরায় টিকা দেওয়া যাবে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারিত কেন্দ্রে টিকাদান কার্যক্রম চলবে।