কাউন্সিলর না থাকায় নাগরিক সেবায় ধীরগতি

সমীরণ রায়

জাতীয়

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জনপ্রতিনিধি বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকায় ঝিমিয়ে পড়েছে ওয়ার্ডভিত্তিক

2026-04-12T01:21:40+00:00
2026-04-12T09:43:53+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
কাউন্সিলর না থাকায় নাগরিক সেবায় ধীরগতি
সমীরণ রায়
প্রকাশ: রোববার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬, ১:২১ এএম  আপডেট: ১২.০৪.২০২৬ ৯:৪৩ এএম
সংগৃহীত ছবি
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জনপ্রতিনিধি বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকায় ঝিমিয়ে পড়েছে ওয়ার্ডভিত্তিক নাগরিক সেবা। রাজধানীবাসী সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে সরকার গঠন করার পর দুই সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলেও ১২৬টি ওয়ার্ডে প্রত্যাশিত নাগরিক সেবা মিলছে না। মাঠপর্যায়ে জনপ্রতিনিধি না থাকা ওয়ার্ডগুলো ঝিমিয়ে পড়েছে। প্রশাসনিক কার্যক্রমে চলছে ধীরগতি। 

ফলে জনস্বাস্থ্য, জন্ম-মৃত্যু ও বিয়ে নিবন্ধন, সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যশিক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিয়ন্ত্রণ, খাল ও ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণ, পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশনব্যবস্থা, রাস্তা সংস্কারসহ বিভিন্ন মৌলিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে নাগরিক সেবা ব্যাহত হওয়ার পেছনে মূল কারণ কী? জন্ম-মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ ও চারিত্রিক সনদ পেতে ভোগান্তি বাড়ছে। মশা নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা-ঘাট পরিষ্কার রাখা, অলিগলি ও ফ্লাইওভার থেকে আবর্জনা অপসারণ এসব কাজের দায়িত্ব যেন কার্যকরভাবে কেউ নিচ্ছে না।

গত ৫ আগস্টের পর থেকে কাউন্সিলর অফিসগুলো কার্যত বন্ধ। অফিসগুলোয় গিয়ে ফিরে আসছেন সেবাপ্রার্থীরা। বর্জ্য অপসারণ, রাস্তা সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা সব ক্ষেত্রেই কাজের গতি মন্থর। এমনকি সাধারণ অভিযোগ নিষ্পত্তির সেবাও পিছিয়ে আছে। এতে নগরবাসীর মধ্যে হতাশা বাড়ছে। অধিকাংশ ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিসে ধুলো জমেছে আসবাবপত্রে; কোথাও কোথাও শুধু সাইনবোর্ডই রয়েছে। যদিও কিছু এলাকায় সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক অফিস থেকে সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়া হচ্ছে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রমও কার্যকরভাবে এগোচ্ছে না। প্রশাসনিক জটিলতায় উচ্ছেদে বাধা তৈরি হচ্ছে। ফগিং কার্যক্রম কোথায় হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে না তা তদারকিরও অভাব রয়েছে। একই অবস্থা এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে সকালের লার্ভিসাইডিং কার্যক্রমেও। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই ডিএনসিসি ও ডিএসসিসিতে প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। 

ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম কারাগারে যান এবং ডিএসসিসির মেয়র এর আগেই সিঙ্গাপুরে চলে যান। কাউন্সিলরদের অনেকে পলাতক থাকায় নাগরিক সেবা আরও ব্যাহত হতে থাকে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই সিটিতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি বরং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এসব অভিযোগ তদন্ত করছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে এক বছরের চুক্তিতে পরিবেশকর্মী ও জুলাই যোদ্ধা মোহাম্মদ এজাজকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিছু দিনের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে তিনি দুদকে হাজিরা দিচ্ছেন এবং তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসিতে মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং ডিএসসিসিতে মো. আব্দুস সালামকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। কিন্তু ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকায় তাদের পক্ষে সরাসরি নাগরিকদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সিটি করপোরেশনের আওতায় নগরবাসী অন্তত ১২ ধরনের নাগরিক সেবা পেয়ে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছেÑ জনস্বাস্থ্য, জন্ম-মৃত্যু ও বিয়ে নিবন্ধন, সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদন পরিচালনা, হাসপাতাল ও ডিসপেনসারি সেবা, স্বাস্থ্যশিক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিয়ন্ত্রণ, খাল-ড্রেন উন্নয়ন, পানি সরবরাহ, পানি নিষ্কাশন, সড়কবাতি স্থাপন, রাস্তা সংস্কার এবং ভোটার তালিকাভুক্তি।

প্রশাসক বা মেয়র সরাসরি এসব সেবা দেন না; কাউন্সিলররাই নাগরিক সেবার প্রথম স্তর। কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের, যারা ‘আনিক’ নামে পরিচিত। কিন্তু ঢাকার দুই সিটিতে মোট আনিকের পদ মাত্র ২০টি। ফলে দায়িত্বের তুলনায় জনবল কম হওয়ায় সেবা কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে পরিচিত না থাকায় প্রয়োজনীয় সনদও সময়মতো দেওয়া যাচ্ছে না।

ফ্লাইওভারগুলোতে নিয়মিত ঝাড়ু দেওয়া হচ্ছে না। অলিগলিতে পড়ে থাকছে আবর্জনা। কোথাও কোথাও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর উপস্থিতিও কম দেখা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কাঠামোর অনুমোদিত বহু পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৩ হাজার ১৬৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে হাজারের বেশি পদ খালি। সচিব, সহকারী সচিব, মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার, নিরীক্ষা কর্মকর্তা, রাজস্ব কর্মকর্তা ও সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদও শূন্য রয়েছে।

ফলে একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দফতরের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রশাসনিক শূন্যতা আরও প্রকট হয়েছে। এতে মশা নিধন কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সামনের বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে বিএনপি সরকার গঠনের পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তিনি সাংবাদিকদেরও জানিয়েছিলেন, ঈদুল ফিতরের পর সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজন করা হবে। তবে এখনো নির্বাচন আয়োজনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান ও ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, নাগরিক আস্থা অর্জনই তাদের প্রধান লক্ষ্য। পরিচ্ছন্ন নগর, মশক নিয়ন্ত্রণ এবং বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে নাগরিকদের অংশগ্রহণও জরুরি বলে তারা মনে করেন।

একাধিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী জানান, সিটি করপোরেশন থেকে যে নির্দেশনা আসে, সে অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু কাউন্সিলর না থাকায় মাঠপর্যায়ের অনেক সমস্যা জানানোর জায়গা নেই।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সিকেন্দার বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে নগরবাসী নানা সমস্যায় পড়েছে। প্রশাসক থাকলেও কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। মশার উপদ্রব বেড়েছে, রাস্তাঘাট সংস্কার হচ্ছে না, জন্ম-মৃত্যু সনদ পেতেও দীর্ঘ সময় লাগছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মিরাজ রহমান বলেন, একজন কাউন্সিলর স্থানীয় মানুষের সমস্যা ভালো বোঝেন। আমলারা সেই বাস্তবতা অনুভব করতে পারেন না। তাই যতদিন কাউন্সিলর না আসবে, ততদিন নাগরিক ভোগান্তি কমবে না।

দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চলছে। কাউন্সিলর অফিসে সচিব বা অন্য কর্মকর্তারা বসছেন। তবে কাউন্সিলর থাকলে কাজের তদারকি আরও কার্যকর হতো।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, জনপ্রতিনিধি না থাকায় কিছু সমস্যা হচ্ছে। কারণ তারা এলাকাবাসীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন। তবু প্রশাসন চেষ্টা করছে যেন কেউ সেবা থেকে বঞ্চিত না হন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রশাসকের নির্দেশনায় কাজ করছেন। তবে কাউন্সিলর না থাকায় কিছু ক্ষেত্রে নাগরিক সেবা ব্যাহত হওয়া স্বাভাবিক।


  বিষয়:   ডিএনসিসি  ঢাকা  করপোরেশন  ডিএসসিসি 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: