বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অর্থ পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ। ‘অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্স-২০২৫’ অনুযায়ী, ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছয় ধাপ এগিয়ে এখন ৮৩তম স্থানে। এ সূচকে উন্নতি মানে ইতিবাচক পরিবর্তন নয়, বরং এটি দেশে সংঘবদ্ধ অপরাধের বিস্তারকে নির্দেশ করে।
এছাড়া দেশে মানব পাচার ও চোরাচালানের বাজারও প্রসারিত হয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোয় এসব অপরাধ বেশি হলেও এর প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। ফলে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা— উভয় ক্ষেত্রেই তৈরি হচ্ছে চাপ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থ পাচার দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমিয়ে দেয়, বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল করে এবং আর্থিক খাতে তৈরি করে অস্থিরতা। অন্যদিকে হুন্ডি ব্যবস্থার বিস্তার বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রে সংঘবদ্ধ অপরাধের মাত্রা এবং তা মোকাবেলায় রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতা পরিমাপের অন্যতম আন্তর্জাতিক সূচক হলো ‘গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্স’। এ সূচকে অপরাধের বিস্তার এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা বিশ্লেষণ করে ১ থেকে ১০ স্কেলে প্রতিটি দেশের স্কোর নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ প্রকাশিত অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্স-২০২৫ অনুযায়ী, অপরাধের ব্যাপ্তিতে ৫ দশমিক ৩০ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মধ্যে ৮৩তম অবস্থানে রয়েছে। এ তালিকায় ৮ দশমিক শূন্য ৮ স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে মিয়ানমার। এরপর রয়েছে যথাক্রমে কলম্বিয়া, মেক্সিকো, একুয়েডর ও প্যারাগুয়ের মতো দেশ।
এশিয়ার ৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২৪তম। এর আগে ২০২৩ সালে প্রকাশিত একই সূচকে ৫ দশমিক ১২ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮৯তম। সে তুলনায় এবার ছয় ধাপ এগিয়েছে, যা দেশে সংঘবদ্ধ অপরাধ বিস্তারের ইঙ্গিত বহন করে।
বৈশ্বিক এ সূচক অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। বিশেষ করে আর্থিক অপরাধ, অবৈধ পথে মানব পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও নকল পণ্যের বিস্তার— সবগুলো ক্ষেত্রেই স্কোর বেড়েছে দশমিক ৫০। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মানব পাচারে। জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে পাচারের শিকার হচ্ছে অনেক নারী ও কন্যাশিশু। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া বা সাজানো বিয়ের মাধ্যমেও তাদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে এ অপরাধে জড়াতে বাধ্য করা হয়। ঋণের ফাঁদে ফেলে জোরপূর্বক শ্রম আদায় এবং শারীরিক ও মানসিক বলপ্রয়োগের ঘটনাও বেড়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোয়।
দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী— বিশেষ করে সংখ্যালঘু এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এ মানব পাচারের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে চাকরির প্রলোভন ও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্যে মানব পাচারের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অর্থ পাচার এখন শুধু সীমান্ত এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশত্যাগকারী কিছু ব্যক্তি হুন্ডি ও পাচারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ প্রবণতা দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রেও উত্থান দেখা যাচ্ছে সূচকে, যার বেশির ভাগই সংঘটিত হচ্ছে বেসরকারি খাতে। একই সময়ে দেশের সীমান্ত এলাকায় নিয়মিতভাবে অস্ত্র চোরাচালান চলছে, যা নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য বড় হুমকি। এছাড়া নকল পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাত অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে এসব অপরাধের বিস্তার দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে সংঘবদ্ধ অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে এবং ক্রমেই তা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিভিন্ন দেশের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে অপরাধ সূচক বেড়েছে। বিশেষ করে যে সব অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেগুলো বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে গুরুতর ও সংগঠিত। এ ধরনের অপরাধ সাধারণত শক্তিশালী চক্রের মাধ্যমে সংঘটিত হয়, যারা বড় ধরনের অপরাধ ঘটানোর জন্য নিজেদের পক্ষে প্রয়োজনীয় অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম। সাম্প্রতিক সময়ে মানব পাচার, চোরাচালান এবং আর্থিক অপরাধ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষ করে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রগুলো শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা জরুরি।
সময়ের আলো/আআ