আ.লীগের তৃণমূলে হতাশা, ক্ষোভ আরও বাড়ছে

সমীরণ রায়

রাজনীতি

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একটি অংশের বিদেশে অবস্থান নেওয়া নিয়ে দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ,

2026-04-13T00:57:49+00:00
2026-04-13T00:57:49+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
রাজনীতি
কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা ও সাংগঠনিক স্থবিরতা
আ.লীগের তৃণমূলে হতাশা, ক্ষোভ আরও বাড়ছে
সমীরণ রায়
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৫৭ এএম 
আওয়ামী লীগ। ছবি : সংগৃহীত
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একটি অংশের বিদেশে অবস্থান নেওয়া নিয়ে দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক সংকটের কঠিন সময়ে তারা যখন মামলা, গ্রেফতার, আত্মগোপন ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, তখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়ায় সংগঠনের ভেতরে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।

তৃণমূলের একাংশের মতে, এ পরিস্থিতি শুধু সাংগঠনিক দুর্বলতাই তৈরি করেনি, বরং ভবিষ্যতে নেতৃত্ব কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, সংকটকালে মাঠে না থেকে বিদেশে অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত দলীয় ঐক্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ভাষ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামোতে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দেয়। শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ ত্যাগ করেন বলে তৃণমূলের অভিযোগ, আর যারা দেশে ছিলেন তাদের একটি বড় অংশ গ্রেফতার বা আত্মগোপনে চলে যান।

এই পরিস্থিতিতে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা নিজেদের ‘নেতৃত্বশূন্য ও দিকনির্দেশনাহীন’ অবস্থায় পড়েছেন বলে দাবি করছেন। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সরাসরি উপস্থিতি না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।

তৃণমূলের একাধিক নেতার বক্তব্য, এমন সংকটকালেও সংগঠনকে মাঠে ধরে রাখার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ছিল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে সেই সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়ে বলে তারা মনে করেন।

তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ, কঠিন সময়ে যারা মাঠে থেকে মামলা-হামলা ও গ্রেফতারের ঝুঁকি নিয়েছেন, তাদের পাশে শীর্ষ নেতৃত্বের দৃশ্যমান অবস্থান যথেষ্ট ছিল না। তাদের মতে, বিদেশে অবস্থান নেওয়া নেতাদের ভবিষ্যতে আবারও শীর্ষ নেতৃত্বে পুনর্বাসন করা হলে তা তৃণমূল সহজভাবে মেনে নেবে কি না এ প্রশ্ন এখন সংগঠনের ভেতরে ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে।

একাধিক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী ‘ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন’ না হলে ভবিষ্যতে সংগঠনের ভেতরে বিভাজন আরও গভীর হতে পারে।

দলীয় নেতাকর্মীরা দাবি করছেন, রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতার কারণে সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলছেন, মামলা, গ্রেফতার এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারছেন না।

একাংশের অভিযোগ, এ পরিস্থিতিতে সংগঠনকে কার্যকরভাবে পুনর্গঠনের জন্য যে ধরনের কেন্দ্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল, তা যথেষ্ট হয়নি। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি হয়েছে। তবে দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অনলাইন যোগাযোগ, ভার্চুয়াল বৈঠক এবং সাংগঠনিক নির্দেশনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তাও দেওয়া হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ১১ মে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে ওই অধ্যাদেশ জারি করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। সম্প্রতি এই অধ্যাদেশটি সংসদে বিল আকারে পাশ হয়েছে। এই আইন পাশ হওয়ায় এখন আরও পাকাপোক্তভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে দূরে থাকতে হতে পারে দলটিকে। এতে দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা হতাশ হলেও তাদের মূল ক্ষোভ দলটির শীর্ষ নেতাদের ওপর।

তৃণমূলের একাংশ মনে করছে, নেতৃত্বের একটি অংশ বিদেশে অবস্থান করলেও তারা দলীয় কার্যক্রম সমন্বয়ের চেষ্টা করছেন। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন- এমন মতও উঠে এসেছে। ঢাকা মহানগরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কিছু নেতাকর্মী বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সংগঠন পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে, তবে তা অত্যন্ত ধীরগতির এবং সমন্বয়হীন। তাদের মতে, ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দল আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু তার জন্য আগে অভ্যন্তরীণ আস্থা পুনর্গঠন জরুরি।

যুব ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতার অভিযোগ, কঠিন সময়ে মাঠে থাকা কর্মীদের ত্যাগ যথাযথভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে না। তাদের দাবি, যারা ঝুঁকি নিয়ে সংগঠন ধরে রেখেছেন, তাদের মতামত ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কাঠামোতে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

দলটির যুব সংগঠনের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কঠিন সময়ে যারা মাঠে ছিলেন, তারা এখন নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করছেন। এটি ভবিষ্যতে সংগঠনের ভেতরে নতুন বিভাজন তৈরি করতে পারে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ভার্চুয়াল বৈঠক ও অনলাইন নির্দেশনার মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

এ ছাড়া ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মাঠে ফেরার কৌশল নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। সংগঠন পুনর্গঠন, মাঠ পর্যায়ের নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা এবং স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে পুনরায় অংশগ্রহণের পরিকল্পনা নিয়েও কাজ চলছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।

তৃণমূলের একটি অংশ আবার মনে করছে, এই প্রক্রিয়া ধীরে হলেও সংগঠনকে পুনরায় সক্রিয় করতে ভূমিকা রাখতে পারে।

কিছু নেতাকর্মীর মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দল আবারও মাঠে ফেরার কৌশল নিতে পারে। ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি পর্যায়ের নির্বাচনকে ঘিরে সংগঠন পুনর্গঠনের আলোচনা চলছে বলে তারা দাবি করছেন।

তাদের ভাষ্য, ধাপে ধাপে মাঠের রাজনীতিতে ফিরে আসাই এখন দলের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে। তবে এ জন্য কেন্দ্র ও তৃণমূলের মধ্যে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি।

তৃণমূল পর্যায়ের একাধিক নেতাকর্মীর অভিমত, যারা বিদেশে অবস্থান করেছেন এবং সংকটকালে মাঠ থেকে দূরে ছিলেন, ভবিষ্যতে তাদের নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। একজন নেতা বলেন, ‘আমরা ঘরবাড়ি ছেড়ে, মামলা-হামলা সহ্য করে মাঠে ছিলাম। ভবিষ্যতে নেতৃত্বের প্রশ্নে এই ত্যাগ উপেক্ষা করা হলে তা মেনে নেওয়া কঠিন হবে।’ তাদের মতে, আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত হতে হলে আগে অভ্যন্তরীণ আস্থা, দায়িত্ববোধ এবং ত্যাগের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একদিকে যেমন সাংগঠনিক স্থবিরতা ও আইনি জটিলতা কাজ করছে, অন্যদিকে তৃণমূল ও শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্বও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

শীর্ষ নেতাদের বিদেশে অবস্থান, মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মামলা-গ্রেফতার ও আত্মগোপন- এসব মিলিয়ে সংগঠনের ভেতরে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত। তবে তৃণমূলের ক্ষোভ, হতাশা এবং প্রত্যাশা- দলটির ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন এখন নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, আস্থা পুনর্নির্মাণ এবং সাংগঠনিক সমন্বয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সময়ের আলো/কেএইচও 


  বিষয়:   আ.লীগ  তৃণমূল  হতাশা  ক্ষোভ  কার্যক্রম  নিষেধাজ্ঞা  সাংগঠনিক স্থবিরতা 


Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: