টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জোহরা সুলতানা যূথির বিরুদ্ধে নির্বাচনী বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, আপ্যায়ন, যাতায়াত ও জনবল নিয়োগের নামে বরাদ্দকৃত লাখ লাখ টাকা ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, দেলদুয়ার নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচনকালীন সময়ের তিন ধাপে অর্থ বরাদ্দ দেয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ১৬টি ভোট কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য পাঁচ লাখ ২৪ হাজার ৮০০ টাকা, সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও তার দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য এবং নির্বাচনী ফলাফল সংগ্রহ, কন্ট্রোল রুমসহ অন্যান্য কমিটির আপ্যায়ন বাবদ এক লাখ ৪০ হাজার, বিভিন্ন স্টেশনারি ক্রয় বাবদ এক লাখ ৬০ হাজার বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এছাড়া পিওএল, স্পিড বোট, জলযান, ট্রলার, ট্যাক্সি ও ভ্যান ভাড়া ব্যয় বাবদ দুই লাখ ৩৫ হাজার এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসে খণ্ডকালীন দুই মাসের জন্য একজন করণিকের সম্মানী ভাতা ৩৬ হাজার ও একজন পিয়নের সম্মানী ভাতা ২৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ উঠেছে, কমিশন নির্ধারিত এসব খাতে যথাযথ ব্যয় না করে ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে সম্পূর্ণ অর্থই কাগজে-কলমে ব্যয় দেখানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, নির্বাচনকালীন সময়ে ইউএনওর ব্যবহৃত গাড়ির জ্বালানি বাবদ নিয়মিত সরকারি মাসিক বরাদ্দের তেলও ব্যবহার দেখিয়েছেন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা যূথি।
‘এক বোতল পানিও জোটেনি’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানোর জন্য একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ (কন্ট্রোলরুম) স্থাপন করা হয়। সেখানে উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনকালীন সময়ে তাদের আপ্যায়ন বাবদ ইসির বরাদ্দ ছিল এক লাখ ৪০ হাজার টাকা।
তবে দায়িত্বপালকালে এক বোতল পানিও খেতে দেওয়া হয়নি জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, আপ্যায়নের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা পুরোটাই সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আত্মসাৎ করেছেন।
তাদের দাবি, টানা তিনদিন নির্বাচনী ডিউটি পালনকালে সবাইকে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে খেতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের জন্যও নিজেদের টাকা খরচ করতে হয়েছে।
জনবল নিয়োগে শুভঙ্করের ফাঁকি
নির্বাচনকালীন সময়ে দুই মাসের জন্য সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা যূথির কার্যালয়ে একজন খণ্ডকালীন করণিক এবং একজন পিয়ন নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। অভিযোগ উঠেছে, কাউকে নিয়োগ না দিয়েই বরাদ্দর ৬৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ হয়েছে।
যানবাহন ও জ্বালানি খাতে কারচুপি
গাড়িচালকদের সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনকালীন সময়ে পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পুলিশ দেখভাল করেছে এবং জ্বালানি তেল ইউএনও কার্যালয়ের টোকেনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছে।
তবে অভিযোগ উঠেছে, ইউএনও তার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নিয়মিত সরকারি মাসিক বরাদ্দের তেল ব্যবহার করলেও নির্বাচনী বিশেষ বরাদ্দ থেকেও জ্বালানি খরচ দেখিয়েছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে দেলদুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাচনকালীন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা যূথি বলেন, খণ্ডকালীন করণিক ও পিয়ন নিয়োগ দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে কোনো বরাদ্দ পাইনি। তাই নিয়োগ দেয়নি। আরও কিছু জানার থাকলে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে পারেন।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সঞ্জয় কুমার মোহন্ত জানান, এ ধরনের কোনো অনিয়মের অভিযোগ তিনি পাননি। তবে খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অনেকেই অবশিষ্ট টাকা চেকের মাধ্যমে ফেরত দিয়েছেন। দেলদুয়ারের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
এফআর