বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে শুধু একটি ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের দিন নয়- এটি একটি সর্বজনীন উৎসব, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। প্রতি বছর এদিন ঘিরে সারা দেশে নতুন পোশাক, বৈশাখী মেলা, মাটির তৈরি পণ্য, দেশীয় হস্তশিল্প, মিষ্টান্ন এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের বিপুল চাহিদা তৈরি হয়। ফলে এ সময়টি ব্যবসায়ীদের জন্য বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্বভাবতই পহেলা বৈশাখের উৎসব ঘিরে দেশের বাজারে চাঙা ভাব তৈরি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু গতবারের মতো এবারও তা দেখা যায়নি। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছিল অনিশ্চয়তা আর ক্রেতারাও ছিলেন টানাপড়েনে। এ ছাড়া রোজা ও ঈদের পরপরই হয়েছিল পহেলা বৈশাখ। এ কারণে গত বছর বৈশাখের বাজারে জমেনি। আশা ছিল এবার নির্বাচিত সরকার এসেছে ক্ষমতায়- ভালো বাণিজ্য হবে বৈশাখে।
এবার বৈশ্বিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সংকট এবং সীমিত সময়সূচির প্রভাবে বৈশাখী বাজার ছিল অনেকটাই স্থবির। শাড়ি-পাঞ্জাবি থেকে শুরু করে মিষ্টি, ফুল, মাটির পণ্য ও কারুশিল্প- সব ক্ষেত্রেই প্রত্যাশার তুলনায় বিক্রি কম হওয়ায় হতাশ ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং ঈদের পরপরই বৈশাখ হওয়ায় মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থের অভাব- এসব কারণেই ক্রেতাসংখ্যা কমেছে।
এবার পহেলা বৈশাখ কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা দেশের ব্যবসায়ীরা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। ফ্যাশন হাউস, শাড়ি-পাঞ্জাবির দোকান, মিষ্টির দোকান, ফুলের বাজার, মৃৎশিল্প বিক্রেতা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা পর্যন্ত সবাই নতুন ডিজাইন, নতুন কালেকশন এবং বৈশাখী থিমের পণ্য নিয়ে বাজারে হাজির হন। বিশেষ করে রাজধানীর নিউমার্কেট, গাউছিয়া, আজিজ সুপার মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, গুলশান, মিরপুর ও উত্তরা এলাকার শোরুমগুলোতে ছিল বিপুল আয়োজন। দোকান সাজানো হয়েছিল রঙিন বৈশাখী মোটিফ, লাল-সাদা থিম এবং দেশীয় সংস্কৃতির নানা উপাদান দিয়ে। কিন্তু এসব আয়োজনের পরেও ক্রেতার উপস্থিতি আশানুরূপ ছিল না।
অনেক দোকান মালিক জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে বিকালের পর যে ভিড় সাধারণত তৈরি হয়, এবার তা অনেকটাই অনুপস্থিত ছিল। ফলে বিক্রির গতি ছিল অত্যন্ত ধীর।
বাজার মন্দার পেছনের বহুমাত্রিক কারণ : ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বৈশাখী বাণিজ্যে মন্দার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে।
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি : মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের বাজারে, পরিবহনব্যয়ে এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ে।
জ্বালানি সংকট ও সময়সীমা : সরকারের পক্ষ থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশনা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটা সাধারণত সন্ধ্যার পরেই বেশি হয় কিন্তু এবার সেই সময়টিই সংকুচিত হয়ে যায়।
ঈদ-পরবর্তী আর্থিক চাপ : ঈদুল ফিতরের পরপরই পহেলা বৈশাখ হওয়ায় সাধারণ মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ ছিল সীমিত। ফলে অনেক পরিবার আলাদা করে বৈশাখের কেনাকাটায় অংশ নিতে পারেনি।
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি : নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে মানুষ অপ্রয়োজনীয় বা উৎসবকেন্দ্রিক খরচ কমিয়ে দিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব ক্ষতির চিত্র : ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এবারের বৈশাখ কেন্দ্র করে তারা আগেভাগেই বড় বিনিয়োগ করেছিলেন। নতুন ডিজাইন, অতিরিক্ত স্টক এবং বৈশাখী কালেকশন নিয়ে তারা আশাবাদী ছিলেন কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হয়েছে। অনেক শোরুমে দিনে প্রত্যাশিত বিক্রির অর্ধেকও হয়নি। কিছু দোকানে বিক্রি এতটাই কম ছিল যে, পুরো দিনে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার বিক্রিও হয়নি বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। ফলে অনেক ব্যবসায়ী এখন অবিক্রীত পণ্য নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় আছেন। বিশেষ করে শাড়ি-পাঞ্জাবি ও ফ্যাশন পণ্যের দোকানগুলোতে স্টক জমে গেছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের পর্যবেক্ষণ : বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ঈদ ও পহেলা বৈশাখ কাছাকাছি সময়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন খরচ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে। এমন অবস্থায় আলাদা করে দুই উৎসবের কেনাকাটা করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়নি। তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটও বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ : অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, পহেলা বৈশাখের বাণিজ্য সাধারণত তখনই ভালো হয় যখন মানুষের আয় বৃদ্ধি পায় এবং ব্যয়ের চাপ কম থাকে। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বৈশাখী অর্থনীতি একসময় দেশের ভোক্তা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এখনকার পরিস্থিতিতে সেই গতি আর আগের মতো নেই। তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি মানুষের ভোগব্যয় সীমিত করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যে।
রাজধানীর বাজারগুলোর চিত্র : রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজারে দেখা যায়, দোকানগুলো সাজানো থাকলেও ক্রেতার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম। আজিজ সুপার মার্কেট, নিউমার্কেট ও গাউছিয়ায় কিছুটা ভিড় থাকলেও অধিকাংশ দোকানেই ছিল নীরবতা। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, তারা বিপুল পরিমাণ বৈশাখী পোশাক এনেছিলেন কিন্তু তার বড় অংশই অবিক্রীত রয়ে গেছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর ক্রেতা কমে যাওয়ায় বিক্রি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পোশাকের দাম ও বাজারের অবস্থা : ব্যবসায়ীরা জানান, এবারের বাজারে পোশাকের দাম প্রায় স্থিতিশীল ছিল। তারা জানান, গতবার বা আগেরবার যেমন দাম ছিল, এবারও দাম তেমনই রাখা হয়েছে। দাম বাড়ানো হয়নি এবার। শাড়ি ২ হাজার ১৫০ থেকে শুরু হয়ে ২ হাজার ৬৫০ টাকা, বড়দের পাঞ্জাবি ১ হাজার ৫৫০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা, ছোটদের পাঞ্জাবি ৮০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা। ছোট মেয়েদের টপস ৬৮০ থেকে ১ হাজার ৮০ টাকা। সাইজ ভেদে দামে কিছুটা তারতম্য রয়েছে। দাম অপরিবর্তিত থাকা সত্ত্বেও ক্রেতা কম থাকায় বিক্রি প্রত্যাশিত হয়নি।
ফ্যাশন হাউসগুলোর অভিজ্ঞতা : দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড বিশ্বরঙ, সাদাকালোসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এবারের বৈশাখে বড় প্রস্তুতি নিয়েছিল। তারা মনে করেছিল ঈদের পর সময় থাকায় বিক্রি ভালো হবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। অনেক ব্র্যান্ডের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, দোকান খোলা রাখার সীমাবদ্ধতা এবং ক্রেতার অভাব- দুটিই তাদের বড় ক্ষতির কারণ হয়েছে।
মৃৎশিল্প, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অবস্থা : বৈশাখ মানেই মাটির পণ্য, মুখোশ, খেলনা, থালা-বাসন ও নানা হস্তশিল্পের চাহিদা বৃদ্ধি কিন্তু এবার এই খাতেও বিক্রি কমেছে। অনেক কারিগর জানিয়েছেন, তারা আগাম অর্ডারের আশায় ছিলেন কিন্তু বাস্তবে অর্ডার খুবই কম এসেছে।
খাদ্যপণ্য ও মিষ্টির বাজার : বৈশাখে মিষ্টি, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা, পান্তা-ইলিশসহ বিভিন্ন খাবারের বিশেষ চাহিদা থাকে। তবে এবার সেই চাহিদাও তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বিশেষ করে ইলিশের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের অংশগ্রহণ কমে যায়। বাজারে এক কেজি ইলিশ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রভাব : পহেলা বৈশাখের অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নয়- এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্রামীণ মেলা, হস্তশিল্প বিক্রি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয়ের বড় সুযোগ তৈরি হয় এই সময় কিন্তু এবার মেলার সংখ্যা কমে যাওয়া এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে এবারের পহেলা বৈশাখ ছিল ব্যবসায়ীদের জন্য এক ধরনের হতাশার অধ্যায়। যেখানে তারা বড় আশা ও প্রস্তুতি নিয়ে বাজারে নেমেছিলেন, সেখানে বৈশ্বিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট এবং সময়সীমার সীমাবদ্ধতা তাদের প্রত্যাশা ভেঙে দিয়েছে। তবে সাংস্কৃতিক দিক থেকে বৈশাখের ঐতিহ্য ও গুরুত্ব অটুট থাকলেও অর্থনৈতিক দিক থেকে এবারের বৈশাখী বাণিজ্য ছিল অনেকটাই নিষ্প্রাণ ও মন্দার প্রতিচ্ছবি।