ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা রোধে হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা ও বারবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরও থামছে না এর দৌরাত্ম্য। এতে করে নাজেহাল ও হয়রানির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
একটি প্রতারক চক্র অর্থের বিনিময়ে বিচারকের স্বাক্ষর, সিল ও স্মারক নম্বর জাল করে সেই ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা থানায় পাঠায়। সেই ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানায় আসামিদের হয়রানি কিংবা গ্রেফতার করে পুলিশ। তারপরও এই প্রতারক চক্রকে কোনোভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না।
অন্যদিক ভুয়া কাস্টডি ওয়ারেন্ট তৈরি করে আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে এনে দেওয়া হয় বিশেষ সুবিধা; এমনকি সুযোগ করে দেওয়া হয় পালিয়ে যাওয়ারও!
এবার এমনই এক ভুয়া ওয়ারেন্ট চক্রকে খুঁজে বের করতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের আদেশ দিয়েছেন ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ। গত ১ এপ্রিল তিনি এ আদেশ দেন। আদেশে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রমাণভিত্তিক প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কমিটিতে ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. আলমগীরকে চেয়ারম্যান, সদস্য হিসেবে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন ও ডিএমপির একজন সহকারী পুলিশ কমিশনারকে রাখা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী আনোয়ারুল ইসলাম গত ৩০ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিবেচনার জন্য আদালতে উপস্থাপন করেন। অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় আদালত মনে করেন, সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটিকে কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— জাল পরোয়ানা ও বিচারিক নথি প্রস্তুত ও ব্যবহারের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট আদালত কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ অন্যদের সম্পৃক্ততা শনাক্ত, হেফাজত থেকে আসামি হাজিরের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম খতিয়ে দেখা ও অবৈধ উপঢৌকন বা প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে বেআইনি সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক সুপারিশ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
জানা যায়, প্রতারক চক্রটি বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে আসামিদের নামে ভুয়া কাস্টডি ওয়ারেন্ট তৈরি করে। পরিকল্পিতভাবে নিজেদের সুবিধামতো তারিখ বসিয়ে ওই ভুয়া ওয়ারেন্ট কারাগারে পাঠায়। পরে কারাগারে থাকা চক্রের সহযোগীরা সেটিকে ওয়ারেন্ট তালিকায় এন্ট্রি করে। ফলে রেজিস্ট্রার অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু আদালত কক্ষে হাজির করার পরিবর্তে চক্রের সদস্যরা তাকে আদালত ভবনের অন্যত্র নিয়ে যায়। এরপর সুবিধামতো কোনো কক্ষ বা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আসামিকে নানা ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে প্রতারক চক্রটি বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে অভিনব কায়দায় আসামিদের নামে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরি করে। তারপর সেটি থানায় পাঠায়। আর এমন পরোয়ানামূলে গ্রেফতার হন সাধারণ মানুষ। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাসিন্দা ওয়াসিমের নামে হঠাৎ করেই একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা যায় স্থানীয় থানায়।
পরোয়ানায় উল্লেখ করা হয়, ঢাকার কলাবাগান থানায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় তিনি আসামি। বিষয়টি জানতে পেরে ওয়াসিম ঢাকায় এসে আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগে খোঁজ নেন তার বিরুদ্ধে এমন কোনো মামলা আছে কি না। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন যে, তার নামে জারি হওয়া পরোয়ানাটি সম্পূর্ণ ভুয়া।
অন্যদিকে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা বলে গ্রেফতার হয়ে ৩৫ দিন কারাবাস করেছেন বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের পোটকাখালী গ্রামের বাসিন্দা বাদল মিয়া (৫৭)।
বাদল মিয়ার এই ৫৭ বছর বয়সের জীবনে কখনো তিনি রাজধানী ঢাকায় আসেননি। কিন্তু সেই ঢাকারই এক শিশুকে ধর্ষণের মামলায় শিশু আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানার কারণে তাকে গ্রেফতার করে বরগুনা থানা পুলিশ। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যে গ্রেফতারি পরোয়ানা বলে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সেই গ্রেফতারি পরোয়াটি ছিল ভুয়া।
কোনোরকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা বলে গ্রেফতারের ফলে ৩৫ দিন কারাবাস করতে হয়েছে বাদল মিয়াকে।
জানা যায়, চক্রটি হুবহু আদালতের আসল পরোয়ানার আদলে জাল গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরি করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে কৌশলে পাঠিয়ে দেয়। ভুয়া ওয়ারেন্টগুলো পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সেগুলো দেখতে প্রায় অবিকল আসল পরোয়ানার মতো। পরোয়ানায় সংশ্লিষ্ট আদালতের ফরম্যাট, মামলার তথ্য এবং বিচারকের স্বাক্ষরও রয়েছে।
তা ছাড়া এত নিখুঁতভাবে আদালতের ফরম্যাট ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভুয়া পরোয়ানা তৈরি করা সাধারণ কারও পক্ষে সম্ভব নয়। যারা আদালতের নথিপত্র, পরোয়ানা ইস্যুর পদ্ধতি এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি জানেন, তারাই এমন জাল নথি তৈরি করতে পারেন।
এ চক্রের সঙ্গে আদালতের কিছু অসাধু পেশকার, উমেদার এবং পুলিশের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা জড়িত। তাদের যোগসাজশেই এসব জাল পরোয়ানা তৈরি এবং বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর ঘটনা ঘটছে।
এ বিষয়ে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট শাহীনুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানার মতো জঘন্যতম অপরাধটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এতে করে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হন প্রতিনিয়ত। খোদ আদালতপাড়ায় এর একটি শক্ত সিন্ডিকেট রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তারা এসব অপকর্ম করে থাকে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের উচিত এ ব্যাপারে শক্ত ও কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া। যাতে করে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা যায়। আর তা না হলে এই ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যুর মতো অপরাধ কখনো রোধ করা সম্ভব হবে না।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। এ ধরনের অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন দুঃসাহস দেখাতে না পারে।
তিনি বলেন, এতে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ, তাই জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিষয়টি গণমাধ্যমে তুলে ধরা জরুরি, যাতে অন্যরা সতর্ক হয় এবং এ ধরনের অপরাধ থেকে বিরত থাকে। এতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে এবং সাধারণ মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হবে না।
ঢাকার মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ইতিমধ্যে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যুতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যদি এমন কোনো ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায় তা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এফআর