নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের তালিকায় ৬ নম্বরে থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত রেখেছে নির্বাচন কমিশন। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারেনি দলটি। তবে সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে ভোটের বিধান বিলুপ্ত হওয়ায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, যেহেতু এবার নির্দলীয় প্রতীকে ভোট হবে, সে ক্ষেত্রে কে কোন দলের তা বিবেচনার সুযোগ নেই। প্রার্থী হওয়ার জন্য আইন অনুযায়ী যে যোগ্যতা থাকা দরকার, তা পূরণ করলেই যে কেউ ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে। সুতরাং ইসির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা থাকলেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বলতে কিছু বুঝি না। আমাদের প্রার্থী দরকার। যেহেতু দলীয় প্রতীক নেই, সুতরাং কে কোন দলের এটি বিষয় নয়। প্রার্থী হিন্দু হতে পারে, মুসলমান হতে পারে, ছেলে বা মেয়ে হতে পারে, অল্প বয়সি বা বৃদ্ধ হতে পারে। যে যার মতো দাঁড়াতে পারে। তবে প্রার্থী হওয়ার যে যোগ্যতা আছে, তা থাকতে হবে। আমরা শুধু দেখব প্রার্থী হিসেবে তার যোগ্যতা আছে কি না। তা হলেই প্রার্থী হতে পারবে।’
তিনি আরও বলেন, আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি পলাতক থাকলে কিংবা প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য হলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। অর্থাৎ আইনে যেগুলো বলা আছে, আমরা শুধু সেগুলোই দেখব। কবে নির্বাচন হবে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনও বলা যাচ্ছে না।’ যেহেতু আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নিষিদ্ধ কি না- এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।’
নির্বাচন বিশ্লেষক আবদুল আলীম সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমান আইন ও বিধি অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখার কোনো সুযোগ নেই। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী যে ব্যক্তি যোগ্য হবেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। আওয়ামী লীগের লাখ লাখ সমর্থক রয়েছে। তারা যোগ্য হলে কীভাবে তাদের আটকাবে? আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে আটকাতে হলে নতুন করে আইন করতে হবে। তবে তিনি বলেন, জটিলতা তৈরি হতে পারে যদি আওয়ামী লীগের পরিচিত কোনো মুখ নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। সে ক্ষেত্রে অন্যান্য দল বিষয়টি ভালোভাবে না-ও নিতে পারে, ফলে নির্বাচনি সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে- যা ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) বিল-২০২৬’ পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে (যেমন : পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ) দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার বিধান বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক (যেমন নৌকা, ধানের শীষ) ব্যবহারের বিধান চালু করা হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। ফলে এখন থেকে রাজনৈতিক দলগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে পারবে না। প্রার্থীরা স্বতন্ত্র ও নির্দলীয়ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা : সংশোধিত স্থানীয় সরকার আইনে (ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন) প্রার্থীর যোগ্যতার মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া, ন্যূনতম ২৫ বছর বয়স এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার তালিকাভুক্ত থাকা।
অযোগ্যতার মধ্যে রয়েছে- ঋণখেলাপি (কৃষিঋণ ব্যতীত), নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত, সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়ে নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত না হওয়া, সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকা, সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থাকা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৯ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং পরবর্তী প্রজ্ঞাপনে সব কাউন্সিলরকে অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরে ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদেরও অপসারণ করা হয়। ফলে অনেক ইউনিয়ন পরিষদও জনপ্রতিনিধিহীন হয়ে পড়ে।
এরপর আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করা হয়। ৩ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে স্থানীয় সরকারের সাবেক উপদেষ্টা প্রয়াত এ এফ হাসান আরিফ তাকে শপথবাক্য পাঠ করান, যার মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বাকি ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর রোজার ঈদের আগে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জটিলতা : ঈদের আগে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ অনুরোধ জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী তিন সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে বা শেষের পথে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী প্রথম সভার তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ গণনা করা হয় এবং মেয়াদ পূর্তির পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সে অনুযায়ী, তিন সিটি করপোরেশনসহ দেশের অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানও নির্বাচন উপযোগী হয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঈদুল ফিতরের আগে ইসি জানিয়েছিল, রোজার শেষ দিকে তিন সিটির তফসিল ঘোষণা এবং কুরবানির ঈদের আগে নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ঈদের পর কমিশনের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে তফসিল কবে হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, এমনকি কমিশনের ভেতরেও স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
এদিকে বিগত প্রায় ২০ মাস ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়াই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হচ্ছে। ফলে নাগরিক সেবা কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে স্থবির হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে।
সময়ের আলো/আআ