রাজধানীতে বিস্তৃত হচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের রাজত্ব

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

রাজধানীতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে কিশোর গ্যাং। অল্পবয়সি এসব কিশোরের নৃশংসতা থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানাচ্ছে। তাদের ভয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।

2026-04-20T01:32:54+00:00
2026-04-20T01:32:54+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
বছরে বাড়ছে ৬৫ শতাংশের বেশি
রাজধানীতে বিস্তৃত হচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের রাজত্ব
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ১:৩২ এএম 
প্রতীকী ছবি
রাজধানীতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে কিশোর গ্যাং। অল্পবয়সি এসব কিশোরের নৃশংসতা থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানাচ্ছে। তাদের ভয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বিপুলসংখ্যক সদস্য গ্রেফতার হলেও কোনোভাবেই কমছে না তাদের দৌরাত্ম্য। গ্রেফতারের পর বয়সজনিত ‘সুবিধা’ পেয়ে অল্প সময়েই জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এসব কিশোর।

১৪ থেকে ২০ বছর বয়সি এ গ্যাং চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক কারবার, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধে জড়িত। এমনকি খুনোখুনিতেও পরোয়া নেই। তাদের হাতে রয়েছে চাপাতিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র। পাশাপাশি পিস্তল ও রিভলবারসহ আগ্নেয়াস্ত্রও এসব কিশোরের নাগালে। এদের নিয়ন্ত্রণ করে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রভাবশালীরা। একাধিকবার গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে তারা আবার গ্যাং কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে।

কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গত প্রায় ২০ মাসে খুন হয়েছেন ২৪ জন। সর্বশেষ ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমনের পর গত ১৫ এপ্রিল রাতে খুন হন আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা একমত- শুধু পুলিশিব্যবস্থা দিয়ে এ সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ।

২০২৩ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীতে সক্রিয় ৫২টি কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা করে, যেখানে মোট সদস্য ছিল ৬৮২ জন। ২০২৪ সালে ডিএমপির ৮টি বিভাগের মধ্যে মিরপুর বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৩টি গ্যাং ও ১৭২ জন সদস্য ছিল। উত্তরা বিভাগে ৬টি গ্যাংয়ে ১০৮, গুলশানে ৭টিতে ৬৩, তেজগাঁওয়ে ৭টিতে ১২১, রমনায় ৭টিতে ১১৩, মতিঝিলে ৪টিতে ৩১, লালবাগে ২টিতে ১০ জন এবং ওয়ারীতে ৬টি গ্যাংয়ে ১০৮ সদস্য ছিল।

২০২৪ সালে র‌্যাব রাজধানীতে সক্রিয় ৮০টি কিশোর গ্যাং চিহ্নিত করে। একই সময়ে গোয়েন্দা পুলিশ শতাধিক গডফাদারের তালিকাও তৈরি করে, যেখানে সিটি করপোরেশনের ২১ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নামও ছিল।

২০২৫ সালে ডিএমপি সদর দফতর রাজধানীতে সক্রিয় ১১৮টি গ্যাংয়ের তালিকা করে। এর মধ্যে মিরপুর বিভাগে সর্বোচ্চ ৩২ গ্যাং, যার মধ্যে পল্লবী থানায় ১৪টি। তেজগাঁও বিভাগে ২৬টি, যার মধ্যে মোহাম্মদপুরে ১৬টি সক্রিয়। এ ছাড়া রমনায় ৬টি, লালবাগে ১০টি, ওয়ারীতে ১৩টি, মতিঝিলে ১০টি, গুলশানে ১১টি এবং উত্তরায় ১০টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।

গত তিন বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে গ্যাং বেড়েছে ৩২টি এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বেড়েছে ৩৮টি। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে বৃদ্ধির হার ৬৫ শতাংশের বেশি।

রাজনৈতিক আশ্রয় : মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাং কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি। পাঁচটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ থানার প্রতিটি ওয়ার্ড ও মহল্লা ভাগ হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব গোষ্ঠীর পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের পর কিশোর-তরুণদের মধ্যে গ্যাং গঠনের প্রবণতা বাড়ে। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রভাবশালীরা এসব গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট জামিনে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের প্রভাবও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

ডিএমপির তথ্য মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মোহাম্মদপুরে সক্রিয় ১৭টি বড় অপরাধী দলের মধ্যে অন্তত ৬টির পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আরও কয়েকটি দল শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

কারণ ও করণীয় : বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষা, সমাজ ও রাজনীতিতে পরিবর্তনের ফলে কিশোরদের মানসিকতায় প্রভাব পড়েছে। হিরোইজমের প্রবণতা বেড়েছে এবং তারা সংঘবদ্ধ শক্তিকে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করছে। শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্বলতা, পারিবারিক নজরদারির অভাব এবং সামাজিক অবক্ষয়ও এর পেছনে ভূমিকা রাখছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে শুধু গ্রেফতারই সমাধান নয়, তাদের সমাজে পুনর্বাসনও জরুরি।

সমাজবিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর অপরাধ দমনে পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। মনোবিজ্ঞানী ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, পারিবারিক পরিবেশ, বন্ধুবৃত্ত, মানসিক বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক পরিস্থিতি- সব মিলিয়েই কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, পরিবার থেকেই নজরদারি বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। যাদের অভিভাবক নেই, তাদের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

আইনি দিক : ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, অধিকাংশ কিশোর গ্যাংয়ের মামলা জামিনযোগ্য হওয়ায় দীর্ঘসময় তাদের আটক রাখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীর অভাবেও বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। শিশুদের জন্য পৃথক আদালত গঠন করলে এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব।




  বিষয়:   রাজধানী  বিস্তৃত  কিশোর গ্যাং  রাজত্ব 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: