বিবর্তনে যেভাবে জন্ম পৌরাণিক দানবের

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পুয়ের্তো রিকোতে প্রথম চুপাকাব্রার দেখা মেলে। তারপর থেকে এই রহস্যময় কুকুরসদৃশ দানব যেটি নাকি গবাদিপশুর রক্ত শুষে

2026-04-20T04:39:48+00:00
2026-04-20T04:39:58+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বিবর্তনে যেভাবে জন্ম পৌরাণিক দানবের
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৩৯ এএম  আপডেট: ২০.০৪.২০২৬ ৪:৩৯ এএম
বিজ্ঞানীরা বলছেন চুপাকাব্রা সম্ভবত খোসপাঁচড়ায় আক্রান্ত একটি কয়োট। ছবি : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পুয়ের্তো রিকোতে প্রথম চুপাকাব্রার দেখা মেলে। তারপর থেকে এই রহস্যময় কুকুরসদৃশ দানব যেটি নাকি গবাদিপশুর রক্ত শুষে নেয় তার গল্প মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল এমনকি চীন পর্যন্ত আতঙ্ক ও কৌতূহল ছড়িয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিবর্তন তত্ত্বের সাহায্যে এই গল্পগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। ২০২৩ সালেও নাকি রক্ত-মাংসের চুপাকাব্রা দেখতে পাওয়া গেছে। 

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো প্রাণীটিকে লকনেস দানব বা বিগফুটের চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত তুলেছে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ওই দানবগুলো আসলে কয়োট। যারা ভয়াবহ ‘ম্যাঞ্জ’ রোগে আক্রান্ত। এটি একটি যন্ত্রণাদায়ক, প্রাণঘাতী চর্মরোগ, যার ফলে প্রাণীদের লোম ঝরে যায়, চামড়া শুকিয়ে কুঁকড়ে যায়, আরও নানা উপসর্গ দেখা দেয়।

কিছু বিজ্ঞানীর কাছে চুপাকাব্রার এই ব্যাখ্যাই যথেষ্ট। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের পতঙ্গবিজ্ঞানী ব্যারি ওকনর বলেছেন, আমার মনে হয় না আমাদের আর কিছু খোঁজার দরকার আছে বা এই পর্যবেক্ষণের পেছনে অন্য কোনো ব্যাখ্যা ভাবার দরকার আছে। তিনি ‘সারকোপটেস স্ক্যাবিই’ নামক পরজীবীটি নিয়ে গবেষণা করেন যে জীবাণু ম্যাঞ্জ রোগ ঘটায়। একই কথা বলেছেন বন্যপ্রাণী রোগবিশেষজ্ঞ কেভিন কিলও। 

তিনি একবার একটি চুপাকাব্রা মৃতদেহের ছবি দেখে স্পষ্ট চিনতে পেরেছিলেন এটি একটি কয়োট মাত্র। তবে তিনি কল্পনা করতে পারেন যে, অন্য কেউ হয়তো তা চিনতে পারেনি। কিল বলেন, এটি এখনও কয়োটের মতো দেখতে, শুধু কয়োট হওয়ার জন্য খুব করুণ অবস্থা। আমি যদি বনে এটি দেখতাম, তবে ভাবতাম না এটি চুপাকাব্রা। কারণ আমি কয়েক দিন ধরে ম্যাঞ্জ আক্রান্ত কয়োট আর শিয়াল দেখছি। কিন্তু সাধারণ মানুষ এর পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্ত হতে পারে।

‘সারকোপটেস স্ক্যাবিই’ পরজীবীটি মানুষের মধ্যেও ‘স্ক্যাবিস’ নামক চুলকানির র‌্যাশ সৃষ্টি করে। এই মাইটগুলো (এক ধরনের অণুপরজীবী) পোষকের চামড়ার নিচে গর্ত করে, ডিম ও বর্জ্য পদার্থ নিঃসরণ করে, যাতে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রতিক্রিয়া সাধারণত একটু অসুবিধাজনক মাত্র। কিন্তু কয়োটের মতো প্রাণীদের জন্য ম্যাঞ্জ প্রাণঘাতী হতে পারে, কারণ তারা সারকোপটেস সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিক্রিয়া বিবর্তিত করতে পারেনি।

ওকনরের অনুমান মাইটটি প্রথমে মানুষ থেকে গৃহপালিত কুকুরে, তারপর বনের কয়োট, শিয়াল ও নেকড়েতে ছড়িয়েছে। তার গবেষণা বলছে, প্রতিক্রিয়ার এত চরম পার্থক্যের কারণ হলো মানুষ ও অন্যান্য প্রাইমেটরা তাদের বিবর্তনীয় ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় সারকোপটেস মাইটের সঙ্গেই কাটিয়েছে, অন্য প্রাণীরা তা করেনি।

ওকনর বলেন, প্রাইমেটরা এই মাইটের আদি পোষক। মাইটের সঙ্গে আমাদের বিবর্তনীয় ইতিহাস আমাদের স্ক্যাবিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে- যাতে এটি হাতের বাইরে চলে না যায়, যেমনটা অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে হয়। অর্থাৎ মানুষ এমন জায়গায় বিবর্তিত হয়েছে, যেখানে আমাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সংক্রমণকে বেকায়দা করার আগেই তাকে বেকায়দা করতে পারে।

কিল জানান, মাইটগুলোরও বিবর্তন চলছে। মানুষের ওপর আক্রমণটি এমনভাবে সাজিয়েছে যে তারা আমাদের মেরে ফেলতে চায় না- কারণ তাতে তাদের খাদ্যের উৎসই নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু অ-মানব প্রাণীদের ক্ষেত্রে সারকোপটেস এখনও সেই ভারসাম্য তৈরি করতে পারেনি। যেমন কয়োটের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া এত তীব্র হয় যে লোম ঝরে যায়, রক্তনালি সংকুচিত হয়, তার ফলে প্রচণ্ড ক্লান্তি এমনকি পূর্ণ অবসাদগ্রস্ত দেখা দেয়।

যেহেতু চুপাকাব্রা সম্ভবত ম্যাঞ্জ-আক্রান্ত কয়োট মাত্র, তাই এটির ‘ছাগল চোষক’ নামটিও ব্যাখ্যা করা যায়। এরা গবাদিপশু আক্রমণ করে, তাদের রক্ত শুষে নেয়। ওকনর বলেন, ম্যাঞ্জে আক্রান্ত প্রাণীরা অনেক দুর্বল হয়ে যায়। তারা যদি স্বাভাবিক শিকার ধরা কঠিন মনে করে, তবে গবাদিপশু বেছে নিতে পারে, কারণ সেটি সহজ। আর রক্ত চোষার ব্যাপারটি সেটি সম্ভবত কাল্পনিক বা অতিরঞ্জিত মাত্র। ওকনর বলেন,  আমার মতে এটি একদমই মিথ।

মেইনের পোর্টল্যান্ড শহরে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রিপ্টোজুলজি জাদুঘরের পরিচালক লরেন কোলম্যান স্বীকার করেন, চুপাকাব্রার অনেক দর্শন বিশেষ করে সাম্প্রতিকগুলো ম্যাঞ্জ আক্রান্ত কয়োট, কুকুর বা কয়োট-কুকুরের সংকর প্রাণী (কয়ডগ) হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। তিনি বলেন, এটি নিশ্চয়ই একটি ভালো ব্যাখ্যা, তবে এর মানে এই নয় যে এটি পুরো কিংবদন্তি ব্যাখ্যা করে।

উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৫ সালে পুয়ের্তো রিকো থেকে চুপাকাব্রার যে ২০০টির বেশি প্রাথমিক প্রতিবেদন এসেছিল, তাতে দানবটিকে সম্পূর্ণ অ-কুকুরসুলভ বর্ণনা করা হয়। কোলম্যান বলেন, ১৯৯৫ সালে চুপাকাব্রাকে বলা হতো একটি দ্বিপদ (দুই পায়ে হাঁটা) প্রাণী, যার উচ্চতা তিন ফুট, ছোট ধূসর লোম, আর পিঠে কাঁটা থাকে।

কিন্তু যেন ‘টেলিফোন খেলা’র মতো, নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে সংবাদ প্রতিবেদনের ভুল ও অপুঙ্খানুবাদের কারণে চুপাকাব্রার বর্ণনা বদলে যেতে থাকে। ২০০০ সালের মধ্যে ধারালো কাঁটাওয়ালা আদি চুপাকাব্রার স্থান প্রায় পুরোপুরি নিয়েছিল নতুন কুকুরসদৃশ দানবটি। যা আগে দেখা যেত দুই পায়ে হাঁটা প্রাণী হিসেবে, এখন তা চার পায়ে হেঁটে গবাদিপশু শিকার করছে।

কোলম্যান বলেন, এটি আসলে একটি বড় ভুল ছিল। এই পুরো বিভ্রান্তির কারণে যেখানে অধিকাংশ মিডিয়াই এখন কুকুর বা ম্যাঞ্জ আক্রান্ত কয়োটকে চুপাকাব্রা বলে রিপোর্ট করছে। আপনি আর আগের মতো পুয়ের্তো রিকো বা ব্রাজিল থেকে ভালো প্রতিবেদন শুনতে পান না। সেসব প্রতিবেদন উধাও হয়ে গেছে, আর বেড়েছে শুধু ম্যাঞ্জ আক্রান্ত ক্যানিডদের গল্প।

কিংবদন্তির উৎস কী তা হলে? কোলম্যানের মতে, একটি সম্ভাবনা হলো ১৯৯৫ সালের গ্রীষ্মে পুয়ের্তো রিকোতে একটি এলিয়েন-হরর সিনেমা দেখে বা শুনে লোকেরা কল্পনায় সবকিছু তৈরি করে নিয়েছিল। তিনি বলেন, যদি দেখেন পুয়ের্তো রিকোতে ‘স্পিসিজ’ সিনেমাটি কখন মুক্তি পেয়েছিল, তা হলে দেখবেন এর সময়কালের সঙ্গেই সেখানে প্রতিবেদনের প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। 

তারপর সিনেমার অভিনেত্রী নাতাশা হেনস্ট্রিজের চরিত্র ‘সিল’-এর ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। পিঠে ধারালো কাঁটার যে অবিচ্ছেদ্য চিহ্ন, তা ১৯৯৫ সালের প্রথম চুপাকাব্রার ছবিগুলোর সঙ্গেই হুবহু মিলে যায়। আরেকটি তত্ত্ব হলো, পুয়ের্তো রিকোর ওই প্রাণীরা ছিল পলায়নপর একদল রিসাস বানর। বানরগুলো প্রায়ই দুই পায়ে দাঁড়ায়।

কোলম্যান বলেন, সে সময় পুয়ের্তো রিকোতে রক্তের পরীক্ষায় ব্যবহারের জন্য একদল রিসাস বানর রাখা ছিল। ওই দলটি হয়তো পালিয়ে গিয়েছিল। তবে চুপাকাব্রার ব্যাখ্যা এত সরলও হতে পারে, আবার আরও অনেক আকর্ষণীয়ও। কারণ কোলম্যান যোগ করেন, আমরা জানি, নতুন নতুন প্রাণী সবসময় আবিষ্কৃত হচ্ছে। 


  বিষয়:   বিবর্তন  জন্ম  পৌরাণিক দানব 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: