বগুড়ায় দিনভর নানা কর্মসূচি শেষে বিকালে জনসভায় বিরোধী দলের কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিরোধী দলকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঠিক যেভাবে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে বলেছিল ‘এক মিনিটও শান্তিতে থাকতে দেব না’, সেই একই ভূত কিন্তু আবার এদের ওপরেও সওয়ার করেছে। এ সময় তিনি রাষ্ট্র সংস্কারের দাবির আড়ালে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ তুলে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। সোমবার বিকালে আলতাফুন্নেসা খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত এ জনসভায় যোগ দেওয়ার আগে তিনি সিটি করপোরেশন কার্যক্রমের উদ্বোধন, জিয়াবাড়িতে অবস্থান, টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং খাল খননসহ একাধিক উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশ নেন।
তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে বিএনপি কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে, তার একটি রূপরেখা ২০১৭ সালে তুলে ধরেছিলেন দলটির তখনকার চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সেটির ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ১২ জুলাই রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করে বিএনপি।
দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, যে সময় বিএনপি এই ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব দেশের সামনে, জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিল, বাংলাদেশের আর কোনো রাজনৈতিক দল বিএনপি ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দল সংস্কারের ‘স’ শব্দটি তখন উচ্চারণ করেনি স্বৈরাচারের ভয়ে। কিন্তু আপনাদের দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বাংলাদেশের মানুষের খেটে খাওয়া রাজনৈতিক দল, মানুষের রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশের কৃষকের রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশের মা-বোনদের রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ৩১ দফা সংস্কার দিয়েছিল।
কারণ আমরা দেখেছিলাম স্বৈরাচার বিগত ১৬ বছরে কীভাবে পরতে পরতে দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। কীভাবে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, কীভাবে দেশের ব্যাংকিংব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, কীভাবে দেশের যোগাযোগব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, কীভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। কিছু মেগা প্রোজেক্ট করে দুর্নীতি করেছে, এর বাইরে কিছু করেনি।
দেখেন কেমন আন্দোলন আন্দোলন কথা বলে আর ব্যক্তিগত ঘটনাকে কীভাবে রাজনৈতিক রূপ দিতে চায়, ঠিক দিনাজপুরের ইয়াসমিনের ঘটনার মতো। ওই ঘটনাকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে দেশে অশান্তি তৈরি করা হয়েছিল, ১৭২ দিনের হরতাল ডাকা হয়েছিল; মনে আছে নিশ্চয়ই আপনাদের। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বগুড়া-সিরাজগঞ্জে রেললাইনের কাজ দ্রুত শুরু করার আশ্বাস দেন।
এদিন বিকাল পৌনে ৫টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঞ্চে এসে পৌঁছালে হাজারো সমর্থক মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে সরকারপ্রধানকে শুভেচ্ছা জানান। হাস্যোজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। জেলা বিএনপির সভাপতি, বগুড়া-৬ আসনের এমপি রেজাউল করিম বাদশার সভাপতিত্বে জনসভায় বগুড়ার এমপিরা বক্তব্য রাখেন। জনসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী জেলা প্রেস ক্লাবের নির্মিত ভবন এবং বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল মসজিদের পুনর্নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর বগুড়ায় এটিই তারেক রহমানের প্রথম জনসভা। এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি আলতাফুন্নেছা মাঠেই নির্বাচনি জনসভা করেছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তারেক রহমানের পৈতৃক ভিটা বগুড়ায় আগমন উপলক্ষে সোমবার জনসভার আয়োজন করে জেলা বিএনপি। দুপুর থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জনসভায় আসতে শুরু করেন। বেলা ৩টার মধ্যে পুরো মাঠ প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে রূপ নেয়।
জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, আজ আমরা দেখছি যারা দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে প্রিয় ভাই-বোনরা, তারা তো এই দেশের স্বাধীনতাতেই বিশ্বাস করেনি, এই দেশের অস্তিত্বেই তারা বিশ্বাস করেনি প্রিয় ভাই-বোনরা।
দেশের অস্তিত্বেই তারা বিশ্বাস করে না, তাদের কি বিশ্বাস করা যায়? তাদের বিশ্বাস করা যায় না। কোনো বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে আমরা পা দেব না। সোমবার বিকালে বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জেলা বিএনপির জনসভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আজ এই হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে, এই মিডিয়ার সামনে পরিষ্কারভাবে আমি আবারও বলে দিতে চাইÑ সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে জুলাই সনদে সই করে এসেছে, সেই জুলাই সনদের প্রত্যেকটি শব্দ, প্রত্যেকটি অক্ষর আমরা ইনশাআল্লাহ এক এক করে বাস্তবায়ন করব।
কিন্তু বারবার পরিষ্কারভাবে এই কথা বলে দেওয়ার পরেও আমরা দেখলাম যে কিছু রাজনৈতিক দল সংসদে এবং সংসদের বাইরে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য কিছু কথাবার্তা বলা শুরু করেছে। সংস্কার দাবির নামে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি কমিশন করেছিল। ১১টি কমিশনের মধ্যে সংবিধান আছে, বিচারের বিষয় আছে, প্রশাসনিক আছে, স্বাস্থ্য আছে, নারী আছে। আজকে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি আমরা। খেয়াল করে দেখবেন, যারা এই সংস্কার সংস্কার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, জুলাই সনদ সম্পর্কে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে; তারা কিন্তু নারীর স্বাধীনতা অথবা নারীর উন্নয়ন নিয়ে কোনো কথা বলে না।
ক্ষমতা কুক্ষিগত করতেই জনগণকে ‘বিভ্রান্ত’ করা হচ্ছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দেশের মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড করতে চাই, কৃষক কার্ড করতে চাই, ইমাম-মুয়াজ্জিন সাহেবদের সম্মানীসহ খাল খনন করতে চাই, বৃক্ষরোপণ করতে চাই, দেশের যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে এবং দেশে কর্মসংস্থান করতে চাই। এসব ব্যাপারে কোনো কাজ করে না। দেখেননি নির্বাচনের সময় কেমন বলেছিল, ‘রাখ তোর ফ্যামিলি কার্ড’, মনে আছে? প্রিয় ভাই-বোনরা, জনগণের স্বার্থে যে কাজ, সেটিকে তারা রেখে দেয়; কিন্তু নিজেদের ক্ষমতা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা কীভাবে কুক্ষিগত করতে হবে, সেই কাজের জন্য তারা এখন বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
যাত্রা শুরু বগুড়া সিটি করপোরেশনের : দুপুর ১২টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সিটি করপোরেশনের ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন। পরে সিটি করপোরেশন চত্বরে বৃক্ষরোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর তিনি বগুড়া সিটি করপোরেশনের ফলক উন্মোচন করে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
২০০৬ সালে তৎকালীন সরকার বগুড়া পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণ করে আশপাশের ৪৮টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত করে এবং ওয়ার্ড সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ২১ করা হয়। সে সময় থেকেই বগুড়াকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার পরিকল্পনা থাকলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে বগুড়া সিটি করপোরেশন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণের কার্যক্রম উদ্বোধন : নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে পরিবারের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে সরকারের বহুল আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছে। সোমবার দুপুরে বগুড়ার শহিদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। পরে তিনি গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী এলাকায় গিয়ে সুবিধাভোগী নারীদের হাতে প্রতীকীভাবে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন। এ সময় কর্মসূচির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।
অনুষ্ঠান ঘিরে সকাল থেকেই আশপাশের ইউনিয়ন ও উপজেলার নারী-পুরুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠ ও আশপাশ এলাকায় সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতারাসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করেন। কর্মসূচি শেষে তিনি বাগবাড়ী এলাকায় একটি খাল খনন প্রকল্প পরিদর্শন করার কথা রয়েছে। এ ছাড়া তিনি তার পৈতৃক বাড়িতে সংক্ষিপ্ত সময় অবস্থান শেষে শহরে আয়োজিত জনসভায় যোগ দিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন।
ই-বেইল বন্ড সেবার উদ্বোধন : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া জজ আদালতে ই-বেইল বন্ড সেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। সোমবার বেলা ১১টার দিকে বগুড়া সার্কিট হাউস থেকে পায়ে হেঁটে কোর্ট চত্বরে পৌঁছান তিনি। পরে বেলা ১১টা ২০ মিনিটে এ সেবার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সময় তিনি বগুড়া জেলা অ্যাডভোকেটস বার সমিতির নবনির্মিত ভবনের নামফলক উন্মোচন করেন। এর আগে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে সড়কপথে ঢাকার বাসভবন থেকে রওনা হয়ে বগুড়া শহরের সার্কিট হাউসে পৌঁছান তিনি। ই-বেইল বন্ড সেবার উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী বগুড়া সিটি করপোরেশনের ফলক উন্মোচন এবং সিটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম ঘোষণা করবেন বলে জানা গেছে।