মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বন্ধ রয়েছে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফলে ঢাকাসহ সারা দেশে লোডশেডিং বেড়েছে। সরকারিভাবে লোডশেডিং ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বলা হলেও তা ২ হাজার মেগাওয়াট ছুঁয়েছে। ঢাকার চেয়ে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের চিত্র ভোগান্তির পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই সংকটের মধ্যেই বকেয়া বিল দ্রুত পরিশোধের তাগাদা দিয়ে সরকারকে চিঠি দিয়েছে ভারতীয় কোম্পানি আদানি। বকেয়া শোধ না হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে চিঠিতে জানানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বরাবর পাঠানো চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়, বকেয়া বিল পরিশোধে দেরির কারণে প্রকল্পের অর্থপ্রবাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি কিনে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে। তাই সময়মতো বিল পরিশোধ না করলে আংশিক বা পুরোপুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের ঝুঁকি থেকে যায়।
আদানির পাঠানো সবশেষ চিঠিতে বলা হয়, কোম্পানির মোট পাওনা ৬৮ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৩৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার (প্রতি ডলারে ১২২ টাকা দরে ৪ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা) নিয়ে কোনো বিরোধ নেই, যা চার থেকে পাঁচ মাসের বিলের সমান। এরপরও বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। তাই দ্রুত পুরো বকেয়া শোধ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিয়মিত বিল দিতে অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গণমাধ্যমে বলেছেন, তিনি চিঠি এখনও হাতে পাননি। চিঠি পাওয়ার পর করণীয় ঠিক করবেন।
পিডিবি ও আদানি সূত্র বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বকেয়া প্রায় ৭০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আদানির দিক থেকে কয়েক দফা তাগাদা দিলে বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে নিয়মিতভাবে বিল পরিশোধ করেছে পিডিবি। একই সঙ্গে কিছু কিছু করে পুরোনো বকেয়াও শোধ করা হয়। এতে মোট বকেয়া কমতে থাকে। তবে গত ডিসেম্বর থেকে আবার বিল পরিশোধ কমিয়ে দেয় পিডিবি। এতে বকেয়া আবার বাড়তে থাকে।
এদিকে দেশে স্থাপিত ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। আর বিদ্যুৎকেন্দ্র, আমদানি, সৌর, বায়ু ও ক্যাপটিভ থেকে মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে আমদানি সক্ষমতা ২ হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট। সক্ষমতা থাকলেও চাহিদা না থাকায় বছরের বেশিরভাগ সময় অর্ধেকের বেশি কেন্দ্র অলস পড়ে থাকে।
জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র : দেশে অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮৮ শতাংশ তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। তবে বর্তমানে জ্বালানি সংকটে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র ১০টি ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র ৮টি। এ ছাড়া ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে উৎপাদন কমে গেছে ৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ৯টি, তেলভিত্তিক ২৪টি ও কয়লাচালিত কেন্দ্র রয়েছে ২টি। বন্ধ থাকা ১৮ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো হলো গ্যাসভিত্তিক : ঘোড়াশাল রিপাওয়ারড ইউনিট ৪, ঘোড়াশাল টিপিপি ইউনিট ৫, ঘোড়াশাল ৩৬৫ মেগাওয়াট, ঘোড়াশাল ১০৮ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ৩৩৫ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ৫৮৩ মেগাওয়াট, জেরা মেঘনাঘাট ৭১৮ মেগাওয়াট, বাঘাবাড়ী ৭১ মেগাওয়াট, সিরাজগঞ্জ ২২৫ মেগাওয়াট।
তেলভিত্তিক : গাগনগর ১০২ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ১০৪ মেগাওয়াট, জুলদাহ ১০০ মেগাওয়াট, জুলদাহ ২ ইউনিট ১০০ মেগাওয়াট, জঙ্গলিয়া ৫২ মেগাওয়াট, ফেনী লঙ্কা পাওয়ার, রূপসা ১০৫ মেগাওয়াট, নাটোর ৫২ মেগাওয়াট।
বিপিডিবির তথ্যানুযায়ী গত ৪-৫ দিন ধরে গরম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট, যার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ২০ এপ্রিল ডিপিডিসি ও ডেসকোর চাহিদা ছিল ১ হাজার ৬৬৬ ও ১ হাজার ২৬০ মেগাওয়াট, যার পুরোটাই সরবরাহ করা হয়েছে। রাজধানীতে মেইনটেন্যান্সের কাজের জন্য সরবরাহ বন্ধ থাকায় লোডশেডিং হয়। বিপিডিবি প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিংয়ের কথা বললেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন ঘাটতি ২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সাধারণত ব্যয়বহুল। জ্বালানি খাত নিয়ে সরকার আর্থিকভাবে চাপে থাকায় কয়লা ও গ্যাসের মাধ্যমে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে চাচ্ছে, যা তুলনামূলক সাশ্রয়ী।
পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী ২০ এপ্রিল গ্যাস উৎপাদিত হয়েছে ২৫৯ কোটি ঘনফুট। তবে চাদিা ৩৫০ কোটি ঘনফুটের বেশি। এর মধ্যে আরএলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে ৯০.৭ কোটি ঘনফুট। জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। যা দিয়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে গিয়ে ১টি ছাড়া সব সার কারখানার উৎপাদন প্রায় বন্ধ রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের চলমান সংকটের সঙ্গে যোগ হয়েছে কয়লার স্বল্পতা। এতে বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে দিনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। এ ছাড়া নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আসা বন্ধ রয়েছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার দ্বিগুণ হলেও ঘাটতি মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। লোড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে।
লোডশেডিংয়ের চিত্র : ২০ এপ্রিল পিক আওয়ার রাত ৯টায় সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৪৪৯ মেগাওয়াট, এ সময় উৎপাদিত হয়েছে ১৫ হাজার ১৯৯ মেগাওয়াট। লোডশেডিং করতে হয়েছে ১ হাজার ১৯৬ মেগাওয়াট। একই দিনে ডে পিক আওয়ারে চাহিদা হয় ১৪ হাজার ৯৫৩ মেগাওয়াট, আর উৎপাদিত হয় ১৩ হাজার ৯১৯ মেগওয়াট। সর্বনিম্ন সরবরাহ করা হয় প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট।
বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, কয়লার সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে, যা বর্তমানে লোডশেডিং বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া গ্যাস ও ফার্নেস অয়েলেরও কিছুটা স্বল্পতা রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে তীব্র গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটা প্রভাব পড়ছে, তবে আমরা আশা করছি লোডশেডিং বড় আকারে হবে না।