দেশে আসছে অনলাইনে অর্থ আদান-প্রদান এবং কেনাকাটার বিল পরিশোধ করার জনপ্রিয় মাধ্যম পেপাল। বিগত সরকারের সময়গুলোতে এমন কথা শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত ঘোষণাতেই আটকে আছে এর কার্যক্রম। বাস্তুবে যার কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। যে কারণে বাংলাদেশে পেপাল চালু নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।
বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, দেশে বহুল প্রতীক্ষিত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপাল’ চালুর কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে তথ্য-প্রযুক্তির সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশাবাদী সরকার। প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পর আবারও নতুন করে জোরালোভাবে আলোচনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে পেপালের আগমন নিয়ে।
তবে কবে আসছে পেপাল? কবে থেকে দেশে চালু হবে পেপালের কার্যক্রম? আদৌ হবে কি হবে না, নাকি এবারও ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে দেশে পেপালের যাত্রা। বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে চলছে জোর আলোচনা।
আরও পড়ুন
তথ্য-প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, দেশে যেদিন পেপাল চালু হবে সেদিনই বুঝব পেপাল আসছে। কারণ অতীতের মন্ত্রীরা পেপাল আসা নিয়ে অনেক গল্প শুনিয়েছেন।
তথ্য-প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির সময়ের আলোকে বলেন, যেদিন দেশে পেপালের কার্যক্রম বা ব্যবহার শুরু হবে সেদিনই বুঝব পেপাল আসছে। আমরা আগের তিন মন্ত্রীর কাছে শুনেছি পেপাল আসছে। মাঝখানে ফয়েজ আহমেদ তৈয়বও পেপালের গল্প শুনিয়েছেন। কিন্তু পেপালের বাস্তবতা চোখে দেখিনি। সুতরাং না আসার আগে আশার আলো দেখছি না।
তিনি বলেন, এখানে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে যে আমরা পেপাল আনতে চাই, কিন্তু আমাদের রেগুরেলটরি কিছু কমপ্লায়েন্সের সঙ্গে ওদের (পেপাল) মিলে না। সবকিছু মিলে না, কোথায় যেন আটকে যায়। পৃথিবীর অনেক দেশেই পেপাল চলে। আমাদের দেশে চললে আউটসোর্সে কিছু বেনিফিটেড হতো। এর কিছু চ্যালেঞ্জও আছে এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক ভালো বলতে পারবে।
পেপাল কী?অনলাইনে অর্থ আদান-প্রদান এবং কেনাকাটার বিল পরিশোধ করার জনপ্রিয় মাধ্যম পেপাল। ইলন মাস্ক হলেন পেপালের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় রীতিমতো নেতৃত্ব দিচ্ছে পেপাল। ১৯৯৮ সালে যাত্রার শুরু থেকেই অনলাইনে কেনাকাটা ও অর্থ আদান-প্রদানের এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে পেপাল। অনলাইনে পে করার ক্ষেত্রে চিরাচরিত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের পরিবর্তে খুব সহজেই পেপাল ব্যবহার করা যায়। চেক বা ওয়্যার ট্রান্সফার সার্ভিসের ভোগান্তি দূর করতে অনন্য ভূমিকা রেখেছে পেপাল। বিশ্বের ২০০টিরও অধিক দেশে পেপালের ৩৬০ মিলিয়নেরও বেশি ব্যবহারকারী রয়েছেন। শুধু ২০২০ সালের তৃতীয় প্রান্তিকেই ৪ বিলিয়ন লেনদেন সম্পন্ন করেছে পেপাল। পেপাল একটি অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা। যে কেউ বিনামূল্যে পেপাল অ্যাকাউন্ট খুলে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ক্রেডিট কার্ড বা ডেবিট কার্ড টাকা পাঠানোর উদ্দেশ্যে পেপাল অ্যাকাউন্টে যুক্ত করতে পারে। পেপাল মূলত একটি আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানি যেটি প্রযুক্তির মাধ্যমে আর্থিক সেবা প্রদান করে। পেপালের মাধ্যমে অনলাইনে টাকা পাঠানো, খরচ করা ও গ্রহণ করা যায়। ব্যাংক ও মার্চেন্টের মধ্যে মিডলম্যান হিসেবে কাজ করে পেপাল। এ ছাড়া পেমেন্ট তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পেপাল। পেপালের মাধ্যমে বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সদস্যদের পেপাল ব্যবহার করে টাকা পাঠানোর পাশাপাশি অন্যদের থেকে টাকা রিসিভও করা যায়। অর্থাৎ পেপাল ক্রেডিট একটি ভার্চুয়াল ক্রেডিট কার্ডের মতো কাজ করে, যা শুধু পেপাল সাপোর্টেড পেমেন্ট পয়েন্টগুলোতে ব্যবহার করা যায়। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এসব ফিচার ব্যাপক উপকারে আসে। ২০১৯ সালে পেপাল ক্যাশ নামে আলাদা এই ফিচারটি চালু করে পেপাল। পেপালে থাকা সব অর্থকে একসঙ্গে পেপাল ক্যাশ বলা হয়। যখন কেউ কাউকে পেপালে টাকা পাঠাবে, ব্যবহারকারী চাইলে তা পেপাল ক্যাশ অ্যাকাউন্টে রাখতে পারেন কিংবা ব্যাংকে ট্রান্সফার করতে পারেন। পেপাল ক্যাশ অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ পরিবার বা বন্ধুদের পাঠানো যাবে কোনো ধরনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মধ্যস্থতা ছাড়াই। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সাধারণ পেপাল অ্যাকাউন্ট যথেষ্ট। তবে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হলে পেপাল বিজনেস অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে পেপাল পেমেন্ট নেওয়া গেলেও বিজনেস অ্যাকাউন্টে থাকছে আলাদা সুবিধা।
বাংলাদেশে পেপাল এই মুহূর্তে অফিসিয়াল কোনো উপায়ে বাংলাদেশ থেকে পেপাল অ্যাকাউন্ট খোলা যায় না। কারণ বাংলাদেশ সরকার ও পেপালের সঙ্গে এখনও কোনো চুক্তি হয়নি।
বাংলাদেশের মার্কেটে ব্যবসা করতে হলে পেপালের বাংলাদেশ সরকার ও দেশের মুদ্রা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। তবে এখনও পেপালের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি কিংবা পেপাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে কোনো প্রপোজালও পাঠায়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সময়ের আলোকে বলেন, পেপাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রপোজাল আমাদের কাছে আসেনি। হতে পারে তারা যখন আসবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কথাবার্তা বলে সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলো আঁচ করে তারপরে ইনভেস্টমেন্ট ডিসিশন নেবে। হয়তো সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে। ওগুলো মেজর স্টেজে গেলে হয়তো তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রপোজাল পাঠাবে।
তিনি বলেন, ব্যবসায়িক পরিবেশ বোঝার জন্য পেপাল মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবে কিন্তু ব্যবসার জন্য আবেদন মন্ত্রীর কাছে করবে না। যেকোনো ক্ষেত্রে ফরেন ইনভেস্টমেন্ট করতে হলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ডের (বিডা) মাধ্যমে আসতে হবে। প্রপার চ্যানেল মেইনটেন করতে হবে। সব প্রসেজ ফলো করে আসতে হবে।
চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠান পেপাল অবশেষে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের বিষয়ে নীতিগতভাবে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এ আগ্রহ বাস্তবায়নে সময় লাগবে এবং এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোবে।
লুৎফে সিদ্দিকী বলেছিলেন, পেপাল নিয়ে অনেক বছর ধরেই আলোচনা চলছিল। কিন্তু নানা কারণে তারা আমাদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে চাচ্ছিল না। গত বছরের ১ ডিসেম্বরের দিকে কয়েক মাস অনুরোধের পর তারা প্রথমবারের মতো একটি সিনিয়র লেভেলের টিম বাংলাদেশে পাঠায়। পেপালের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট হেড (সিঙ্গাপুরভিত্তিক), সাউথ এশিয়ার প্রধান (দিল্লিভিত্তিক) এবং আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চার-পাঁচ দিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করেন। এ সময় তারা দেশের উদ্যোক্তা, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও আইসিটি খাতের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও তাদের বৈঠক হয়।
তিনি জানিয়েছিলেন, এবার প্রথমবারের মতো উচ্চ পর্যায়ে আমার সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়েছে। ইন প্রিন্সিপাল তারা বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে আগ্রহী। তবে আমি খুব সতর্কভাবে বলছি এটা নিয়ে যেন ভুল হেডলাইন না হয়। পেপাল এখনই আসছে এমন ধারণা তৈরি করতে তারা নিজেরাই চাচ্ছে না।
লুৎফে সিদ্দিকী আরও ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, পেপালের মতো একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের নতুন কোনো দেশে কার্যক্রম শুরু করতে হলে দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। ওদের নিজেদের মধ্যে ডিবেট হবে, বোর্ডে আলোচনা হবে। এই পুরো প্রসেসটা তারা এখন শুরু করতে যাচ্ছে।
তবে নিজের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন তুলে ধরে লুৎফে সিদ্দিকী বলেছিলেন, আমার ইম্প্রেশন হলো ওরা ফুললি কনভিন্সড। বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক পোটেনশিয়াল আগেও ছিল, এখনও আছে। তবে এবার তারা সবচেয়ে বেশি কনফিডেন্স ফিল করেছে আমাদের গভর্ন্যান্স নিয়ে। বিশেষ করে গভর্নরের সঙ্গে এবং প্রাইভেট সেক্টর ব্যাংকের এমডিদের সঙ্গে কথা বলার পর তারা দেখেছে ব্যাংকিং সেক্টরের পরিস্থিতি আগের মতো নেই, উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। এরপর গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।
এরপর সংসদে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জানান বাংলাদেশে পেপাল চালুর কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে অতীতের সরকারগুলো থেকে পাওয়া মিথ্যা আশ্বাসের অভিজ্ঞতা থেকে এবারও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছেন দেশের প্রযুক্তিপ্রেমীরা। সরকারের এই আশ্বাসেও তারা আস্থা রাখতে পারছেন না।
এএডি/