দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে গত কয়েক দিনের অস্থিরতার পর পাম্পগুলোতে তেলের সরবরাহ বাড়িয়েছে সরকার। তবে সরবরাহ বাড়লেও সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি এখনো চরমে। দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা, পাম্প মালিকদের একাংশের অনিয়ম এবং অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের। বিশেষ করে কৃষি ও পরিবহন খাতে এর প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি।
বিপিসি বলছে, জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। পাম্পে ভিড় কমাতে সোমবার (২০ এপ্রিল) থেকে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের সরবরাহ ১০ থেকে ২০ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়েছে। বিপিসি অধীন বিতরণ কোম্পানিগুলো সোমবার থেকে প্রতিদিন ১৩ হাজার ৪৮ মেট্রিক টন ডিজেল, এক হাজার ৪২২ মেট্রিক টন অকটেন এবং এক হাজার ৫১১ মেট্রিক টন পেট্রল বিক্রি করবে। তবে, মঙ্গলবার বিপিসি ঘোষণার চাইতে বেশি তেল বিক্রি করেছে। এদিন ডিজেল ১৪ হাজার ২০ মেট্রিক টন, অকটেন ১ হাজার ৫৮৯ মেট্রিক টন ও ডিজেল ১ হাজার ৫৪০ মেট্রিক টন বিক্রি করা হয়েছে।
বিপিসির তথ্যানুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩২৯ মেট্রিক টন ডিজেল মজুদ রয়েছে, যা দিয়ে চলবে আরো ১২ দিন। চলতি মাসে গড়ে ১১হাজার ৪৭৯ মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি করা হয়েছে। অকটেন মজুদ আছে ২০ দিনের, মোট মজুদ রয়েছে ২৩ হাজার ৮৯২ মেট্রিক টন। চলতি মাসে গড়ে বিক্রি করা হয়েছে ১১৮৫ মেট্রিক টন। পেট্রোল মজুদ আছে ১৭ হাজার ৮২৭ মেট্রিক টন, যা দিয়ে চলবে আরো ১৩ দিন। চলতি মাসে গড়ে বিক্রি করা হয়েছে ১৩৭৪ মেট্রিক টন। দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে একযোগে বিপুল সংখ্যক জ্বালানি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে ৫টি জাহাজ। ১ লাখ ৬৯ হাজার টন ডিজেল ও অকটেন বহনকারী এসব জাহাজের মধ্যে দুটি থেকে মঙ্গলবার খালাস কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ফলে মজুদ আরো বাড়বে। এছাড়া পাইপলাইনে আরো কয়েকটি জ্বালানিবাহী জাহাজ রয়েছে। যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, শুধু চলতি মাস নয় আগামী মে মাস পর্যন্ত জ্বালানি তেল নিয়ে কোনো ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই। ইতোমধ্যে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। দেশের ৬৪ জেলা থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ি, মানুষ চাহিদানুযায়ী তেল পাচ্ছে, আগের মতো ভিড় নেই। রাজধানীতেও ভিড় নেই বললেই চলে। অল্প কিছু পাম্পে গ্রাহকের ভীড় রয়েছে আগামী সপ্তাহের শুরুতেই এই ভীড়ও থাকবে না।
তবে রাজধানীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা গেছে, গত সপ্তাহের তুলনায় ভীড় কিছুটা কমেছে। বাইকার এবং গাড়িচালকদের তেলের জন্য অপেক্ষার সময় কমেছে। আগের চেয়ে এখন কম সময় তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। পাম্পগুলোতে তেলের ট্যাঙ্কারের আনাগোনা বেড়েছে। তবে অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও দেওয়া হচ্ছে চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।
মোটরসাইকেল চালক এবং ব্যক্তিগত গাড়িচালকরা অভিযোগ করছেন যে, দীর্ঘ দুই-তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর মাত্র ৫০০ বা ১০০০ টাকার তেল পাচ্ছেন তারা। অনেক পাম্পে আবার ড্রাম বা জেনারেটরের জন্য তেল দিতে অস্বীকৃতি জানানো হচ্ছে, যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
পাম্পে সরবরাহ থাকার পরেও কেন সাধারণ মানুষ তেল পাচ্ছে না, তা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, একটি শক্তিশালী অসাধু চক্র বা ‘তেল সিন্ডিকেট’ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ডিপো থেকে তেল উত্তোলন করলেও তা সরাসরি পাম্পে না পাঠিয়ে গোপনে মজুত করছে। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারির কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
পাম্প মালিকরা বলছেন, ডিপো থেকে তেলের বরাদ্দ বাড়ানো হলেও তা চাহিদার তুলনায় এখনো পর্যাপ্ত নয়। এজন্য ভিড় কমছে না।
পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদ করিম কাবুল বলেন, আগের চেয়ে তেল সরবরাহ বেড়েছে। পাম্পগুলোতে ভিড়ও কমে আসছে। যুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে একটু সময় লাগবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব এবং মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, ট্রাস্টে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ভিড় কমেছে। এছাড়া দেশের ৬৪ জেলা থেকে যে খবর পেয়েছি তাতে ভিড় সেভাবে নেই। ঢাকার ২-১টি স্থানে ভিড় কিছুটা রয়েছে। আশা করছি আগামী সপ্তাহে ভিড় থাকবে না। সংকটকালের আগের চিত্র ফিরে আসবে। কারণ সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।
সময়ের আলো/জেডআই