তীব্র তাপপ্রবাহে দেশজুড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত। একই সঙ্গে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। প্রখর রোদ ও ভ্যাপসা গরমে ঘরে-বাইরে কোথাও মিলছে না স্বস্তি। দিন-রাতের তাপমাত্রা প্রায় সমান থাকায় মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা, হিট স্ট্রোকসহ নানা শারীরিক জটিলতার আশঙ্কা বাড়ছে, যা শিশু, বয়স্ক ও খেটে-খাওয়া মানুষের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে এই গরমে দিনমজুরের অবস্থা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঢাকা, রাজশাহীর মতো জনবহুল শহরগুলোতে তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতির কারণে দুঃসহ হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন জীবনযাপন।
বুধবার আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, রাজশাহী জেলার ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগের অবশিষ্টাংশ ও খুলনা বিভাগসহ ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, দিনাজপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।
তবে সংস্থাটি জানায়, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। দেশের অন্যত্র আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলেও পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। আবহাওয়ার সিনপটিক অবস্থায় বলা হয়েছে, লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্টেশনের রেকর্ড অনুযায়ী সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে রাজশাহীতে। একই দিনে ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাজশাহীতে ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর বুধবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে সিলেটে ১৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
অতিরিক্ত এ গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে-খাওয়া মানুষ। জীবিকার তাগিদে কাঠফাটা রোদেই কাজ করতে হচ্ছে তাদের। বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের কারণে প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে বের হচ্ছেন না। যারা বের হচ্ছেন, তারা প্রয়োজন সেরে দ্রুত বাসায় ফিরছেন। তবে নিম্ন আয়ের মানুষদেরই সড়কে কাজকর্মে বেশি ব্যস্ত দেখা গেছে।
রিকশাচালক জীবন মিয়ার বয়স প্রায় ৬৫ বছর। জীবিকার তাগিদে এই বয়সেও তাকে রিকশা চালাতে হয়। বৈশাখের তীব্র গরম তার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সংসদ ভবন এলাকার সামনে কথা হলে তিনি বলেন, ‘গরম তো সহ্য করা যায় না। এই গরমের মধ্যে রিকশা চালাতে খুব কষ্ট হয়।’
একই চিত্র অন্য শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও। তীব্র গরমে ছেলে-বুড়ো সবাই হাঁসফাঁস করছেন। নয়ন মৃধা নামে আরেক রিকশাচালক বলেন, ‘অসহ্য গরম, মামা বুঝছেন? এই গরমে মনে করেন গাড়ি-ঘোড়া চালানোর কোনো ক্যাপাসিটি নেই। একটা ভাড়া মারলে আরেকটা মারার মতো শক্তি থাকে না। অতিরিক্ত গরমে রিকশা চালানোই যায় না।’
গরম থেকে সামান্য স্বস্তি পেতে অনেকেই ঠান্ডা শরবত, আখের রস ও ডাবের পানির দিকে ঝুঁকছেন। আবার অনেক রিকশাচালক ক্লান্ত হয়ে রাস্তার ধারে রিকশার সিটেই ঘুমিয়ে পড়ছেন। বাংলামোটর এলাকায় ডাবের পানি পান করছিলেন ইমরানুল হক। তিনি বলেন, ‘অত্যধিক তাপমাত্রার কারণে শরীর খুব অস্বস্তিকর লাগে, তাই একটু পরপর পানি খাচ্ছি।’
এদিকে পরিবেশগত কারণ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। হিমেল ভূঁইয়া নামে এক পথচারী বলেন, ‘গাছপালা কেটে ফেলা আর বন উজাড় করার কারণেই এই গরম বাড়ছে। আমরা একটা গাছ কাটছি, কিন্তু তার বিপরীতে সেভাবে গাছ লাগাচ্ছি না।’
আরও পড়ুন
বৈশাখের এই তীব্র গরমে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং দীর্ঘসময় বাইরে কাজ করা মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে তাদের শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। ঘামের মাধ্যমে লবণ ও পানি বেরিয়ে যাওয়ায় দেখা দিচ্ছে চরম তৃষ্ণা, দুর্বলতা, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ। চিকিৎসকদের মতে, প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘসময় থাকার ফলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, অস্থিরতা, বমি বমি ভাব, এমনকি আচরণগত পরিবর্তনের মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে, যা হিট স্ট্রোকের পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরমে খাবার ও পানির দ্রুত নষ্ট হওয়া এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে একদিকে সরাসরি তাপজনিত অসুস্থতা, অন্যদিকে সংক্রমণজনিত রোগ, দুই ধরনের চাপেই মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
রাজধানীর ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. ফেরদৌস আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, সারা দেশেই গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। ঘরের বাইরে বের হলেই ঘেমে টেমে অস্থির। ফলে শরীর থেকে সব পানি বের হয়ে যাচ্ছে। এতে করে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে। হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি মূলত যারা দীর্ঘসময় রোদে থাকেন তাদের।
তিনি বলেন, হিট স্ট্রোকের কিছু লক্ষণ রয়েছে। সেগুলো জানা থাকলে নিজে যেমন সচেতন থাকা যায়, অন্যদের দিকেও খেয়াল রাখা যায়। তিনি আরও বলেন, প্রচণ্ড গরমে মাথাব্যথা হতে পারে। এ ছাড়া গরমে মানুষের মাইগ্রেন ট্রিগার করতে পারে। এটি হিট স্ট্রোকের একটি লক্ষণ হতে পারে। হিট স্ট্রোকের আগে ব্যক্তি চরম তৃষ্ণা অনুভব করতে পারে, সেই সঙ্গে ডিহাইড্রেটেড এবং আড়ষ্টতা অনুভব করতে পারে। শরীর নিজেকে ঠান্ডা করার জন্য অতিরিক্ত ঘাম তৈরি করতে পারে। হিট স্ট্রোকের আগে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত হতে পারে। শ্বাসকষ্ট এবং দ্রুত ও ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসও হিটস্ট্রোকের লক্ষণ। মাথাব্যথা, দ্রুত হৃদস্পন্দন ও হাইপারভেন্টিলেশন থেকে অক্সিজেনের অভাব ইত্যাদির কারণে হিট স্ট্রোকের আগে বমি বমি ভাব হতে পারে।
অতিরিক্ত তাপের কারণে হিটস্ট্রোকের আগে মানুষ বিরক্ত বোধ করতে পারে, রাগান্বিত হতে পারে, অযৌক্তিক কথা বলতে পারে এবং এমনকি প্রলাপ বকতে করতে পারে।
ডা. ফেরদৌস বলেন, গরমে বাড়ির বাইরে কম-বেশি সবাইকেই বের হতে হয়। তবে হিট স্ট্রোক এড়াতে যতটা সম্ভব ছায়ার মধ্যে থাকার চেষ্টা করবেন। পানি ও পানি জাতীয় খাবারের মাধ্যমে হাইড্রেটেড থাকতে হবে। প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
এএডি/