দেশের ২৫ জেলায় অবস্থিত সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের সার্বিকভাবে নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে ক্যাম্পাসগুলোতে ফোর-জি সেবা নিশ্চিত করতে একটি নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা সহজ করাসহ প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা বৃদ্ধি ও গ্লোবালাইজেশনের যুগে টিকে থাকতে সহায়তা করবে বলে মত সংশ্লিষ্টজনদের। প্রায় ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটি টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে। তবে ফাইভ-জির যুগে এই ফোর-জি নেটওয়ার্কেও প্রকল্প নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
পুরো বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে কিংবা ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা যেন এগিয়ে থাকতে পারে এমন প্রল্পের শুরুতেই পিছিয়ে থাকার প্রকল্পে যেন হতাশ তারা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উদ্যোগে নেওয়া ‘দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের অভ্যন্তরে ৪জি সেবা নিশ্চিতকরণ’ প্রকল্পটি চলতি বছরের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে এর কার্যক্রম শেষ হবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে। ৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা খরচে নেওয়া এই প্রকল্প সম্পূর্ণ জিওবি অর্থে পরিচালিত হবে। টেলিটকের এই নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের প্রকল্পটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আরএডিপিতে অনুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সম্প্রতি এটির প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক কাভারেজের সীমাবদ্ধতা, ধীরগতির ইন্টারনেট, ক্যাম্পাসে প্রয়োজনীয় সংখ্যক টাওয়ার, বেস স্টেশন ও সংযোগের অভাবে প্রযুক্তিগত সুবিধা থেকে বঞ্চনা, উচ্চ খরচ ও সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিসহ নানা কারণে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পটি সামাজিকভাবে বেশ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছে জানিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। তাদের মতে, প্রকল্পটি সম্প্রসারিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থানরত শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারগুলো উপকৃত হতে পারে। এ ছাড়া শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি- দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা শিক্ষার্থীদের অনলাইন রিসোর্স, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং গবেষণাপত্রে সহজে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে ভার্চুয়াল ক্লাস, ওয়েবিনার এবং অনলাইন কোর্সে অংশগ্রহণ আরও সহজ হয়। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম যেমন- এসসিইএম ল্যাব ও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ইত্যাদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। এ ছাড়া গবেষণা এবং উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করা; ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্তবায়ন; শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের ক্যাম্পাস নেটওয়ার্ক সুবিধা প্রদান করা এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের আরও উন্নত প্রযুক্তিগত সুবিধা দিয়ে আকর্ষণ; ইনক্লুসিভ কানেক্টিভিটি এবং ক্যাম্পাসের প্রতিটি অংশে ইন্টারনেটের সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।
এ ছাড়া প্রস্তাবিত প্রকল্পটির অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। এর মধ্যে উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং স্টার্টআপ বৃদ্ধি হবে, ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন ব্যবসার সুযোগ পাবে শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া তরুণ উদ্যোক্তারা নতুন স্টার্টআপের মাধ্যমে দেশীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত হবে। ফলে ই-গভর্ন্যান্স, অনলাইন পরীক্ষা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও সহজ হবে। এ ছাড়া আর্থিক প্রভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রমের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং অপচয় কমবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থ সাশ্রয় করবে। সরকারি এবং বেসরকারি খাতে ডিজিটাল সার্ভিস প্রসারের ফলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পাবে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাবনা হিসেবে দেখানো হয়েছে বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগ আকর্ষণ; ৫-৬ বছরের মধ্যে বিনিয়োগের ৭০-৮০ শতাংশ ফেরত; শিক্ষার্থীদের উপার্জনক্ষম করে তোলা; দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের আয়বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির মাধ্যমে আরও বেশি লাভ অর্জন।
তবে এত কিছুর পরও আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার এবং ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গে বেশ সমালোচনা তৈরি করেছে প্রকল্পটি।
ডিজিটাল যুগে মোবাইল নেটওয়ার্ক এখন উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক কাভারেজের মধ্যে বসবাস করছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের শেষ সময় পর্যন্ত প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া কয়েক বছরের মধ্যে ৫জি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নেটওয়ার্ক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো দ্রুতগতির ৫জি প্রযুক্তিতে এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ এখনও মূলত ৪জি নেটওয়ার্কের ওপরই নির্ভরশীল। ফলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ইন্টারনেট গতি এবং ডিজিটাল সেবার মানে একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশও দ্রুত এই ব্যবধান কাটিয়ে উঠতে পারবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের জন্য ৫জি প্রযুক্তি বাস্তবায়ন সময়ের দাবি বলে মনে করেন তারা। অন্যদিকে বাংলাদেশে ৪জি চালু থাকলেও নেটওয়ার্কের গতি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে এখনও ব্যবহারকারীদের অভিযোগ রয়েছে। তবে সরকার ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ৫জি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে এটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
পরীক্ষামূলকভাবে চলা এই ফাইভ-জির সময়ে দুই বছরের মেয়াদে নেওয়া এই ফোর-জির প্রকল্প নিয়ে যেন প্রশ্নের শেষ নেই। একইভাবে বিষয়টি নিয়ে জানতে চেয়েছে খোদ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কমিশনও। এ ছাড়া প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও জানতে চেয়েছে কমিশন। সে সঙ্গে প্রকল্পটি অনেকাংশে কারিগরি প্রকৃতির হওয়ায় এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
নাজমুল হাসান নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ক্যাম্পাসগুলোতে সরকার টেলিটকের ফোরজি নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে চাচ্ছে সেটা ভালো, কিন্তু এত টাকা খরচ করে ২ বছর ধরে ফোর-জির কাজ করবে; কিন্তু ততদিনে বিশ্ব ফাইভ-জিতে অনেক বেশি ইনভলভ হয়ে যাবে। বিষয়টা আরও ভেবে-চিন্তে ফাইভ-জির জন্যও কাজ করতে পারলে শিক্ষার্থীসহ সবাই এগিয়ে যেতে পারবে।’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের জাফর নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘টেলিটকের নেটওয়ার্ক নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে। অনেক জায়গাতেই নেট পাওয়া যায় না। নতুন এই পদক্ষেপ ভালো হবে যদি বাস্তবে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু এত টাকা খরচ করে ও অবকাঠামো স্থাপন করেও যদি শিক্ষার্থীরা কাক্সিক্ষত সেবা না পায় তা হলে সরকারি এই টাকা অপচয় ছাড়া আর কিছুই না।’
প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের পরিকল্পনা অনুবিভাগের যুগ্মসচিব মো. সফিউল আলম সময়ের আলোকে বলেন, মূলত ক্যাম্পাসগুলোতো আগের থাকা নেটওয়ার্কগুলোকে আরও স্মুথ ও সাপোর্টিভ করতে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। যেটাতে ক্যাম্পাসজুড়ে নেটওয়ার্ক সুবিধা পেয়ে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবেন। তবে প্রকল্পটিতে পরিকল্পনা কমিশন থেকে কিছু অবজার্ভেশন দিয়েছে, সেগুলো মিটআপ করার চেষ্টা করছি। পরে অনুমোদনের চিঠি পেলে কাজ শুরু হবে।
অন্যদিকে আধুনিক যুগের ফাইভ-জির সময়ে ফোর-জি প্রকল্প নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নেটওয়ার্কিংয়ের বিষয় অনেক সময় কনভার্ট করা যায়। তবে কিছু টুল ব্যবহার করতে হয়। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে এটি ফাইভ-জিতে কনভার্ট করা যেতে পারে।
এএডি/